April 21, 2019

নতুন প্রস্তাব নিয়ে সর্বত্র সমালোচনার ঝড়

পুরোনো ঋণখেলাপিদের শাস্তি না দিয়ে উল্টো পুরস্কৃত করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। যারা ব্যাংকের ভালো গ্রাহক, নিয়মিত টাকা পরিশোধ করেন তাদের শিল্পঋণে সুদের হার ১২ থেকে ১৪ শতাংশ এবং চক্র বৃদ্ধি হারে নেয়া হচ্ছে। অথচ ব্যাংকিং খাতে যারা চিহ্নিত ঋণখেলাপি তাদের ঋণ পুনঃতফসিলে ৭ শতাংশ সুদের হার নির্ধারণ করা হচ্ছে, তাও আবার সরল সুদ।

এছাড়া পুনঃতফসিলকৃত ঋণ পরিশোধে সময় পাবেন ১৫ বছর। এর মধ্যে ২ বছর কোনো কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না। আবার মাত্র ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে পুনঃতফসিল করা যাবে।

এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের পাঁয়তারা হিসেবে দেখছেন ব্যাংক ও আর্থিক খাত বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, নামমাত্র শর্ত দিয়ে আর কি লাভ। জনগণের টাকা ঋণখেলাপিদের এমনিতে দিয়ে দিতে পারে।

ব্যাংকিং সেক্টরের কয়েকজন বিশ্লেষকের পাশাপাশি ভালো গ্রাহকরাও প্রস্তাবিত এ নীতিমালা নিয়ে যুগান্তরের কাছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তাদের প্রশ্ন, ঋণখেলাপিদের পক্ষেই কেন এত পলিসি। এর পেছনে কারা কলকাঠি নাড়ছে। তাদের স্বার্থই বা কী।

তারা মনে করেন, এটা উদ্দেশ্যমূলক। ঋণখেলাপিদের বাঁচাতে যারা একের পর এক বিস্তর ছাড় দেয়ার নীতি গ্রহণ করেছেন তাদের সঙ্গে খেলাপিদের যোগসাজশের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হবে। বিতর্কিত এ নীতিমালা অর্থ মন্ত্রণালয় পাস করলে ব্যাংকিং সেক্টর আরও বিপদের মধ্যে পড়বে। তখন আর কেউ ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে চাইবে না।

ভালো গ্রাহকদের কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে যুগান্তরকে বলেন, তারা খেলাপি না হয়ে এতদিন যে নিয়মিতভাবে ১২-১৩ শতাংশ সুদ দিয়ে এসেছেন সেটার হিসাব তাহলে কী হবে। তারা কী সুবিধা পাবেন। এখন খেলাপিদের জন্য ৭ শতাংশ সুদ হিসাব করলে তাহলে তাদের কাছ থেকে নেয়া অতিরিক্ত ৫ শতাংশ ফেরত অথবা সমন্বয় করতে হবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বুধবার যুগান্তরকে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের আলোচ্য প্রস্তাবটি পাস হলে নির্ঘাত এসব সুবিধার অপব্যবহার হবে। এতে যারা ক্ষমতার কাছাকাছি এবং অভ্যাসগত খেলাপি তারাই লাভবান হবেন বেশি, বঞ্চিত হবেন ভালো গ্রাহকরা।

সাবেক এ গভর্নরের অভিমত- প্রয়োজনে কেস টু কেস ভালো গ্রাহকদের এ ধরণের সুবিধা দিতে পারত। কিন্তু এভাবে ঢালাওভাবে সুবিধা দেয়া উচিত হবে না। খেলাপিদের আরও সুবিধা দেয়ার নতুন প্রস্তাবগুলো অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে উপস্থাপনের প্রায় সব আয়োজন শেষ করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নেতৃত্বে গঠিত আট সদস্যের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি। কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী ডাউন পেমেন্টে ঋণ স্থিতির ১ শতাংশ অথবা এক কোটি টাকার মধ্যে যেটি কম সেটি জমা করেই খেলাপি ঋণ নবায়ন বা পুনঃতফসিল করা যাবে। এছাড়া ঋণ পরিশোধে ২ বছরের মোরাটরিয়ামসহ ১৫ বছর সময় দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ১৫ বছরের মধ্যে ২ বছর ঋণের কিস্তি পরিশোধে এক টাকাও খরচ করতে হবে না। ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে সরল সুদ এবং হার ৭ শতাংশ করা হবে। বিষয়টি বুধবার গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে সর্বত্র সমালোচনার ঝড় ওঠে।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ব্যবসায়ীদের একটি অংশের চাপে এটা করা হতে পারে। কিন্তু এর পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। বরং এর মাধ্যমে সবাই ঋণখেলাপি হতে চাইবে। কারণ নিয়মিত ঋণে সুদের হার ১২-১৪ শতাংশ। আর পুনঃতফসিলকৃত ঋণের সুদ মাত্র ৭ শতাংশ, তাও সরল সুদ।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বুধবার যুগান্তরকে বলেন, প্রস্তাবগুলো যদি পাস হয় তাহলে ঋণখেলাপি সংস্কৃতি আরও উৎসাহিত হবে। তখন সবার উদ্দেশ্য হবে খেলাপি হওয়া। কারণ খেলাপি হলে ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা পাবে।

তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরে আসার যে আশা তা দীর্ঘায়িত হবে। এগুলো ভালো পদক্ষেপ নয়। তিনি আরও বলেন, ভেবেছিলাম অর্থমন্ত্রী ঋণখেলাপিদের প্রতি কঠোর হবেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তিনি এ ব্যাপারে নমনীয়। প্রস্তাবগুলো পাস করা উচিত হবে না।

পলিসি রিচার্স ইন্সটিটিউট (পিআরআই) অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এবং আর্থিক খাত বিশ্লেষক ড. আহসান এইচ মনসুর বুধবার যুগান্তরকে বলেন, নামমাত্র এসব প্রস্তাবের কি দরকার। জনগণের টাকা খেলাপিদের এমনিই দিয়ে দিতে পারে। এসব করে ব্যাংকিং খাতকে আরও ধ্বংস করা হবে। এভাবে ব্যাংক ব্যবসা করতে পারবে না।

উৎসঃ যুগান্তর

Related posts