September 24, 2018

‘তোমাদের দেশের পুলিশ আমাকে প্রটেকশন দেয়’

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় এটিএম কার্ড জালিয়াতির ঘটনার মূল হোতা পিওটরকে (পিওটর সিজোফেন মাজুরেক ওরফে থমাস পিটার) ধরিয়ে দিয়ে এখন নিজেই হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করেছেন জালিয়াত চক্রের সদস্য হিসেবে নাম আসা ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ফরিদ নাবির। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেছেন, আমিই তো পিওটরকে ধরিয়ে দিয়েছি। ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় পিওটর সম্পর্কে তথ্য ও ছবি দেওয়ার পরই তাকে গ্রেফতার করা হয়। এখন আমাকেই ফাঁসানোর চেষ্টা হচ্ছে। ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার একটি হোটেলে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন পিওটর। তখন তিনি নিজেকে বাংলাদেশের অনেক বড় ক্ষমতাশালী বলে পরিচয় দিয়ে মোবাইল ফোনে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী, ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিভিন্ন পার্টির অন্তরঙ্গ ছবি দেখিয়ে দম্ভ করে আমাকে বলেছিলেন, তোমার বাংলাদেশে আমাকে পুলিশ প্রটেকশন দেয়।
২৮ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে স্থানীয় সময় বিকাল ৩টা ৩০ মিনিটে ইস্ট লন্ডনের অভিজাত এলাকায় তার রেস্তোরাঁয় বসে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ফরিদ সেসব ঘটনার বিস্তারিত বলেন। এদিকে সিলেটে খোঁজ নিয়ে ফরিদ সম্পর্কে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। তরুণ ব্রিটিশ-বাংলাদেশি এ ব্যবসায়ীর বেশ কিছু ব্যবসা রয়েছে ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরে। এরই একটি হ্যাম্পশায়ার এলাকার রেস্তোরাঁর নিয়মিত কাস্টমার ছিলেন পিওটর। তিন বছর আগে এভাবেই একসময় সখ্য গড়ে ওঠে পিওটরের সঙ্গে। ফরিদ নাবির দাবি করেন, পিওটর নিজেকে একজন ম্যানপাওয়ার ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেন। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ থেকে ম্যানপাওয়ার ব্যবসার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ২০১৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর আমি বাংলাদেশে গিয়ে গুলশানের হলিডে প্লানেট হোটেলে উঠি। এর এক দিন পর পিওটর বাংলাদেশে যান এবং একই হোটেলে অবস্থান করেন। কিন্তু বাংলাদেশ যাওয়ার পর পিওটরের সঙ্গে কথাবার্তায় বনিবনা না হওয়ায় ১৫ দিনের মধ্যে আমি ফেরত চলে আসি। সেটাই আমার সঙ্গে পিওটরের সর্বশেষ দেখা। এরপর আর কখনই যোগাযোগ ছিল না।

এরপর চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্টের পলিসি সামিটে ব্রিটিশ ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের সঙ্গে যোগ দেন বলে জানান ফরিদ। সেই সফরে রাষ্ট্রপতিসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। ২৪ ও ২৫ জানুয়ারি হোটেল রেডিসনে বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্টের সামিট হয়। সেই সফরে আবারও হোটেল হলিডে প্লানেটে ওঠেন ফরিদ। তখন তিনি হোটেলের পূর্বপরিচিত কর্মচারীর মাধ্যমে পিটারের অবস্থান ও উত্থান সম্পর্কে জানতে পেরে বিস্মিত হন বলে দাবি করেন। সেই সফরে পিওটরের সঙ্গে পূর্বপরিচয়ের সূত্র ধরে দুবার মোবাইলে কথা বলেন। এরপর ১ ফেব্রুয়ারি আরেকজন অপরিচিত বিদেশিকে সঙ্গে নিয়ে হলিডে প্লানেট হোটেলের কম্পিউটার রুমে দেখা করতে আসেন। তখন পিটার বেশ উত্তেজিত ছিলেন। নিজেকে বাংলাদেশের অনেক বড় ক্ষমতাশালী বলে পিটার নিজের মোবাইলে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী, ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিভিন্ন পার্টির অন্তরঙ্গ ছবি দেখিয়ে দম্ভ করে বলেন, তোমার বাংলাদেশে আমাকে পুলিশ প্রটেকশন দেয়। তোমার দেশে আমার শত শত কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। তখন এক পর্যায়ে সে এটিএম জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বানানোর কথা জানায়। ফরিদ নাবির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পিওটরের মোবাইলে সার্চ দিলে বাংলাদেশের অনেক বড় হোমরা-চোমরার নাম আসবে। তার পেছনে অনেক বড় বড় ক্ষমতাবান মানুষ রয়েছেন। এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে ফেরত চলে আসেন ফরিদ। ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে এটিএম জালিয়াতির ঘটনা পত্রিকায় আসার পরই ফরিদ নাবিরের টনক নড়ে। তিনি বলেন, এরপরই আমি কয়েকজন কাছের বন্ধুর সঙ্গে পরামর্শ করে ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং শীর্ষ একটি দৈনিকে পিটার সম্পর্কে তথ্য ও ছবি সরবরাহ করি। যার ফলেই এত বড় ঘটনার রহস্য উন্মোচন হলো। হুন্ডির মাধ্যমে পিটারের টাকা ব্রিটেনে নিয়ে আসার কথাও অস্বীকার করেন এই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, এখন তো তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। আমার গত দেড় বছরে এবারই দেশে দুবার পিটারের সঙ্গে মোবাইলে কথা হয়েছে। সব রেকর্ড পুলিশ ঘেঁটে দেখতে পারে। আমাদের সিলেটের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে নাবিরের সিলেটের বাসায়ও যাতায়াত ছিল বিদেশিদের। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ফরিদ নাবিরকে নিয়ে সিলেটে চলছে নানা গুঞ্জন। বিশ্বের অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশে প্রতারণা ও জালিয়াতি সহজ এমন আশ্বাস দিয়ে পিওটরসহ একটি জালিয়াত চক্রকে ফরিদ নাবির বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন বলে গোয়েন্দারা তদন্তে প্রমাণ পেয়েছেন। ২ ফেব্রুয়ারি দেশ ছাড়ার আগে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নাবিরকে বিদায় জানাতে অন্যদের সঙ্গে পিওটরও উপস্থিত ছিলেন। সিলেটী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ফরিদ নাবিরের জীবনযাপন পুরোটাই রহস্যঘেরা। কেউ তাকে চেনেন সমাজসেবী ও দয়ালু হিসেবে। দেশে ফিরলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে খুব একটা মিশতেন না নাবির। আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনের মধ্যেই ছিল তার যোগাযোগ। তবে দেশে অবস্থানকালে সিলেট নগরীর পীরমহল্লায় তার বাসায় প্রায়ই আসতেন বিদেশি নাগরিকরা। পাড়ার রাস্তায় পড়ত দামি গাড়ির লাইন। বাসায় বিদেশিদের যাতায়াত থাকলেও আশপাশের বাসার লোকজনের সঙ্গেও মিশতেন না নাবির। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তিনি নিজেকে সব সময় আড়াল রাখার চেষ্টা করতেন। পীরমহল্লার ফরিদ নাবিরের বাসার (প্রভাতি—৩৬) প্রতিবেশী ও গ্রামের বাড়ি ওসমানীনগর থানার বড় ধীরারাই গ্রামের লোকজনের সঙ্গে আলাপ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। সরেজমিনে ফরিদ নাবিরের পীরমহল্লার বাসায় গিয়ে দেখা যায় তিন তলা বাসার প্রথম ও দ্বিতীয় তলার চারটি ইউনিটের মধ্যে তিনটিতে ভাড়াটেরা বসবাস করছেন। দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে থাকেন বাসার কেয়ারটেকার দেলওয়ার ও তার পরিবার। দেলওয়ার পেশায় ট্রাভেলস ব্যবসায়ী ও ফরিদ নাবিরের ঘনিষ্ঠজন। বাসার গেটে ‘নাবির ভিলা’ লেখা থাকলেও এলাকার লোকজন বাসার মালিক হিসেবে দেলওয়ারকেই চেনেন। বাসার তৃতীয় তলা এখনো নির্মাণাধীন। দ্বিতীয় তলায় দেলওয়ারের ফ্ল্যাটে গিয়ে কলিংবেল চাপতেই বের হয়ে আসেন এক নারী। নিজের ও স্বামীর নাম বলতে নারাজ ওই নারী জানান, তিনি বাসার কেয়ারটেকারের স্ত্রী। আর কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি। বাসার ভাড়াটেরা জানান, গত বছর ফরিদ নাবির এসে এক মাস ওই বাসায় থাকেন। তখনো তারা জানতেন না তিনি (ফরিদ) বাসার মালিক। নাবিরের বাসার পাশের এক ব্যবসায়ী জানান, কয়েক বছর আগে ফরিদ নাবির বাসাটি কেনেন। গত বছর তিনি দেশে আসার পর প্রায় এক মাস ওই বাসায় অবস্থান করেন। ওই সময় বিদেশিরা বাসাটিতে অবস্থান করতেন। পাড়ার রাস্তায় বিদেশিদের দামি গাড়ির লাইন থাকত। সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. রহমত উল্লাহ জানান, ‘ফরিদ নাবিরের ব্যাপারে কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। যে থানায় মামলা হয়েছে ওই থানা পুলিশ চাইলে আমরা ফরিদ নাবিরের তথ্য সংগ্রহ করে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।’

উৎসঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন

Post source : উৎসঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন

Related posts