September 23, 2018

নতুন কিসিমের ভোট

গণতান্ত্রিক সিলসিলায় ভোট পবিত্র আমানত। পৌর নির্বাচনের আগে রকিব কমিশন মোবাইল বার্তায় মনে করিয়ে দিয়েছিল- ‘ভোট আপনার অধিকার’। সে অধিকার কোন পর্যায়ে রয়েছে ভোটাররা গতকাল তা আরও একবার নতুন করে অনুভব করেছেন। নতুন কিসিমের এই ভোটের চিত্র স্পষ্ট হয় যশোর সদর পৌরসভার কয়েকটি কেন্দ্রে ভোট শেষ হওয়ার আগেই
গণনা শুরুর দৃশ্য দেখে। বেলা ৩টার দিকে, যশোর সরকারি এমএম কলেজ কেন্দ্রে ভোট গণনা শুরু হয়। প্রিজাইডিং অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, যেহেতু নির্ধারিত সময়ের আগেই শতভাগ ভোট কাস্ট হয়ে গেছে এ কারণে ভোট গণনা শুরু হচ্ছে। পরে অবশ্য এ কেন্দ্রের ভোট বাতিল হয়।

সিল উৎসব শুরু হয়েছিল আগের রাতেই। সকালে প্রথম খবর আসে মাদারীপুরের কালকিনি থেকে। নৌকায় সিলমারা ১১ শ’ ব্যালট পাওয়া যায় সেখানে। বেশি অপেক্ষার প্রয়োজন হয় না। এরপরই খবর পাওয়া যায় কুমিল্লার বরুড়া থেকে। সেখানেও পাওয়া যায় সিলমারা ১২শ’ ব্যালট। অভিযোগ রয়েছে, অনেক কেন্দ্রেই রাতেই এমন সিলমারা হয়েছে। ভোট শুরু হয় সকাল ৮টায়। প্রথম ঘণ্টাতেই সারা দেশে ভোটের চিত্র স্পষ্ট হয়ে যায়। আগের রাতের তীব্র অভিযানে বিরোধী এজেন্টরা পালিয়ে যান অনেকে। বাদ বাকি যারা কেন্দ্র্রে যান তাদের বেশিরভাগই টিকতে পারেন নি। মানবজমিনের রিপোর্টাররা সারা দেশে এক হাজারেরও বেশি কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। এর বেশিরভাগ কেন্দ্রতেই ধানের শীষের এজেন্ট পাওয়া যায়নি। কম বেশি সংঘাত সহিংসতা ঘটেছে সব এলাকাতেই। সাতকানিয়ায় গুলিতে নিহত হয়েছেন এক জন। দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে এ নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন দুই শতাধিক। কমপক্ষে ৩০ মেয়র প্রার্থী ভোট বর্জন করেছেন।

নরসিংদীর মাধবদীতে ভোটগ্রহণ স্থগিত হয়েছে। সারা দেশে বিভিন্ন এলাকায় গোলযোগের কারণে স্থগিত করা হয়েছে ৩৬ কেন্দ্রের ভোট। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভোটের নামে প্রহসন হয়েছে। ২০০ পৌরসভায় কেন্দ্র দখল হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অতীতের যে কোন স্থানীয় নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। আর প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, দুই-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে।

আমাদের রিপোর্টারদের পাঠানো প্রতিবেদনে বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগের রাত থেকেই বেশিরভাগ এলাকা সরকার সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ কেন্দ্রে যেমন বিএনপির এজেন্ট ছিল না। তেমনি কেন্দ্রের বাইরেও বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা ভিড় করতে পারেননি। আমাদের সিনিয়র রিপোর্টার কাফি কামাল বগুড়া থেকে জানাচ্ছেন, বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এলাকাতেও ভোট কেন্দ্রের বাইরে বিএনপির কর্মী সমর্থকরা ভিড় করতে পারেননি। তারা অনেকটাই নীরব ছিলেন। পুলিশি হয়রানির ভয়েই এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে বিএনপি প্রার্থীরা জানান। যেসব এলাকায় সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে তার বেশিরভাগই হয়েছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের। এ ধরনের সবচেয়ে বড় সংঘর্ষটি হয়েছে বরগুনায়। সেখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীই আহত হন এবং নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।

কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তবে অনেক এলাকাতে ভোট কারচুপি হয়েছে বাধাহীনভাবে। কেন্দ্র দখল করে প্রকাশ্যে সিলমারার দৃশ্য দেখা গেছে। এক্ষেত্রে মেয়র পদের প্রার্থীদের প্রতীকেই সিলমারার ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কোথাও বাধা দিতে দেখা যায়নি। টিভি ক্যামেরায়ও ধরা পড়েছে অবাধে সিলমারার দৃশ্য। এমনকি কোথাও কোথাও খোদ পুলিশের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে ব্যালটে সিল মারার। কোন কোন জায়গায় সিল মেরেছেন প্রিজাইডিং অফিসার। জালভোট ছিল মোটামুটি স্বাভাবিক দৃশ্য। এমনও একজন ভোটার পাওয়া গেছে, যিনি লাইনে দাঁড়ালেও নিজের বাবার নাম বলতে পারছিলেন না। তিনি বলেন, তার বাবার নাম কাগজে লেখা আছে। মানিকগঞ্জের একটি কেন্দ্রে ভোট শুরুর নির্ধারিত সময়ের আধা ঘণ্টা আগেই জাল ভোট দেয়া শুরু হয়।

ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে বেশ কয়েকটি জায়গায়। মাঠে পড়ে থাকতে দেখা গেছে ব্যালট পেপার। নোয়াখালী থেকে আমাদের রিপোর্টার আহমেদ জামাল জানান, সেখানে তিনি দেখেছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পোলিং এজেন্টরা ভোটারদের নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন নৌকা প্রতীকে প্রকাশ্যেই ভোট দেন। চট্টগ্রামের কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে মহিউদ্দিন জুয়েল জানান, তিনিও প্রকাশ্যে সিল মারার দৃশ্য দেখেছেন। কোথাও ধানের শীষের কোন এজেন্ট পাননি। কয়েকটি কেন্দ্রে প্রবেশ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকদের কাছ থেকে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের খবর তেমন কোন এলাকা থেকে আমরা পাইনি।

বাংলাদেশের কলঙ্কিত ভোটের ইতিহাস নতুন কিছু নয়। গতকালের নির্বাচন সে ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করলো। যদিও এটি একটি নতুন কিসিমের গায়েবি ভোট।
বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে :সিইসি

কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। বুধবার রাতে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে ভোট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন তিনি। সিইসি বলেন, সারা দেশে আমরা পৌরসভার নির্বাচন সমাপ্ত করলাম। এ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন প্রথম থেকেই যথেষ্ট সতর্ক ছিল, যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম না হয়। নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রার্থী ও সাংবাদিকদের সহায়তায় কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবেই নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, সারা দেশে ২৩৪টি পৌরসভায় ৩ হাজার ৫৫৫টি কেন্দ্রের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ায় ৫০টি ভোটকেন্দ্রে ভোট স্থগিত করা হয়েছে এবং নরসিংদীর মাধবদী পৌরসভার ভোট স্থগিত করা হয়েছে।

২০০ পৌরসভায় অনিয়মের বিএনপির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৬০টি কেন্দ্রে অনিয়মের কথা শুনেছি। বেশির ভাগ অভিযোগ বিএনপির কাছ থেকেই এসেছে। নির্বাচন কর্মকর্তার কাছ থেকেও শুনেছি। যাচাই বাছাই করে আমলে নিয়ে বেশ কিছু কেন্দ্রের ভোট বাতিল করেছি, সেখানে আবার ভোট নেয়া হবে। জালভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জালভোটের ঘটনা দেখেছি, আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে এটা মোকাবিলা করেছি। এজন্য কয়েকজনকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আপনারা অসহায় এবং আপনাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল না বিএনপির এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে রকিবউদ্দীন বলেন, এটাতো আপনারা প্রথম থেকেই বলে আসছেন,  যখন আমরা রাজনৈতিক দলের কাছে সহায়তা চাইলাম, তখন আপনারা বললেন আমরা অসহায় ফিল করছি। অসহায়ত্বের কিছু নাই।

সকলের সহায়তা নিয়েই একটা মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলাফল এটা। নির্বাচনে হেরে গেলে নিয়মানুযায়ী আপিল করার সুযোগ আছে বলেও জানান তিনি। নির্বাচন নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট কিনা জানতে চাইলে সিইসি বলেন, আমাদের কাজ আমরা করে যাচ্ছি, এখানে সন্তোষ্ট-অসন্তোষ্টের কিছু নাই, ইটস মাই জব, উই আর ডুইং।
নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে: আওয়ামী লীগ

অতীতের যেকোন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চাইতে এবারের পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে দাবি করেছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচন নিয়ে বিএনপি কাল্পনিক ও ঢালাও অভিযোগ করছে বলেও মনে করে দলটি। গতকাল বিকালে পৌর নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে প্রথমবার দলীয় প্রতীকে গতকাল অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচন বিষয়ে কথা বলেন দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। উৎসবমুখর পরিবেশে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান তিনি। পৌর নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত থাকার জন্য বিএনপিকেও ধন্যবাদ জানান আওয়ামী লীগের এই নেতা।

হানিফ বলেন, অতীতে যে কোন স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের তুলনায় আজকের (গতকাল) পৌরসভা নির্বাচন অনেক কম সংঘাতপূর্ণ হয়েছে। অতীতে নির্বাচনে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটলেও এবারের নির্বাচন কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল। এই নির্বাচন অনেক শান্তিপূর্ণ হয়েছে। সাতকানিয়ায় যিনি নিহত হয়েছেন, এটা নির্বাচন সংক্রান্ত কোন ঘটনা নয়। কেন্দ্রের বাইরে অনেক দূরে সামাজিক একটি দ্বন্দ্বের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বিএনপি এ ঘটনা নিয়ে নিয়ে যে মিথ্যাচার করছে আমরা তার নিন্দা জানাই। পৌর নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অভিযোগ প্রসঙ্গে হানিফ বলেন, তারা প্রথমে বলেছে ৬০টি পৌরসভায় অনিয়ম হয়েছে। এরপর বলেছে ১৫৭টি। তাদের কোন বক্তব্য সঠিক তা নির্বাচন কমিশন দেখবে। তিনি বলেন, কোন জায়গায় অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা হলে সেই ভোট নির্বাচন কমিশন বাতিল করতে পারে। সেই এখতিয়ার তাদের আছে। আমরা চাই নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করুক।

‘পরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বীরা বিজয়ীদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ করে’-এমন মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, বিএনপি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে নাতো কার বিরুদ্ধে করবে? কারণ আওয়ামী লীগ জয়লাভ করছে। সাধারণত দেখা যায় পরাজিত প্রার্থীদের যখন পরাজয়ের শঙ্কা জাগে তখন তারা বিজয়ী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে এবং এটাই স্বাভাবিক।

বিভিন্ন পৌরসভায় সংঘাত সংঘর্ষের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন এবং বিএনপির উস্কানিতে এসব ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে হানিফ বলেন, দু’একটি জায়গায় যেসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে প্রত্যেকটি ঘটনায় বিএনপির পক্ষ থেকে উস্কানি দিয়ে গোলযোগ করার চেষ্টা করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা করার জন্য আমরা আমাদের কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলাম। তারা সহায়তা করেছে। সংযত আচরণ করেছে। বিএনপির অভিযোগ কতটুকু সত্য তা নির্বাচন কমিশন দেখবে। তিনি বলেন, বিচ্ছিন্ন দু’একটি ঘটনা ছাড়া এ ধরনের ঢালাও অভিযোগ করার কোন সুযোগ নেই। ৩ হাজারের বেশি কেন্দ্রের মধ্যে এ সংখ্যা বেশি নয়। এটা ৩ শতাংশের নিচে চলে এসেছে। আর বিএনপির অভিযোগ যদি সত্যও হয় তাহলেও বলা যেতে পারে এই সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য।

পৌর নির্বাচন নিয়ে বিএনপির গভীর ষড়যন্ত্র ছিল এবং তা এখনও আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, পৌর নির্বাচন নিয়ে বিএনপির যে দীর্ঘ গভীর ষড়যন্ত্র ছিল এই ধরনের মিথ্যাচার এর একটি অংশ হতে পারে। আমরা নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পেরেছি যেসব জায়গায় তারা পরাজিত হবে সেখানে ফলাফল শিটে বিএনপির পোলিং এজেন্টদের স্বাক্ষর না করার জন্য বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় নির্বাচনকে বিতর্কিত করে আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের জন্য তারা পৌর নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।
সকল রাজনৈতিক দলকে ফলাফল মেনে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে হানিফ বলেন, এই নির্বাচনে সরকারের পরিবর্তন হবে না। নির্বাচন হবে ২০১৯ সালে। আমরা চাই সকল রাজনৈতিক দল নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রূপদানের লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এই নির্বাচনের ফলাফলেই প্রমাণ হবে দেশবাসী উন্নয়নের অগ্রযাত্রা চায়, শান্তি চায়, না-কি সন্ত্রাস, নাশকতা, জঙ্গিবাদ চায় সেটার কিছুটা বার্তা হয়তো পাওয়া যেতে পারে। পৌর নির্বাচনকে ইস্যু করে বিএনপির আন্দোলনের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে হানিফ বলেন, অতীতে বিএনপির আন্দোলন দেশবাসী দেখেছে। সহিংস আন্দোলনের নামে তারা বেশি কিছু করতে পারেনি। ভবিষ্যতে বিএনপি যদি তথাকথিত আন্দোলন করে তাহলে অতীতের মতো দেশবাসী তার সমুচিত জবাব দেবে।

সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বিএম মোজাম্মেল হক, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, সাবেক মন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, দলের দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলি, উপ-প্রচার সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, কেন্দ্রীয় সদস্য এসএম কামাল হোসেন, এনামুল হক শামীম, সুজিত রায় নন্দী প্রমুখ।

২০০ পৌরসভায় কেন্দ্র দখল হয়েছে: বিএনপি

সরকারের নীল-নকশা অনুযায়ী প্রহসনের সাজানো নির্বাচন হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এতদিন প্রহসনের নির্বাচনের যে আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছিল বিএনপি সেটাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া, অন্তত ২শ’ পৌরসভায় কেন্দ্র দখল হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দলটি। যেসব কেন্দ্রে অনিয়মের লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে সেসব কেন্দ্রে পুনরায় ভোটগ্রহণের দাবি করা হয়েছে। গতকাল বিকালে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভোটগ্রহণ শেষে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব কথা বলেন। এর আগে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তিনদফা সংবাদ সম্মেলনে ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্র দখল, তাণ্ডবের চিত্র তুলে ধরেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ।

দেশব্যাপী নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন মনিটরিং সেলের আহ্বায়ক মির্জা আলমগীর বলেন, সকাল থেকে দিনভর নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশ তো দূরের কথা, ভোটারদের মেরে বের করে দেয়া, কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই, প্রকাশ্য সিলমারা, সংঘাত-সহিংসতা ইত্যাদিতে নির্বাচন একটি ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। বিকাল চারটা পর্যন্ত যতটুকু খবর পেয়েছি, তাতে ১৫৭টি পৌরসভায় ধানের শীষের এজেন্টদের মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। এই সংখ্যা শেষ পর্যন্ত ২শ’র কম হবে না। বিএনপির অনেক এজেন্টকে কেন্দ্রে যেতে দেয়া হয়নি। ভোটারদেরও অনেক জায়গায় মেরে বের করে দেয়া হয়েছে। অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র দখল করা হয়েছে। সাতকানিয়ায় যুবদল নেতা নুরুল আমীনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ভোটারদের লাইন থেকে বিএনপির ভোটারদের বের করে দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।

সাংবাদিকদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে মির্জা আলমগীর বলেন, প্রথম বারের মতো একাত্তর টিভির এক নারী সাংবাদিকের ওপর হামলা চালিয়েছে সরকার সমর্থকরা। ভোটকেন্দ্রে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করার পরও রাজশাহীতে এটিএন নিউজ ও সমকালের তিনজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বলেন, এবারই প্রথম কেন্দ্রের ভেতরে যেতে শর্ত আরোপ করা হয়েছে। গণমাধ্যম যাতে নির্বাচনের সত্য চিত্র প্রকাশ করতে না পারে সেজন্য তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। ভোট চলাকালীন ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া, অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভোটের  যে চিত্র দেখেছি, তাতে গণতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের অত্যন্ত ঘৃণিত ও সন্ত্রস্ত্র করে তুলেছে।

আওয়ামী লীগের গণতন্ত্রের  চেহারা যদি এই হয়ে থাকে, তাহলে সেই গণতন্ত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। ভোটারবিহীন এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না মন্তব্য করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, যতদিন এই সরকার এভাবে জোর করে ক্ষমতায় থাকতে চায়, ততদিন তারা সুষ্ঠু নির্বাচন হতে দেবে না। তাদের অধীনে কখনও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। কারণ তারা জানে- সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তাদের পরাজয় হবে। প্রহসনের এই নির্বাচনে সরকার সব রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছে অভিযোগ করে মির্জা আলমগীর বলেন, সরকারের জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। কিন্তু প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে তারা দেখাতে চায়- তাদের জনপ্রিয়তা রয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, যেসব কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে সেসব কেন্দ্রের অভিযোগ লিখিতভাবে আমরা নির্বাচন কমিশনকে দফায় দফায় জানিয়েছি।

স্থানীয় ও কেন্দ্রীয়ভাবে যেসব পৌরসভার কেন্দ্র দখল, ভোট কারচুপির অভিযোগ করা হয়েছে সেসব কেন্দ্রে পুনঃনির্বাচন দিতে হবে। এই নির্বাচন আবারও প্রমাণ করেছে, এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্ভব নয়। প্রহসনের এই নির্বাচনে কমিশন তাদের অযোগ্যতা আবারও প্রমাণ করেছে। ২০ দলের শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক সাঈদ আহমেদকে তারাব থেকে গ্রেপ্তারের অভিযোগ করেন মির্জা আলমগীর। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুকসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এদিকে পৌর নির্বাচন নিয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করতে গত রাতে দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

দিনভর বিএনপির যত অভিযোগ

এদিকে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সকাল থেকে তিন দফা সংবাদ সম্মেলন করেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ। ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে রিজভী আহমেদ বলেন, সারা দেশে পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমরা যে আশঙ্কা করছিলাম তার কিছু বৈশিষ্ট্য সকালে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর থেকেই ফুটে উঠেছে। বিভিন্ন কেন্দ্রে বিরোধী দলের এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে  দেয়া হয়নি। কেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে সিল মারা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, লক্ষ্মীপুরের রায়পুরা, নাটোর, বরগুনার বেতাগী, ঝালকাঠির নলছিটি, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ, নোয়াখালীর বসুরহাট, কুমিল্লার বরুড়া ও লাকসাম, মাদারীপুরের কালকিনি, জামালপুরের সরিষাবাড়ি, বরিশালের মুলাদী, ফেনীর দাগনভূঞা, বগুড়া, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, যশোরের মনিরামপুর, মানিকগঞ্জ, ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ড, নরসিংদীর মনোহরদি পৌরসভায় বিভিন্ন কেন্দ্র দখল করে জালভোট দেয়া হয়েছে; নির্বাচনী এজেন্ট এবং  ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। দুপুরে তৃতীয়দফা সংবাদ সম্মেলনে রিজভী আহমেদ অভিযোগ করেন, সারা দেশে নিজেদের পক্ষে কৃত্রিম বিজয় দেখানোর জন্য ক্ষমতাসীনরা তাণ্ডব চালায়। আমরা এ পর্যন্ত যেসব তথ্য পেয়েছি, তাতে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা প্রশাসনের সহায়তা বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র দখল করে এবং বিরোধী দলের এজেন্টদের বের করে দিয়ে এ তাণ্ডব চালায়। তিনি বলেন, মনে হচ্ছে, তাদের যে আক্রমণ, ভোটকেন্দ্র দখল এবং পোলিং এজেন্ট ও  ভোটারদের ঢুকতে না দেয়া- এটা যেন তারা উৎসব হিসেবে নিয়েছে পুলিশ, প্রশাসন ও যৌথবাহিনীর পাহারায়। আমরা এই তাণ্ডবের নিন্দা করছি। তিনি অভিযোগ করেন, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, মিরসরাই, রাঙ্গুনিয়া, জয়পুরহাটের কালাই,  গোপালগঞ্জ সদর, বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ, বগুড়া, কুমিল্লার লাকসাম, দাউদকান্দি, চান্দিনা, যশোর, ফরিদপুরের নগরকান্দা, ময়মনসিংহের গফরগাঁও, ভালুকা, নারায়ণগঞ্জের  সোনারগাঁ, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর, নরসিংদী, পাবনার ঈশ্বরদী, সাঁথিয়া, জামালপুরের ইসলামপুর, নাটোর সদর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া, লক্ষ্মীপুরের রায়পুরা, ভোলার  বোরহানউদ্দিন, দৌলতখান, ঢাকার সাভার, ধামরাই, খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা, ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ড,  মৌলভীবাজার সদর ও মাগুরা সদর পৌরসভার বিভিন্ন কেন্দ্র দখল করে জালভোট দেয়া, বিএনপির দলীয় এজেন্টদের বের করে দেয়া, নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে বাধা  দেয়া হয়।
নির্বাচন কমিশনে তিনদফা অভিযোগ

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. ওসমান ফারুক ও খন্দকার মাহবুব হোসেনের নেতৃত্বে দুটি প্রতিনিধি দল দু’দফায় নির্বাচন কমিশনে দলের লিখিত অভিযোগ করেন। এছাড়া রাতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সকালে নির্বাচন কমিশনে যান। নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অভিযোগ করেন ওসমান ফারুকের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি।মানবজমিন

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts