September 25, 2018

“দ্বৈত নাগরিকত্ব আইন ও প্রবাস প্রজন্ম” (শেষ পর্ব)

সিকদার গিয়াসউদ্দিন

জন্মগ্রহনের দায়ঃ প্রবাসী হওয়ার দায়ঃ প্রজন্মের দায়ভারঃ ‘দ্বৈত নাগরিকত্ব আইন’নামে গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীপরিষদ কতৃর্ক একটি আইনের চুড়ান্ত অনুমোদনের বিষয় নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের মাঝে ব্যাপক তোলপাড় চলছে।এটি চুড়ান্তভাবেই বৈষম্যমূলক আর ব্যাপক বিনিয়োগ বিরোধী বলে আলোচিত সমালোচিত হচ্ছে।বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল্যবোধ বিরোধী বলে অনেককে বলতে দেখা যাচ্ছে।আমাদের বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রবাসীদের অবদানের প্রতি চপেটাঘাত বলে প্রবাসীদের  অনেকের আবেগতাডিত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৮ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভের কথা সরকারের সকল মহলকে জোরেশোরে বুক ফুলিয়ে গর্ব করে বলতে শুনা যায়।আগের সরকারগুলোও ব্যতিক্রম ছিলোনা।প্রবাসে লোকসংখ্যার অনুপাতে রেমিটেন্স প্রবাহ থেকে অর্জিত রিজার্ভ নিয়ে কৌশলে গর্ব ও তা প্রচারের বিষয়টি তখনকার পত্র পত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার কথা।বাংলাদেশের রাজকোষের রিজার্ভের বিষয়টি তখনো এবং এখনো কৌশলে জোরগলায় বলা হয়ে থাকে এবং পত্রিকায় লেখা হয়ে থাকে।গ্রাম ও শহরের সাধারন কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষদের বুঝতে বা জানতে পারার কথা নয় যে-তাদেরই মতো মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রক্ত পানি করা প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিটেন্স প্রবাহ অর্থনীতির চাকাকে একদিকে যেমন সচল রাখে অন্যদিকে রাজকোষের রিজার্ভের সেটাও অন্যতম কারন।সাধারন লেখাপড়া জানা নিম্নআয়ের অনেক লোকদেরও ব্যাপক প্রপাগান্ডার কারনে এবিষয়ে তেমন বেশী জানতে দেখা যায়না।

ব্যাপক সচেতনতা সেতো আরো অনেক দূরের ব্যাপার।রাজকোষের রিজার্ভ নিয়ে নিকট অতীত ও ইদানিং কথামালার ফুলঝুরি আর গাল দিয়ে যেভাবে ফেনা ঝরিয়ে কায়েমী স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্টীগুলো প্রচার করতে থাকে-তাতে মনে হয় বাংলাদেশে টাকা এখন রাস্তাঘাটে আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।সেই সূযোগকে কাজে লাগিয়ে স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহল প্রবাসীদের রক্তে ভেজা রিজার্ভের টাকা বিভিন্ন কৌশলে পাচার,রাজকোষের অর্থচুরি কিংবা দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে শুরু করে নানাধরনের অর্থনৈতিক প্রতিষ্টানের ধ্বংসসাধন যা এখনও প্রতিদিনের খবর।অন্যদিকে ‘সাগর চোরদের’ এখনো গাড়ী হাঁকিয়ে  মাথা উঁচু করে চলতে দেখা গেলেও দেশের দুইকোটি কৃষকের বিরুদ্ধে ব্যাংকিং কর্তৃপক্ষের প্রদত্ত মামলা জনিত কারনে ঘর ও গ্রাম ছাড়ার খবরও দেখা যায়।দেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড কৃষি হলেও কৃষকদের এভাবে গৃহত্যাগ আর নিরাপত্তাহীনতা পিলে চমকানোর মত।এসব কৃষকদের অপরাধ দেশের খাদ্যোৎপাদন অব্যাহত রাখার জন্য,পরিবারের দূ’বেলা দূ’মুটো চালডালের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য ত্রিশ হাজারেরও কম ব্যাংক ঋণ গ্রহন।অথচ কখনো খরা,কখনো অতি বৃষ্টি,বন্যাসহ পরিবেশ দূষন ও প্রাকৃতিক দূর্যোগজনিত কারনে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি দেশের সকলের ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহিত থাকার কথা।

অবশ্য এসব খবর পত্রিকার ভেতরের পাতায় এমনভাবে লেখা থাকে-তা কারো দৃষ্টিগোচর হওয়ার কথা নয়।এমতাবস্থায় দ্বৈত নাগরিক আইনকে কেন্দ্র করে প্রবাসীদের প্রতি এবং তাদের পরবর্তি প্রজন্মের প্রতি যে বৈষম্যমূলক ও বৈমাত্রেয়সূলভ আচরন দেখা যায়-তা মেনে নেয়ার মতো নয়।আন্তর্জাতিক রীতিনীতির বাইরে এসব গনবিরোধী অগনতান্ত্রিক আচরনের প্রেক্ষাপঠে প্রবাসী অভিবাসী সমাজ হতাশ।উন্নতদেশগুলোতে যে কোন ধরনের ডিসক্রিমিনেটরি এসব আইনের চিন্তা করাও অনেকে নৈতিকতা বিরোধী অপরাধ মনে করে।১৯৭৭’সাল থেকে ১৯৮২’সাল পর্য্যন্ত ছাত্র আন্দোলনের জন্য ছাত্রসংসদের নির্বাচিত সদস্যদের একদিকে বহি:স্কার অন্যদিকে মামলা দায়ের করে জেল জরিমানার মতো।

আধুনিক চীন ও ভারতের উত্তরণের পেছনেঃ

আধুনিক চীনের প্রতিষ্টাতা দেং জিয়াও পিংয়ের সংস্কার আন্দোলনের পর পর চীনের তরুন অংশটি ইউরোপ,নর্থ আমেরিকা,অষ্ট্রেলিয়া গমন করে উচ্চশিক্ষা সমাপন করে চীনে ফেরত গেলে এবং প্রবাসী চীনাদের বিনিয়োগ ও প্রবাসীদের সহযোগীতায় বহুজাতিক সংস্থাগুলোর বিনিয়োগ দস্তুরমতো বিস্ময়কর।প্রবাসীদের কল্যানে ও সমস্যা সমাধানে চীন সরকার কর্তৃক প্রদত্ত নানা সূযোগ সূবিধাকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে আধুনিক চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।আধুনিক ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তনের পেছনেও সিলিকনভ্যালী সহ প্রবাসীদের সম্মিলিত শক্তি মূলত: মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে।চীন ও ভারতের সামগ্রিক উত্তরণের পেছনে প্রবাসীদের ত্যাগ আর শ্রমের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহল কর্তৃক স্বীকৃত।এনিয়ে কেউ কোথাও কাউকে দ্বিমত প্রকাশ করতে দেখা যায়নি।

ক্ষোভ,হতাশা,জটিলতা ও কথামালার ফুলঝুরিঃ

প্রবাসীদের নিয়ে বাংলাদেশে মূখে কথার ফুলঝুরি ছড়ালেও ভারত ও চীনের মতো এ ধরনের ব্যাপক সহজলভ্য সূযোগ সূবিধা আদৌ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিনা-বেশ প্রশ্নসাপেক্ষ।এমন অনেক প্রবাসী দেখা যায় সূযোগ পেলে দেশের উন্নয়নে চোখ বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত।অর্থবিত্ত নয়-মা মাটি মানুষ আর দেশের ঋনশোধ করার নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের মানদন্ডে  বিষয়টি প্রবাসী সমাজকে অহরহ বলতে দেখা যায়।আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতার জন্য তার যথাযথ বাস্তবায়ন এখনো সুদূরপরাহত বলে মনে করে প্রবাসের বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ লোকজন।পরিতাপের বিষয় ১’লা ফেব্রুয়ারী ২০১৬ খৃষ্টাব্দে মন্ত্রীসভায় অনুমোদিত ‘দ্বৈত নাগরিকত্ব আইন’কে কেন্দ্র করে বৃটেনের ট্রাইবুন্যাল জজ ব্যারিষ্টার নজরুল খসরু মানবজমিনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন-“প্রস্তাবিত বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আইন অনুমোদন ও কার্য্যকর হলে বহির্বিশ্বে বসবাসরত লাখ লাখ বাংলাদেশের সন্তান হারাতে পারেন নাগরিকত্ব।পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক প্রবাসী দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিকে পরিনত হবে।তাছাড়া বাংলাদেশে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বে অনেক মানুষ।তিনি বলেন-বাংলাদেশের সংবিধানে কোন নাগরিককে আইন করে রাষ্ট্রহীন করার প্রভিশন নেই।”২৩’শে মে মানবজমিন পত্রিকায় সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হলে প্রবাসীদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

কয়েক যুগের ব্যবধানে গড়ে উঠা প্রবাসীদের প্রানের দাবীঃ

দীর্ঘ কয়েক যুগের ব্যবধানে কতো সরকার আসলো গেলো।প্রবাসীদের প্রানের অনেক দাবীদাওয়ার বিষয়টি নিকট অতীত ও বর্তমান সরকারের জানার কথা।নেতাদের মৌখিক আশ্বাস আর কথায় কথায় কথামালার ফুলঝুরি এবং বক্তব্যের নানাকথা দেশবিদেশের বাংলা পত্রপত্রিকায় প্রকাশের কথা কে না জানে!!দেশের যে কোন বড় নেতা,ছোট নেতা বা পাতি নেতা বিদেশে যেই আসুকনা কেনো-ক্যাটাগরী অনুসারে গনসম্মর্ধনা নেওয়ার জন্য সে কি আবদার!সম্মর্ধনা পাওয়ার জন্য চাতক পাখীর মতো হা করে চেয়ে থাকে।কারন দেশের প্রচার ও গনমাধ্যমে তা প্রদর্শিত ও প্রচারিত হলে দেশে কদর বেড়ে যাওয়ার প্রত্যাশায়।গনসম্মর্ধনাত্তোর সভামঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে নেতাদের আশার বানী শুনতে শুনতে প্রবাসীরা ক্লান্ত।আশার কুহকে দুলতে আর রাজী নয় প্রবাসী অভিবাসী সমাজ।প্রবাসীদের আতিথেয়তা,সহজ সরল আচরন,সম্মান প্রদর্শনকে অনেক নেতারা দূর্বলতা মনে করে।নেতাদের একই ধরনের সূর প্রবাসীদের ব্ল্যাকমেলিং করার মতো বলে এখন প্রবাসী সমাজে রীতিমতো আলোচনা সমালোচনা চলে।কয়েক যুগেরও বেশী সময় ধরে বিশ্বব্যাপী প্রবাসীদের ন্যায্য অধিকার সমূহ আদায়ে প্রবাসীদের প্রানের দাবীগুলো চমৎকার কায়দায় লিপ সার্ভিস ছাড়া অনেকটা উপেক্ষিত বললেই চলে।প্রবাসীদের সাথে দেশের অর্থনীতির আরেক প্রান কৃষক,কলকারখানার ও গার্মেন্টস শ্রমিকদের সাথে সরকারের আচরনের ক্ষেত্রে বেশ সান্নিধ্য লক্ষ্য করার মতো।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের উত্থাপিত প্রানের দাবী গুলো যা উল্লেখযোগ্য তা হচ্ছে:১)বিভিন্ন সেক্টরে বিদেশীদের পরিবর্তে জন্মসূত্রের প্রবাসী দেশপ্রেমিক দ্বৈত নাগরিক  বা প্রবাসী বাঙালী বিশেষজ্ঞ,প্রশাসক ও দক্ষ কর্মী নিয়োগের নিশ্চয়তা বিধান ও তদনুযায়ী জাতীয় উন্নয়নে শরীক হওয়ার জন্য উৎসাহিতকরন।কোটা ও ঘোষনা প্রদান।২)বিভিন্ন দেশগুলিতে বাঙালী অধ্যূষিত শহরগুলিতে বাংলাদেশ বিমানের আগমন নির্গমন সুনিশ্চিত করা।বিমানকে লাভজনক প্রতিষ্টানে পরিনত করতে প্রবাসী বিশেষজ্ঞ নিয়োগের বিষয়টি যেমন উপেক্ষিত-তেমনি এতো প্রবাসী বিশেষজ্ঞ থাকা স্বত্তেও অবিশ্বাস্য বেতনে বিদেশী নিয়োগের বিষয়টি প্রশ্নবোধকও বটে।৩)বাংলাদেশের বিমান বন্দরগুলোতে প্রবাসীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা।সকল প্রকার হয়রানী সমূলে উৎপাঠনের ব্যবস্থা গ্রহন।গন্তব্যস্থানে না পৌঁছানো পর্য্যন্ত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করা।৪)বাংলাদেশে প্রবাসীদের সকল সম্পদের সুরক্ষার নিশ্চয়তা বিধান করা।অনলাইনে জমিজমা,বাড়ীঘর সহ সকল কিছুর ট্যাক্স প্রদান করার সুযোগ প্রদানের লক্ষ্যে সূব্যবস্থা গ্রহন।সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্টার ক্ষেত্রে কালবিলম্ব না করে জাতীয় স্বার্থে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের নিশ্চয়তা বিধান।

যাতে প্রবাসীদের সম্পদের উপর দূর্বৃত্তরা হস্তক্ষেপ করার সাহস না পায়।৫)বিদেশে দেশীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষনা করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মূলধারার রাজনীতিতে অংশগ্রহনের জন্য প্রবাসীদের দলমত নির্বিশেষে উৎসাহ প্রদান ও তদনুযায়ী আইন প্রনয়ন।৬)বিশ্বব্যাপী প্রবাসীদের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করা।পার্লামেন্টে প্রবাসীদের জন্য সংখ্যানুপাতে প্রতিনিধি নির্বাচনের দ্রুত সূব্যবস্থার নিশ্চয়তা বিধান ও তা কার্য্যকর করা।দেশের যে অবস্থা-দলীয় রাজনীতির বাইরে জাতীয় স্বার্থে দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট সময়ের দাবী।অন্তত: যাতে কোন না কোনভাবে যে কোন মূল্যে প্রবাসীরা প্রতিনিধিত্বের সূযোগ পেতে পারে।৭)বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা বিবেচনায় জেলা

(দেশ ও প্রবাসের মেলবন্ধনের শেষ পর্ব)

Related posts