November 18, 2018

দেশের প্রতিটি গুম খুনের জন্য ভবিষ্যতে জবাবদিহি করতে হবে – বিএনপি

নূরে আলম লন্ডন থেকেঃ লন্ডনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, প্রতিদিন ঘর থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে মানুষকে গুম করে ফেলা হচ্ছে অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে তারা কিছুই জানে না। আগামী দিনে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা হলে এখন যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বে রয়েছেন তাদেরকে প্রতিটি এলাকার প্রতিটি গুম খুনের ঘটনার জবাব দিতে হবে।

বুধবার পূর্ব লন্ডনের দ্যা রয়েল রিজেন্সি অডিটরিয়ামে বিএনপির ৩৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে যুক্তরাজ্য বিএনপি আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন- বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সভায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা পদক কেড়ে নেয়ার অপচেষ্টা, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, ফারাক্কার বাঁধ ভেঙে দেয়ায় উত্তরাঞ্চলে বন্যা, আওয়ামী লীগের জঙ্গি কানেকশনসহ দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির উপর প্রায় পৌনে একঘন্টা বক্তব্য করেন বক্তারা। বক্তাদের বক্তব্যে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সাহস ও সতর্কতার সঙ্গে প্রস্তুতি নিতে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আহবান জানান।

সমাবেশে বলা হয়, বর্তমান অবৈধ সরকার অগণতান্ত্রিক এবং জনবিচ্ছিন্ন হওয়ায় তারা এখন জনগণকে তথাকথিত উন্নয়নের গল্প শোনায়। উন্নয়নের নামে সুন্দরবন ধ্বংস করে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা যাবে না।

সমাবেশে আরো বলা হয়, নিজ নিজ দেশকে আন্তর্জাতিক বিশ্বে তুলে ধরার জন্য প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব কিছু “ঐতিহ্য বা নিদর্শন” থাকে। তেমনি বাংলাদেশের রয়েছে সুন্দরবন। শেখ হাসিনার কোথাও কোনো কমিটমেন্ট থাকলে সেটা সুন্দরবনের বিনিময়ে হতে পারে না।

একযোগে ফারাক্কার সকল বাঁধ খুলে দেয়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে মারাত্মক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে সমাবেশে বলা হয়, বর্তমান অবৈধ সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় এমন জনদুর্ভোগেও শেখ হাসিনা কিংবা তার অবৈধ সরকার দেশ ও জনগণের পক্ষে একটি বাক্যও সাহস করতে উচ্চারণ করতে পারেছে না।

সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রফেসর ডক্টর এম এ মালেকসহ অনেকে বক্তৃতা করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন যুক্তরাজ্য বিএনপি’র সভাপতি এম এ মালিক। সভা পরিচালনা করেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কয়সর এম আহমেদ।

সমাবেশে বলা হয়, ৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে স্বাধীনতাকামী জনগণের কাছে দিশারীর ভূমিকা রেখেছিলেন জিয়াউর রহমান। একইভাবে পরবর্তীতে দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে গঠন করেছিলেন বিএনপি।

সমাবেশে আরো বলা হয়, জনগণ বিশ্বাস করে বিএনপির মাধ্যমেই দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন, মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বিধান সম্ভব। তাই যতবারই জনগণ নিরপেক্ষভাবে ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছে, তারা বারবার বিএনপিকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ করে দিয়েছে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই সমাবেশে বলা হয়, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ছিলেন সবদিক থেকেই একজন সফল ব্যক্তিত্ব। শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের শাসনামল তুলনা করলে জিয়াউর রহমানই সফল।

সমাবেশে আরো বলা হয়, ৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সকল দলকে নিষিদ্ধ করেছিলেন আর ৭৬ সালে জিয়াউর রহমান সকল দলকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

সমাবেশে বলা হয়, আওয়ামী লীগ তাদের দলকে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল বলে দাবি করে অথচ শেখ মুজিব এই দলটি নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। তাহলে কি শেখ মুজিব এই দলটিকে রাজাকারের দল মনে করতেন? নাকি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কথিত দলটিকে নিষিদ্ধ করে দিয়ে শেখ মুজিবই রাজাকারী করলেন?

লন্ডনের সমাবেশে বলা হয়, ৭১ সালে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ দাবি করে জিয়াউর রহমান নাকি শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছেন। এটি যদি সত্য বলে ধরে নেয়া হয়, তাহলে তো প্রমাণ হয়, জিয়াউর রহমানকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসাবে শেখ মুজিব মেনে নিয়েছেন। কারণ প্রতিবার প্রতিটি ঘোষণায় নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসাবেই জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পরবর্তীতেও শেখ মুজিব কখনোই এর বিরোধীতা করেননি।

বিএনপির সমাবেশে বলা হয়, শহীদ জিয়ার সাফল্যের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে না পেরে আওয়ামী লীগ এখন শহীদ জিয়া এবং জিয়া পরিবারকে তাদের অপপ্রচারের টার্গেটে পরিণত করেছে। জনম্যান্ডেটহীন সরকার নাকি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা পদক প্রত্যাহার করতে চায়। অথচ দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং গৌরবজনক “স্বাধীনতা পদক” এবং “একুশে পদক” প্রবর্তণ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান বীরোত্তম।

সমাবেশে অভিযোগ করে বলা হয়, শেখ হাসিনা রাজনৈতিক স্বার্থে আদালতকে ব্যবহার করছে। তিরি বলেন, রাজনৈতিক ইস্যু আদালতে নেয়া ঠিক নয়। ইতিহাস রচনার ভার আদালতের কাছে দেয়া উচিৎ নয়। তিনি বলেন, কার শাসনামল ভালো কিংবা কার শাসনামল মন্দ সেটি বিচারের ভারও আদালতের হাতে দেয়া সমীচীন নয়। বরং সেটি বিচার করবে জনগণ, সেই বিচার হবে জনতার আদালতে।

সমাবেশে আরো অভিযোগ করে বলা হয়, বর্তমান আওয়ামী লীগের মন্ত্রী এমপিরাই সংসদে যেসব বিচারপতিদের নেতিবাচক কর্মকান্ড নিয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন সেই ধরণের বিচারপতিরা রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে যেভাবে অতিমাত্রায় উৎসাহী হয়ে রাজনৈতিক বিশৃংখলা সৃষ্টিতে উপাদান যুগিয়েছেন ভবিষ্যতে তাদেরকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে না এমন গ্যারান্টি দেশের আইন কিংবা সংবিধানে দেয়া নেই। আওয়ামী লীগ জনগণের রায়ের মুখোমুখি হতে ভয় পায়।

দেশে চলমান জঙ্গি ইস্যু নিয়ে সমাবেশে বলা হয়, ১৯৯৬ থেকে ২০০০ শেখ হাসিনা সরকারের সময় দেশের সবচেয়ে বড় দুই জঙ্গি শায়খ আব্দুর রহমান এবং মুফতি হান্নানের উত্থান। শায়েখ আব্দুর রহমান ছিলেন শেখ হাসিনার বর্তমান অবৈধ সরকারের পাটমন্ত্রী এবং আওয়ামী যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মীর্জা আজমের আপন ভগ্নিপতি। অপরদিকে জঙ্গি মুফতি হান্নানের বাড়ী এবং শেখ হাসিনার বাড়ী একই এলাকায় গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়। ক্ষমতা থাকার সময় ১৯৯৭ সালের ৩০ জানুয়ারি শেখ হাসিনা মুফতি হান্নানের ছোট ভাই গোপালগঞ্জের ছাত্রলীগ নেতা মুন্সী আনিসুল ইসলামকে গোপালগঞ্জে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পনগরীর ৭ নম্বর প্লটে চার হাজার ৫০০ বর্গফুট জমি বরাদ্দ দিয়েছিলেন। অপরদিকে গত জুলাই মাসে গুলশানে হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার নেতৃত্বদানকারী রোহান ছিলো ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা ইমতিয়াজের ছেলে। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় দেখা যায়, রাহমান থেকে রোহান সব জঙ্গিই আওয়ামী ঘরানার।

বিএনপির ৩৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশে বলা হয়, আওয়ামী লীগের জঙ্গি কানেকশন থাকার পরও দেশের স্বার্থে জঙ্গি দমণে বিএনপি জাতীয় ঐক্যের আহবান জানিয়েছিলো। কিন্তু সবাই জানেন, আওয়ামী লীগ ঐক্যের পক্ষে নয়।

বর্তমান সরকারকে ব্যাংক ডাকাত সরকার হিসাবে উল্লেখ করে সমাবেশে বলা হয়, এই ব্যাংক ডাকাত সরকারের আমলে দেশের সরকারী বেসরকারী প্রতিটি ব্যাংক বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিণত হয়েছে লুটপাটের কেন্দ্রে।

সমাবেশে গত ১৮ আগষ্ট একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত একটি রিপোর্টের উদ্বৃতি দিয়ে বলা হয়, এনবিআর বলেছে, তারা গত ৫ অর্থবছরের ৪৭ হাজার ২২৩ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করে সমুদয় টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে। অথচ অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও মহাহিসাব নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় বলছে, এই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা হয়নি।

সমাবেশে প্রশ্ন করে বলা হয়, কে দেবে জনগণের ট্যাক্সের ৪৭ হাজার ২২৩ কোটি টাকার হিসাব? গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাচার হয়ে আটশ’ কোটি টাকা কেমন করে গেলো ফিলিপাইনের ক্যাসিনোতে। কে দেবে এসব টাকার হিসাব?

সমাবেশে বলা হয়, দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতেই আন্দোলন করতে গিয়ে সারাদেশে দলের হাজারো নেতাকর্মী গুম খুন হয়েছেন। হামলা মামলায় নির্যাতন নীপিড়নের শিকার হয়েছেন।

দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সমাবেশে বলা হয়, দলের এইসব নেতাকর্মীদের কি অপরাধ? তাদের একটাই অপরাধ, তারা ভোটারবিহীন বর্তমান অগণতান্ত্রিক সরকারের বেআইনী কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করেছে। একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করেছে।

সমাবেশে হতাহত ও নির্যাতিতদের জন্য আল্লাহর দরবারে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সহ-সভাপতি আখতার হোসেন।

Related posts