September 24, 2018

দ্বিপক্ষীয় কাঠামোতে কাজ করতে আগ্রহী ভারত

ঢাকাঃ  বাংলাদেশে উগ্রপন্থিদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন ভারত। সামপ্রতিক সময়ে উগ্রপন্থিদের সহিংস আক্রমণের যেসব ঘটনা ঘটেছে তাতে প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের যথেষ্ট উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে বলে জানিয়ে ঢাকা সফর করে যাওয়া দেশটির বিদেশ সচিব এস জয়শঙ্কর বলেছেন, এদের দমনে বাংলাদেশ সরকার যেসব উদ্যোগ নিচ্ছে তাতে ভারতের দৃঢ় সমর্থন রয়েছে। সন্ত্রাসবাদ এবং উগ্রপন্থা মোকাবিলায় বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মধ্যে ভবিষ্যতেও ঢাকা-দিল্লি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে বলে জানান তিনি। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে জয়শঙ্কর এসব কথা বলেন। সচিবের দু’দিনের ঢাকা সফর নিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন যে বার্তা দিয়েছে সেখানেও বিষয়টি উল্লেখ ছিল।

হাইকমিশনের বার্তায় সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রপন্থার সঙ্গে সামপ্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ‘সমাজের ঝুঁকির মুখে থাকা অংশের’ ওপর আক্রমণের ঘটনাগুলো মোকাবিলায় ভারতের দৃঢ় সমর্থনের কথাও উল্লেখ করা হয়। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনের বৈঠক শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে এস জয়শঙ্কর বলেন, সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রপন্থা দমনে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় যে কাঠামো রয়েছে তা ভবিষ্যতে আরো শক্তিশালী করা হবে। সচিব বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি এই বার্তা দিতে যে, সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার যে লড়াই করছে তাতে ভারত সরকারের দৃঢ় সমর্থন রয়েছে। এটি এমন একটি ইস্যু যেখানে প্রতিবেশী হিসেবে আমাদেরও সরাসরি উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি।

ভবিষ্যতেও এনিয়ে দ্বিপক্ষীয় এবং ঘনিষ্ঠভাবে আমরা কাজ করে যাবো।’ ভারতের বিদেশ সচিবের বিদায়ের পর একই ভেন্যুতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। তিনি কিছু প্রশ্নের জবাব দেন। সচিব জানান, ভারতের বিদেশ সচিবের নেতৃত্বাধীন দেশটির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সব বিষয়েই কম বেশি আলোচনা হয়েছে। তিস্তা চুক্তি, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগসহ অনেক বিষয়ে কথা হয়েছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান সচিব। তিস্তা নিয়ে কি কথা হয়েছে? জানতে চাইলে সচিব শহীদুল হক বলেন, চুক্তিটি কিভাবে সম্পাদন করা যায় তা নিয়ে কথা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ আশাবাদী বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বৈঠকে অংশ নেয়া কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, ২০১৫ সালের জুন মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকালে দু’দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি, সমঝোতা ও অঙ্গীকারের বাস্তবায়নের বিষয়ে সচিব পর্যায়ের বৈঠকে পর্যালোচনা হয়েছে। সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টার আলোচনায় মোদির সফরের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অগ্রগতিতে উভয়ের তরফে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। ওই সফরের ১৪টি প্রতিশ্রুতির ৮টি এরই মধ্যে পূরণ হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ভারতে ব্যান্ডউইথ রপ্তানি, ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পালাটানা প্ল্যান্ট থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংযোগ, ভারত বেসরকারি সেক্টরকে সম্পৃক্ত করে বাংলাদেশে আরো বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাব্যতা যাচাই, জ্বালানি সেক্টরে সহযোগিতা বৃদ্ধির সম্ভাব্যতা পর্যালোচনা এবং ডিজেল ও এলপিজি রপ্তানির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বিষয়ে সেখানে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টি মোটা দাগে পর্যালোচনায় এসেছে বলে জানা গেছে।

বৈঠকের আলোচ্যসূচির বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, সেখানে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সকল দিক নিয়ে কথা হয়েছে, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এসেছে। উভয়ে খুবই সক্রিয়, গতিশীল এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শেখ হাসিনাকে ভারতে আমন্ত্রণ: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আগামী অক্টোবরে দেশটির গোয়ায় অনুষ্ঠেয় পাঁচ দেশের সংগঠন ব্রিকসের সম্মেলনে অংশ নিতে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ঢাকা সফররত ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শঙ্কর মোদির এই আমন্ত্রণপত্র প্রধানমন্ত্রীকে পৌঁছে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তা গ্রহণ করে ভারত সফরের ব্যাপারে নীতিগতভাবে সম্মতিও দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, মোদি চান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার  সাত দেশের জোট ‘বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল  টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের’ (বিমসটেক) সদস্য  দেশগুলো ব্রিকসের সম্মেলনে অংশ নিক। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার জোট ব্রিকসের অষ্টম শীর্ষ সম্মেলন ভারতের গোয়ায় হওয়ার কথা রয়েছে।

সন্ত্রাস দমনে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের সহযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন: এদিকে গতকাল দিনের শুরুতে ভারতের বিদেশ সচিব ড. এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশের শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। হোটেল সোনারগাঁওয়ের ঝর্ণা রেস্টুরেন্টে ওই প্রাতঃরাশ মতবিনিময় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নানা বিষয় আলোচনায় স্থান পায় বলে জানা গেছে। ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া একাধিক প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সেখানে বাংলাদেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দিল্লির নিরাপত্তা সহযোগিতার ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, নিরাপত্তা নিয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র্র একসঙ্গে কাজ করার কথা কাগজে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন জয়শঙ্কর। এর কোনো ভিত্তি আছে বলে মনে হয় না।

তিনি আরো বলেন, ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে তাদের বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন সমস্যার কথা উঠে এসেছে। দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক সম্পর্ক কীভাবে এগিয়ে নেয়া যায়,  সেটি নিয়ে কথা হয়েছে। তবে ওই মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। মানবাধিকার নেত্রী সুলতানা কামাল বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার জন্য জয়শঙ্কর এসেছেন। বাংলাদেশের সন্ত্রাস দমনে নিরাপত্তা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার বিষয়টি এখানে এসে শুনেছেন বলে জানিয়েছেন জয়শঙ্কর। এ ব্যাপারে তার কোনো মন্তব্য সেভাবে ছিল না বলে জানান তিনি। সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান বলেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করবে বলে খবর বেরিয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ড. জয়শঙ্কর বলেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত কীভাবে কাজ করবে? ‘এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, আমরা তো বলিনি।’

ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া একজন অতিথি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জয়শঙ্কর বলেছেন, আমরা তো আমাদের দেশের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে কাজ করি। বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে যারা নিহত হচ্ছে এবং যারা হত্যা করছে তারা সবাই বাংলাদেশি। সুতরাং এখানে এক্সটারনাল ইনফ্লুয়েন্সের প্রয়োজন জরুরি বলে মনে হয় না।’

অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট নাগরিকদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী,  লে. জে. (অব.) হারুন-অর রশিদ, ইনস্টিটিউশন অব পিস-কনফ্লিক্ট ল’ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মো. আবদুর রশিদ, ঢাবি’র সাবেক ভিসি অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর, এস নন্দা, সাধনার ডিরেক্টর লুবনা মারিয়াম, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক জাফর সুবহান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। মানবজমিন

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন ডেরি/১৩ মে ২০১৬

Related posts