February 16, 2019

দিন দিন চলনবিল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মিঠা পানির মাছ

জাকিরুল ইসলাম, সিরাজগঞ্জ থেকে: দিনের পর দিন চলনবিল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে নানা প্রজাতির মিঠা পানির মাছ। একসময় ফাল্গুন-চৈত্র মাসে বর্ষায় থাকা পুকুরের মাছ দেখে চোখ জুড়ালেও এখন আর সেসকল দেশীয় মাছ দেখা যায়না। কিছুদিন পরেই চলনবিলে আসছে ভরা বর্ষা মৌসুম। বর্ষায় পুকুর ও খাল-বিল পানিতে থৈ-থৈ করে। সেই পানিতে মৎস্য জীবীদের নির্ঘুম রাত জাগার কথা। ভোরের আলো ফুটতেই গ্রামের ছোট-ছোট হাটবাজারে আর পাড়া-মহল্লায় জেলেদের হাঁক-ডাকে মুখরিত হওয়ার সুদিন ফুরাতে বসেছে। ‘মাছে ভাতে বাঙ্গালী” অতীত ঐতিহ্য আর প্রাকৃতিক মাছ হারিয়ে যেতে বসেছে। চলনবিলের মিঠা পানির মাছ মানব দেহের জন্য খুবই উপকারী।

মানব দেহে প্রাণীজ আমিষের ৭৮ভাগ পুরণে সক্ষম ছোট মাছ। দেশীয় মাছের অভাবে জনজীবনে পুষ্টিহীনতার প্রকোপ বাড়ছে বৈ কমছেনা। বিল, হাওর, নদ-নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়া, নাব্যতা হ্রাস, খাল-বিলের গভীরতা কমে যাওয়া, মা মাছ নিধন, জলাশয় দুষণ, পানিতে কীটনাশক প্রয়োগ, রাক্ষুসে মাছের চাষ, মৎস্য আইন অমান্য ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই ছোট মাছ বিলুপ্তির কারণ বলে মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়। চলনবিলের দেশীয় মাছ ইতোমধ্যেই বাজারে নিম্নবিত্ত ও মধ্য বিত্তের ত্রয়ক্ষমতার বাইরে প্রায়। সাধ ও সাধ্যের মিলন-মেলায় ছোট মাছের বাজারে এসকল মানুষের শুধু চেয়ে থেকে বিত্তবানদের দাম হাকা। প্রতিনিয়তই বড় মাছের চেয়ে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছের বাজারে ভীড় থাকলেও উচ্চ মূল্যের বাজারে স্বল্প আয়ের মানুষের হয়েছে মহাবিপদ। সরেজমিনে দেখা যায়, সিরাজগঞ্জের তাড়াশের মহিষলুটি, মান্নান নগর, কুন্দুইল এর বেশীর ভাগ মৎস্য ব্যবসায়ীরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। নিজেদের জাল থাকলেও জল নেই। নেই খাল-বিল নদ-নদীতে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাকৃতিক মাছ যা দেহ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বাজারে আয়রণ, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন এ সমৃদ্ধ চিরচেনা ছোট মাছের দেখা পাওয়া ভাগ্যেও ব্যাপার ।

চাপলা, চেলাপুটি, খলসা, পুটি, কৈ, সিং, মাগুর, রুপচাদা, ডানকোনা, রয়না, বেলে, পিয়ালী, সরপুটি প্রজাতির দেশীয় মাছ বাজারে নেই বললেই চলে। তবে ছোট চিংড়ি, পুটি, বাইম ও চাদা মাছের দেখা মিললেও একজন মৎস্যজীবীর নিকট ২ কেজির বেশি কল্পনা করা যায়না। দামও সাইজ ভেদে ১শ’ থেকে ৮শ’ টাকা কেজি। দেশীয় প্রজাতির কৈ, সিং ও জিয়ালের কেজি ৫ থেকে ৮শ’ টাকা হাকানো হলেও বাজারে পর্যাপ্ত নেই। হাতে গোনা দু’চার কেজি চাপলা, পিয়ালী, টেংরা, বিক্রি হলেও প্রতি কেজি ৭ থেকে ৮শ’ টাকা। শরীরের ৭৮ভাগ প্রাণীজ আমিষের চাহিদা পুরনে সক্ষম এ সকল ছোট প্রজাতির মাছ সংকটের অন্যতম কারণ পানি ও নদ-নদীতে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার ও ‘মা’ মাছ ধরাকে দায়ী করা হলেও চলনবিল এলাকার বেশ কয়েকজন জেলে জানান, স্বল্প মেয়াদিতে জলাশয় ইজারা দেয়ায় মৎস্য চাষিরা বছর শেষে খামারে বিষ প্রয়োগ করে অতি অল্প সময়ে বেশী লাভের আশায়, রুই, কাতলা, মৃগেলসহ বড় মাছের চাষ করে। যে কারণে প্রাকৃতিক মাছের ডিম ছাড়ার সময় বেশীরভাগ ছোট মাছ মারা পড়ে যায়। জেলেদের পাশাপাশি গ্রামীণ নি¤œবৃত্ত ও মধ্যবৃত্ত অনেকেই সখের বশে কিংবা জীবিকার তাগিদে এ পেশায় ঝুঁকে পড়লেও আশানুরুপ মাছ নেই।

দোয়ারি, ঘুনি, ধর্মজাল, বেড়াজাল, পাতজাল, খেপলা, কারেন্টজাল ব্যবহার করে ছোট প্রজাতির বিভিন্ন মাছ ধরলেও আজ খাল-বিল ও মাঠে-ঘাটে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় এসব মাছ ধরার যন্ত্রের চাহিদাও কম। চলনবিলে শিয়াল, ভোদর, সাপ, কচ্ছপ, মাছরাঙা, বক, চিল, পানকৌড়ির আক্রমনেও কয়েক প্রজাতির ছোট মাছ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। এক সময় চলনবিলের প্রত্যন্ত পল্লীর মানুষ, চাহিদা মিটিয়ে বর্ষার মৌসুমে অতিরিক্ত মাছ শুকিয়ে শুটকিজাত করে সংরক্ষণ করলেও এখন তা শুধুই কল্পনা। অথচ ৯০এর দশকে এর কমতি ছিলনা। মাছে-ভাতে বাঙ্গালী অতীত ঐতিহ্য হারিয়ে বিলুপ্ত প্রায় ২০ প্রজাতির ছোট মাছ সংকটে পড়া শুধু চলনবিলই এলাকাই নয়, দেশের বহু এলাকায় এর প্রভাব লক্ষ্যনীয়। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা জানান, দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বর্ষা মৌসুমে ‘মা’ মাছ নিধন, প্রাকৃতিক মাছের প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ, জেলেদের এসব মাছ ধরা থেকে বিরত রাখা, কীটনাশক ও ভারতীয় থায়োডিন ব্যবহার কমানো ও উন্মুক্ত জলাশয়ে দীর্ঘ মেয়াদী ইজারার মাধ্যমে প্রাকৃতিক মাছ সংরক্ষণ করা সম্ভব। তাছাড়া এর উপকারীতা সর্ম্পকে জনসচেতনা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা বাড়ানো বিশেষ প্রয়োজন।

জাকিরুল ইসলাম,
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি।

Related posts