September 26, 2018

থানা পুলিশকে ‘গাইড লাইন’

জঙ্গি তৎপরতা প্রতিরোধ ও নাশকতার ঘটনা তদন্তে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পাশাপাশি থানা পুলিশেরও দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ বাহিনী। এ জন্য দেশের জঙ্গিপ্রবণ ৩২ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ও ক্রাইমজোন প্রধানদের নির্দেশনা দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক। এ বিষয়ে একটি সেমিনারের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে করণীয় ঠিক করা হয়েছে। একই ধরনের একটি সেমিনার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশও (ডিএমপি)। উভয় সেমিনার থেকে জঙ্গি ইস্যুতে থানা পুলিশকে একটি ‘গাইড লাইন’ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দফতর ও ডিএমপি সূত্র এ সব তথ্য জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান, জঙ্গি সংগঠন, জঙ্গিদের নাশকতা, জঙ্গিদের লক্ষ্য, হামলার ধরন, হামলা প্রতিরোধ, জঙ্গিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং মামলার তদন্তে থানা পুলিশকে আরও দক্ষ করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে মাসে একটি করে নাশকতা করছে জঙ্গিরা। পুলিশের সন্দেহ, নাশকতার ধারাবাহিকতা আরও বাড়তে পারে। বিভিন্ন পন্থায় হামলা হতে পারে। অতীতের ঘটনাগুলো গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছে। থানা পুলিশের ধারণা, জঙ্গি বিষয়ে শুধু ডিবি পুলিশ কাজ করে। এ কারণে জঙ্গি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারির বিষয়ে থানা পুলিশ জোর দেয় না। তাই, পুলিশের পক্ষ থেকে থানা পুলিশকে জঙ্গি বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল ও তৎপর হওয়ার জন্যই পুলিশের বর্তমান উদ্যোগ।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. শাহজালাল বলেন, মৌলভীবাজার জেলায় জঙ্গি তৎপরতা নেই। তারপরও জঙ্গিবাদ রোধে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। মানুষকে ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জঙ্গিবাদের বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক জানানো হচ্ছে।

এ মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশের জঙ্গি অধ্যুষিত ৩২ জেলার এসপিদের নিয়ে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় পুলিশ সদর দফতরে। ‘জঙ্গিবাদ দমন: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শিরোনামে এই সেমিনারে দেশের জঙ্গিবাদের বিস্তার ও করণীয় নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। সেমিনারের আলোচনার বিষয় নিজ জেলার প্রতিটি থানার ওসি ও পুলিশদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এসপিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এসপিরা নিজ জেলায় ফিরে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন।

নওগাঁ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুলিশের নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। যেন জঙ্গিবাদের বিষয় তথ্য সংগ্রহ ও তদন্ত করতে আরও দক্ষতা অর্জন করতে পারে। পাশাপাশি মানুষকে সচেতনতার জন্য দুভাবে কাজ করা হচ্ছে। প্রথমত ধর্মীয়, দ্বিতীয়ত সামাজিকভাবে সভা-সেমিনার ও সম্মেলন করে। মসজিদ ও মাদ্রাসায় যের জঙ্গিবাদের পক্ষে কোনও বক্তব্য না আসে, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইসলামের জন্য জঙ্গিবাদের ক্ষতির দিকগুলো মসজিদে ইমাম সাহেবরা প্রচার করছেন। কওমি মাদ্রাসা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, যে সব জেএমবি সদস্য জামিনে আছেন, তারা নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছে কিনা, প্রতি সপ্তাহে পুলিশের কাছে এসে রিপোর্ট করছে কিনা, তাও নজরদারি করা হচ্ছে। যারা পলাতক আছেন, তাদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দফতরের সূত্রটি আরও জানিয়েছে, জঙ্গিরা ২০০৫ সালে একযোগে দেশের ৬৩ জেলায় যেভাবে হামলা চালিয়েছিল, ঠিক সেভাবে বড় ধরনের নাশকতা চালাতে পারে জঙ্গিরা। তবে বর্তমান জঙ্গি সংগঠনগুলোর ওই ধরনের নাশকতা চালানোর শক্তি-সামর্থ্য নেই। তবে তারা সব সময় শক্তি অর্জনের চেষ্টা করছে। তাই প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে জঙ্গি বিষয়ে অধিকতর ধারণা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেকোনও ধরনের সংগঠিত ব্যক্তিবর্গকে সন্দেহের তালিকায় রেখে তাদের ওপর নজরদারির নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। এমনকি পার্বত্য অঞ্চল, চর ও গভীর জঙ্গলে যেখানে মানুষের আনাগোনা কম, সেখানে কেউ বৈঠক করছেন কিনা? প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন কিনা, তাও নজরদারিতে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মিরাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সিরাজগঞ্জ জেলার প্রতিটি থানা এলাকায় ‘এন্টিক্রাইম মিটিং’ করে জঙ্গি বিষয়ে সচেতনতার জন্য মানুষকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। মসজিদ ও মাদ্রাসায় জঙ্গিবিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কমিউনিটি ও বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। যেন মানুষকে তারা তাদের দিকে না নিয়ে যেতে পারে। সে বিষয়ে নরজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

এদিকে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকেও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়ার সভাপতিত্বে চলতি সপ্তাহে ডিএমপি সদর দফতরে একটি ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম। ওয়ার্কশপে প্রতিটি জোনের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি), চারটি ক্রাইমজোনের ডিসি এবং প্রতিটি থানার ওসি (তদন্ত) উপস্থিত ছিলেন।

ডিএমপির একটি সূত্র জানিয়েছে, ওই ওয়ার্কশপে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হয়। জঙ্গি সংগঠন ধরে ধরে তাদের কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা করা হয়। বিশ্বে জঙ্গিবাদের উত্থানের সঙ্গে-সঙ্গে বাংলাদেশে এর প্রভাবের দিক নিয়েও বিশদ আলোচনা করেন পুলিশ কর্মকর্তারা। পরবর্তী সময়ে ডিএমপি কমিশনার আলাদাভাবে ওসিদের নিয়ে আবার আলোচনা করেন। তিনি থানা পুলিশকে আরও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। জঙ্গি বিষয়টিকে কোনওভাবেই হালকাভাবে না নেওয়ার জন্যও কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে তেজগাঁও জোনের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ওয়ার্কশপটি ছিল একটি অ্যাকাডেমিক আলোচনা। ওই বিষয়ে কিছুই বলা যাবে না। তবে থানা পুলিশ জঙ্গি ইস্যুতে খুব তৎপর রয়েছে। প্রতিটি এলাকায় কমিউনিটি পুলিশ ও বিট পুলিশের কমিটি রয়েছে। তারা এলাকার মানুষের সঙ্গে মিশে কাজ করছে। এলাকায় কোনও নতুন ভাড়াটিয়া আসলে সে বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, এলাকার প্রতিটি মসজিদ ও মাদ্রাসায় জঙ্গিবাদের ক্ষতিকর দিকগুলো আলোচনা করা হচ্ছে। কেউ জঙ্গিবাদ নাম বিপদগামী পথে চলে যেতে না পারে সে বিষয়ে মসজিদ ও মাদ্রাসায় মোটিভেশন দেওয়া হচ্ছে। জঙ্গিবাদের বিষয়ে থানা পুলিশ আগের চেয়ে আরও দক্ষ হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts