September 21, 2018

দারিদ্র্য বিমোচনে আত্মতুষ্টির অবকাশ নেই

প্রান্তজনের সামাজিক সুরক্ষা শীর্ষক গোলটেবিলে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করছেন হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির আয়োজনে আজ ব্র্যাক সেন্টারে এই গোলটেবিল অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বক্তব্য রাখেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান।

আয়েশ আক্তার রুবিঃ  গত ১৮ জুন,শনিবার, বাংলাদেশে বেকার সমস্যার মহামন্দার কাল বিরাজ করছে। দিনে দিনে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। বেকারের পরিসংখ্যান নিয়ে সরকার প্রদত্ত তথ্য মিথ্যা। নানা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচীর পরেও এখনো ভিক্ষাবৃত্তি বাড়ছে। লাখ লাখ লোক বস্তিতে বসবাস করছে যারা সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের বাইরে রয়েছে। এখনো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অনিরাপদ পানি, আর্সেনিক এবং লবণাক্ততার সমস্যার সম্মুখীন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে পুরোপুরি সামাজিক সুরক্ষা বলয়ে আনা এখনো সম্ভব হয়নি।

আমাদের দারিদ্র বিমোচন নিয়ে আত্মতুষ্টির অবকাশ নেই। সার্কভূক্ত অন্য ৫টি দেশের পরে বাংলাদেশ নিন্ম মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যা নিয়ে উল্লাস করার কোন ভিত্তি নেই। আজ ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত “প্রান্তজনের সামাজিক সুরক্ষা: অর্জন ও করণীয়” শীর্ষক এক গোলটেবিলে প্রধান অতিথি হিসেবে ড. আকবর আলী খান এসব কথা বলেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র চেয়ারপার্সন হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।

রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এই গোলটেবিলে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের অধ্যাপক ও প্রবীণ হিতৈষী সংঘের মহাসচিব ড. এএসএম আতীকুর রহমান, সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ডায়লগ-এর মহাসচিব ড. এসএম মোর্শেদ, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন এবং ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশনের মহাসচিব মোস্তাফিজুর রহমান খান।

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ড. আকবর আলী খান বলেন, যদিও আওয়ামী লীগ বিএনপি দুই সরকারই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচীকে গুরুত্ব দিয়েছে, তবুও এখনো এ কর্মসূচী পুরোপুরি সফল হয়নি। সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি ১৯৯৬ সালে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত থাকার পরেও আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর এ কর্মসূচীর গুরুত্ব অনুধাবন করে এর কার্যক্রম শুরু করে। তিনি বলেন, যেসব খাতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচী সফল হয়েছে এবং যেসব খাতে সফল হয়নি সেগুলো খুঁজে বের করতে হবে এবং বাংলাদেশে কত লোকের সামাজিক সুরক্ষা প্রয়োজন সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রয়োজন। কেবল সামাজিক সুরক্ষা নয়, বেকার ও প্রান্তজনের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। একমাত্র সরকারের পক্ষে সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়, এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে।

মূল প্রবন্ধে  হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে প্রস্তাবিত বাজেটে ৫.২% বরাদ্দ করা হয়েছে যা গত অর্থবছরের তুলনায় কম। গত অর্থবছরে এখাতে বরাদ্দ ছিল ৫.৭%। টাকার অংকে এ বছরে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ৩০০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ বেশি হলেও বাজেটে খাতভিত্তিক বিবেচনায় এ বরাদ্দ বাড়েনি। তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সুরক্ষা খাতের উপকারভোগীর তালিকা তৈরীতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারগণের প্রভাব থাকে।

প্রান্তজনের সামাজিক সুরক্ষা শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান। পাশে গোলটেবিল আলোচনার মুলপ্রবন্ধ উপস্থাপক হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির আয়োজনে আজ ব্র্যাক সেন্টারে এই গোলটেবিল অনুষ্ঠিত হয়।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক বিনা ভোটে নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ কতটুকু স্বচ্ছতার সাথে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর উপকারভোগী নির্ধারণ করতে পারবেন তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে অতি দরিদ্র মানুষের জন্য কর্মসূচী বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সব সরকারই ইতিবাচক ভূমিকা রাখায় সামাজিক সুরক্ষা খাত শক্তিশালী হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর উপকারভোগীদের মধ্যে প্রকৃত সুবিধাভোগী বহির্ভূত ব্যক্তিরাও এ সুবিধা পাচ্ছে। অথচ এখনো অসংখ্য দুস্থ, দরিদ্র ও পশ্চাৎপদ জনগণ এ সুবিধার বাইরে রয়েছে। তাই এ কর্মসূচীকে দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রেখে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করেন জনাব কিরণ। তিনি আরো বলেন, এখাতে সুশাসন নিশ্চিত করা না হলে প্রান্তজনের সুরক্ষা সম্ভব নয়। সরকারের যে কোন কল্যাণমুখী কর্মসূচীর সফলতার জন্য সুশাসন জরুরী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এএসএম আতীকুর রহমান সামাজিক সুরক্ষায় সরকারের নানামূখী পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে দেশে অতি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, সামাজিক সুরক্ষায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নানা বাস্তবমূখী কর্মসূচী গ্রহণের ফলে এখাত আরো শক্তিশালী হচ্ছে।

ড. এস এম মোরশেদ সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সোস্যাল প্রটেকশন ইউনিট অবিলম্বে চালু করার কথা বলেন। তিনি আরো বলেন শ্রমজীবী মানুষদের জীবন ঘনিষ্ঠ প্রকল্পগুলো শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন বলেন, সম্ভাবনার সকল সূচকেই আমরা উন্নতি লাভ করলেও আমাদের এখন টেকসই পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। আর এজন্য সার্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার কথা ভাবতে হবে।

মোস্তাফিজুর রহমান খান বলেন আর্থ-সামাজিক খাতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। তবে এখনো অতি দরিদ্র, দুস্থ ও পশ্চাৎপদ মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচীর আওতায় সকল প্রান্তজনের অন্তভূক্তি নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি।

এছাড়াও তিনি আগামী অর্থবছর হতে সরকারী কর্মকর্তা/ কর্মচারীদের  পেনশন বাবদ বরাদ্দকৃত অর্থকে সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যয় থেকে আলাদা করা, ঘধঃরড়হধষ ঝড়পরধষ ঝবপঁৎরঃু ঝঃৎধঃবমু এর আলোকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা এবং ভাসমান শ্রমজীবী মানুষ, কর্মক্ষেত্রে দূর্ঘটনায় আহত -নিহত শ্রমিকের পরিবার, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত শিশুকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচীর আওতায় অন্তর্ভূক্ত করার সুপারিশ করেন।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি ১৮ মে ২০১৬

Related posts