November 15, 2018

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক বাংলাদেশী নারী শ্রমিক রয়েছেন লেবাননে

Untitled-1

বাবু সাহা,লেবাননঃ মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান ও নিকটাত্মীয়দের রেখে বহুদূরে বিদেশের মাটিতে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকের তিলে তিলে অর্জিত অর্থ দিয়ে গড়ে ওঠা রেমিটেন্স আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। দারিদ্র বিমোচন থেকে শুরু করে বাজেট তৈরি পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে এই রেমিটেন্স প্রধান নিয়ামকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ৯৪ লাখ বাংলাদেশী অভিবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ সর্বোচ্চ ১৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে।

বাংলাদেশী মুদ্রায় হিসেব করলে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় সোয়া লাখ কোটি টাকা। ২০১৫ অর্থ-বছরে অভিবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থের হিসাব থেকে এই রেকর্ড পরিমাণ রেমিটেন্স আয়ের চিত্র জানা যায়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৯৪ লাখ বাংলাদেশী অভিবাসী তাদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত আয় থেকে ২০১৫ অর্থবছরে ১৫.৩১ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। বাংলাদেশী মূদ্রায় হিসাব করলে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ যাবত এটাই সর্বোচ্চ রেমিটেন্স আয়ের রেকর্ড।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী,আবুধাবির পর সর্বোচ্চ সংখ্যক বাংলাদেশী নারী শ্রমিক রয়েছেন লেবাননে। বর্তমানে বিদেশে কর্মরত বাংলাদশী নারী অভিবাসীদের ২৪.৩ শতাংশই রয়েছেন শুধুমাত্র লেবাননে। যদিও সবমিলিয়ে দেশটিতে বিদেশে কর্মরত মোট বাংলাদেশী অভিবাসীদের মাত্র ১.৩ শতাংশ অবস্থান করছেন।

সবশেষ জরিপ অনুযায়ী,লেবাননে প্রায় ৯৭ হাজার বাংলাদেশী নারী শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। তবে,নারী অভিবাসী তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও সার্বিক হিসাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিক রয়েছেন সৌদি আরবে। মোট অভিবাসীদের ২৮.২ শতাংশই কাজ করছেন শুধুমাত্র সৌদিতে। ২০১৫ সালের জুন মাসের শেষে বিএমইটির দেয়া এক হিসেবে বলা হয়, বর্তমানে ২৬ লাখেরও বেশি বাংলাদেশী অভিবাসী সৌদিআরবে কর্মরত রয়েছেন। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া হিসাব অনুযায়ী,শুধুমাত্র সৌদি আরব থেকে ২০১৪ সালে বাংলাদেশের রেমিটেন্স আয় হয়েছে ৩.১২ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৪ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কেবল জনশক্তি পাঠানোতেই দায়িত্ব শেষ নয়, প্রয়োজন সার্বক্ষণিক মনিটর। শ্রমশক্তির মর্যাদা, স্বার্থরক্ষা, নিরাপত্তা, কমিউনিটির সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের জন্য তদারকি। এ ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে প্রশিক্ষণ ছাড়াই শ্রমশক্তি রপ্তানির বিষয়টিও জটিলতা বাড়ায়। এ কথা অনস্বীকার্য যে, দেশের কর্মক্ষম মানুষের আবেগ আছে। তাদের আবেগকে কাজে লাগানো সরকারি দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে সরকারি ব্যাপক উদ্যোগ দরকার। প্রয়োজন অঞ্চলভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নেয়া। এগুলো করা হচ্ছে না। ফলে আবেগী কর্মক্ষম যুবকগুলো দালালদের আশ্রয় নিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

বিশ্বব্যাংকের হিসেবে, বিশ্বে প্রবাসী-আয়ের শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন সপ্তম। দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করার প্রত্যয়ে অভিবাসী কর্মীরা যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, তাদের অবদানকে কী মূল্যায়ন করা হচ্ছে? অভিবাসীদের কল্যাণে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের আত্মশ্লাঘার পাশাপাশি আমাদের আত্মসমালোচনাও জরুরি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ সরকার জনশক্তি রফতানি খাতে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার কথা বারবার বললেও বাস্তবতা হচ্ছে প্রতি বছর-ই হাজার হাজার শ্রমিক প্রতারিত হয়ে দেশে ফিরে আসেন।

ঠিক কি পরিমাণ অভিবাসী শ্রমিক এমন সমস্যার শিকার হন সেটার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও অভিবাসী শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে কর্মরত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, প্রতি বছর এমন প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরছে অন্তত ৫০ হাজার শ্রমিক। এই বাস্তবতায় পরভূমে অর্থ উপার্জনে গিয়ে আমাদের নাগরিকেরা প্রতারিত হচ্ছে কি না, অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে কি না সেই দিকেও সতর্ক নজর দেয়া আবশ্যক। বিশ্ব অর্থনীতির একটি বিরাট অংশ নির্ভর করে অভিবাসীদের শ্রমের উপরে।

বাংলাদেশের বাড়তি জনসংখ্যার হিসেবে শ্রম অভিবাসন দেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় খাত। ব্যাপক এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকারের দায়িত্বশীলদের তৎপরতার ঘাটতি শুরু থেকেই। দেশের বৃহৎ ও সম্ভাবনাময় এ খাতটির দিকে সরকারের মনোযোগ দেয়া জরুরি। এর যথাযথ ব্যবহারে দেশের সমৃদ্ধি সম্ভব। এক্ষেত্রে সময়োপযোগী সরকারি উদ্যোগ ও কার্যকর শ্রমব্যবস্থাপনা প্রত্যাশিত।।

Related posts