November 16, 2018

দরিদ্র শিক্ষকসমাজ ও সৃজনশীল পদ্ধতি

j1উন্নত বিশ্বের যেসব দেশে অংশগ্রহণমূলক শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতি বা সৃজনশীল পরীক্ষাপদ্ধতি প্রচলিত আছে সেসব দেশের বিদ্যমান শিক্ষা অবকাঠামো; শিক্ষকদের যোগ্যতা, দক্ষতা, নিয়োগপ্রক্রিয়া, শিক্ষকদের পরিচালনা; বিদ্যালয় পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা; শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক অবস্থা ইত্যাদি আমাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের শ্রেণিকক্ষগুলো আধুনিক প্রযুক্তি তথা মাল্টিমিডিয়ানির্ভর। কাগুজে পুস্তকের স্থান দখল করে নিয়েছে ই-বুক। বই ও ব্যাগের বোঝা শিক্ষার্থীদের আর বয়ে বেড়াতে হয় না। শিক্ষকদের বেশির ভাগই সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী। তাদেরকে দক্ষ পেশাদার শিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণব্যবস্থা। শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়ায় নেই কোনো ঘুষ-দুর্নীতি, ছলা-কলা বা দু-নম্বরি। শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালনায় নেই সরকারের মদদপুষ্ট ভূমিদস্যু, ভূমিদালাল, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, মানবপাচারকারী, চোরাকারবারি, দুর্নীতিবাজ, টাউট-বাটপাড়, সমাজবিরোধী, চরিত্রহীন, লম্পট ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত রাজনৈতিক নেতাদের দৌরাত্ম্য। নেই সেখানে আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রশাসন। শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা এক শ’ ভাগ নিশ্চিত। তাদের সামাজিক মর্যাদাও অন্য যেকোনো পেশার চেয়ে উচ্চে। ফলে শিক্ষকতাই শিক্ষকদের পেশা ও নেশা, শিক্ষার্থীরাই তাদের ধ্যানজ্ঞান।
পক্ষান্তরে আমাদের দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে অংশগ্রহণমূলক শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতি বা সৃজনশীল পদ্ধতির বাস্তবমুখী পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন এখনো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সম্ভব হয়নি অংশগ্রহণমূলক বা সৃজনশীল উপযোগী পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নও। এমনকি প্রণীত পুস্তকে উদাহরণস্বরূপ যেসব সৃজনশীল প্রশ্ন সন্নিবেশিত করা হয়েছে এ গুলোর অনেক প্রশ্নেরই সমাধান শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তো সম্ভব নয়ই এমনকি শিক্ষকদেরও প্রায়ই দ্বিধাগ্রস্ত হতে হয় কিংবা অনেক ঘাম ঝরাতে হয়। গত এক দশকেও ১ শতাংশের ওপরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মাল্টিমিডিয়ার আওতায় আনা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপর্যায়ের কিছুসংখ্যক শিক্ষক ছাড়া অন্য সব শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকদের কাছে যৎকিঞ্চিত থাকলেও সমাজের উচ্চমধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত কিংবা নীতিনির্ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন লোকদের কাছে প্রায় শূন্যের কোঠায়। আর্থিক অনিরাপত্তা তাদের নিত্যসঙ্গী। প্রাইভেট টিউশনিতে যেসব শিক্ষকের চাহিদা নেই যেসব শিক্ষকের বরাবরই নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। প্রাইভেট টিউশনি আইনত নিষিদ্ধ হওয়ায় আবার এ ক্ষেত্রে চাহিদাসম্পন্নদেরও সামাজিক মর্যাদা আরো হ্রাস পেয়েছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকেরা দীর্ঘ দিন ধরে দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদা দাবি করে আসছেন। তাদের এ দাবি সরকার মেনেও নিয়েছে যদিও এখনো পর্যন্ত তা কার্যকর রূপ লাভ করতে পারেনি। ফলে স্বভাবতই সহকারী শিক্ষকেরা তৃতীয় শ্রেণীর পর্যায়ভুক্ত। এই দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে প্রথম শ্রেণীর নাগরিক তৈরির ভার কতটা নিরাপদ তা খতিয়ে দেখা অতি জরুরি।
অংশগ্রহণমূলক বা সৃজনশীল বা কাঠামোবদ্ধ পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগ ও কার্যকারিতার জন্য শিক্ষকদের যথেষ্ট যোগ্যতা, দক্ষতা, নিষ্ঠা, প্রচেষ্টা, পড়াশোনা ও প্রস্তুতি দরকার। খাতা দেখা, প্রশ্ন-প্রণয়ন ইত্যাদি সাথে যুক্ত করলে স্কুল আওয়ারের বাইরেও শিক্ষকদেরকে কমপক্ষে আড়াই-তিন ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা দরকার হয়। সব মিলিয়ে একজন কমিটেড শিক্ষকের প্রায় সাড়ে দশ-এগারো ঘণ্টা এতদসংশ্লিষ্ট কাজে নিয়োজিত থাকা দরকার। এর বিনিময়ে অষ্টম বেতন-স্কেল অনুযায়ীও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের যে বেতনভাতা দেয়া হচ্ছে, তাতে অনেক এলাকায় বাসা ভাড়াও হয়ে ওঠে না। সারা দেশের মাত্র চার-পাঁচ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাসিক চার-পাঁচ হাজার টাকা বা তার বেশি বেতন দিয়ে থাকে বা দিতে সক্ষম। মাসিক দুই-তিন হাজার টাকার বেশি বেতন দিতে সক্ষম নয় বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাও আবার বছরের পর বছর বকেয়া পড়ে থাকে।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সংজ্ঞানুযায়ী কোনো ব্যক্তির দৈনিক আয় ১.৯৯ ডলার বা এর কম হলে তাকে অতি দরিদ্র হিসেবে চিহ্নত করা হয়। সেই অর্থে দৈনিক ২ ডলার আয়ই হচ্ছে দারিদ্র্য সীমা। দৈনিক এর চেয়ে কম উপার্জনকারী ব্যক্তি অতি দরিদ্র শ্রেণিভুক্ত। পরিবারের সদস্যসংখ্যা ছয়জন ধরেই অষ্টম পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানা যায়। ফলে দৈনিক ২ ডলার মাথাপিছু আয় এবং বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রতি ডলারের বাজার মূল্য ৮০ টাকা ধরে ৬ সদস্যের একটি পরিবারের বার্ষিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ২×৬×৩৬৫×৮০ টাকা=৩,৫০,৪০০ টাকা। মাসিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ২৯,২০০ টাকা। যেসব পরিবারের মাসিক আয় ২৯,২০০ টাকার নিচে জাতিসঙ্ঘের সংজ্ঞানুযায়ীই তাদের জীবনযাত্রার মান দারিদ্র্যসীমার নিচে। এরূপ আয়ে বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে গ্রামে যদিও বা কোনো রকমে টিকে থাকা যায়, শহরে টিকে থাকা খুবই দুরূহ। সন্তানের জামা কিনতে চাইলে স্কুলের বেতন দেয়া যায় না, স্ত্রীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চাইলে বাসা ভাড়া বকেয়া পড়ে ইত্যকার সমস্যা। গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির উচ্চমূল্য, লাগামহীনভাবে বাসাভাড়া বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের পাগলাঘোড়া, অনিয়ন্ত্রিত পরিবহনভাড়া, শিক্ষা-চিকিৎসা ব্যয়ে লাগামহীন অবস্থা ইত্যাদি কারণে তাদের জীবন ওষ্ঠাগত। অথচ অষ্টম পে-স্কেল অনুসারেও শুধু বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও গুটিকয়েক সহকারী-প্রধানশিক্ষক ব্যতীত মাধ্যমিকপর্যায় পর্যন্ত প্রায় সব শিক্ষকেরই মোট বেতনভাতা দারিদ্র্যসীমার নিচেই অবস্থান করছে।
অন্য দিকে জাতিসঙ্ঘের ঘোষণা অনুয়ায়ী বাংলাদেশ নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ হিসাবে স্বীকৃত হওয়ায় এবং মাথাপিছু গড় আয় ১,৩১৪ ডলারে উন্নীত হওয়ায় ৬ সদস্যের পরিবারের বার্ষিক গড় আয় হওয়ার কথা প্রায় ১,৩১৪×৬×৮০ টাকা =৬,৩০,৭২০ টাকা। পরিবারপ্রতি মাসিক আয় হওয়ার কথা ৫২,৫৬০ টাকা। সারা দেশে বড়জোর ৪-৫ শ’ বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকের বেতনভাতা এ সীমাকে স্পর্শ করতে পেরেছে বলে অনুমান করা যায়। কোনো দেশের জাতি গড়ার কারিগর শিক্ষকেরা দেশের গড় আয়ের কম বেতনভুক্ত থাকবেন কিংবা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করবেন তাকে কি ন্যায়সঙ্গত হিসেবে অভিহিত করা যায়? শিক্ষকদের আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে নিমজ্জিত রেখে তাদের দ্বারা শিক্ষার মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলে আশা করা যায় কি? আবার এ দারিদ্র্যপীড়িত শিক্ষকদের আয়ের ওপর প্রত্যক্ষ করারোপকে জুলুম বৈ অন্য কিছু বলা যায় কি?
মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ একাধিকবার শিক্ষকদের জন্য বিশেষ বেতন-স্কেল প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু আজ অবধি এ প্রতিশ্রুতির কোনো বাস্তব রূপ দেশবাসী প্রত্যক্ষ করতে পারেনি। পক্ষান্তরে প্রাইভেট টিউশনি বন্ধের নির্দেশনার মাধ্যমে শিক্ষকদেরকে এ কাজ থেকে বিরত করা না গেলেও তাদের সম্মানহানি ঘটানো গেছে বহু দূর। দ্বিতীয়বার একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পরও মন্ত্রী শিক্ষকদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেননি এমনকি বিক্ষিপ্তভাবে কিছু প্রতিষ্ঠানকে সরকারীকরণ করা হলেও সার্বিকভাবে জাতীয়করণের কোনো পদক্ষেপ নেই। মন্ত্রী প্রাইভেট টিউশনি নিষিদ্ধ করার পরিপ্রেক্ষিতে একাধিকবার শিক্ষকদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, শিক্ষকতা একটি সেবামূলক পেশা, কম বেতনের কথা জেনেই শিক্ষকেরা এ পেশায় এসেছেন, তা ছাড়া রাষ্ট্রের সক্ষমতার বিষয়টিও শিক্ষকদের মনে রাখতে হবে। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে- রাজনীতি কি সেবামূলক পেশা নয়? রাজনীতিতে কি অঢেল অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকা উচিত? রাষ্ট্রের সক্ষমতার বিষয়টি কি শিক্ষকদের চেয়ে রাজনীতিকদের বেশি ভাবা উচিত নয়? তার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ দরিদ্র শিক্ষকদের কথা মাথায় রেখে অন্তত নজির সৃষ্টির জন্য হলেও কেন মাননীয় মন্ত্রী নিজের রাষ্ট্রীয় সম্মানী ও ভাতা শিক্ষকদের মতো কমিয়ে নিতে পারছেন না?
অংশগ্রহণমূলক শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতি বা সৃজনশীল পদ্ধতির সুফল জাতির কাছে পৌঁছে দিতে চাইলে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, কানাডাসহ যেসব দেশ থেকে আমাদের দেশে এরূপ পদ্ধতি আমদানি করা হয়েছে, সেসব দেশের সমপর্যায়ের শিক্ষকদের সাথে অন্যান্য চাকরিজীবীদের বেতনভাতার তুলনামূলক অবস্থা বিচার করে বাংলাদেশেও অন্যান্য সরকারি চাকরিজীবীদের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে শিক্ষকদের বেতনকাঠামো নির্ধারণ করা জরুরি এবং তা অবশ্যই মাথাপিছু বার্ষিক আয় ১,৩১৪ ডলার অনুযায়ী পারিবার প্রতি মাসিক গড় আয়ের সীমা ৫২,৫৬০/= টাকার কম হওয়া উচিত হবে না। অন্যথায় শিক্ষার মান উন্নয়নের সব চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। তাতে এ প্লাস, গোল্ডেন এ প্লাসের মহোৎসবই আমরা দেখতে পাব, কোয়ালিটি এডুকেশন সম্পূর্ণ অধরাই থেকে যাবে। হয়তো বা শেষ পর্যন্ত আমার সাধের আমগাছের মতো অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিটিই কেটেও ফেলতে হতে পারে।

Related posts