November 13, 2018

‘তৃতীয় মাত্রা’ প্রবাসীদের জন্য নতুন মাত্রা আনবে কি? (ভিডিও)

নাজমুল হোসেন, লন্ডন থেকেঃ প্রখ্যাত সাংবাদিক জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় বাংলাদেশের খ্যাতনামা টেলিভিশন ‘চ্যানেল আই’ এর সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে মুক্ত আলোচনার একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান তৃতীয় মাত্রা। এ অনুষ্ঠানের অতি সম্প্রতি প্রচারিত পর্বের এবারের বিষয় ছিল ‘উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় প্রবাসীদের অংশগ্রহন’।

সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ প্রবাসীর অবস্থান বিধায় প্রাসঙ্গিক বিষয়েরই অবতারনা করলো তৃতীয় মাত্রা। আর এটা খুবই সময়োপযোগী কারন বেশির ভাগ প্রবাসীর চোখ এখন বাংলাদেশের দিকে কারন কিছুদিনের মধ্যে সংসদে উঠতে যাচ্ছে প্রস্তাবিত বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বিল, যার সাথে প্রবাসীরা ওতপ্রত ভাবে জড়িত।

অনুষ্ঠানে এবারের অতিথি ছিলেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত ডঃ এ কে আব্দুল মোমেন এবং   ব্রিটিশ-বাংলাদেশ চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রীর লন্ডন রিজিওনের প্রেসিডেন্ট বসির আহমেদ।

এক প্রানবন্ত ও মনোমুগ্ধকর আলোচনায় বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের ভুমিকা ছাড়াও তাঁদের অংশগ্রহণের বর্তমান বাধাসমুহ, কেন প্রবাসীদের জড়িত করা আবশ্যক, সরকার বা প্রশাসনের কি করনীয়, নতুন প্রজন্মের মনোযোগ আকর্ষণ করে অগ্রযাত্রার সঙ্গী করা, সাম্প্রতিক প্রস্তাবিত বাংলাদেশের নাগরিক আইন ও মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসীদের ভুমিকার মতো বিষয় গুলো উঠে আসে।

১৯৭১ সালে বহিঃ বিশ্বের গুরুত্ব অনুধাবন করে মুজিবনগর সরকারের সাথে গঠন করা হয়েছিল প্রবাসী সরকার। এ প্রবাসী সরকারের হাতে ব্রিটেনের প্রবাসীরা তুলে দিয়েছিল তাঁদের কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত সে সময়কার ১০ কোটি রুপি, দেয়া হয়েছিল ২০০০ রাইফেলসহ বিভিন্ন যুদ্ধ সামগ্রী, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পুরো সময় তাঁদের সপ্তাহের এক দিনের বেতন তাঁরা দিতেন। অক্লান্ত পরিশ্রম করে জনমত গঠনে কাজ করেছেন পুরুষ-মহিলা এমনকি শিশুরাও। তখনকার শিশুরা তাঁদের মা-বাবার সাথে বিভিন্ন স্থানে ও শপিংমলে গিয়ে করেছেন যুদ্ধ পরিচালনার জন্য তহবিল সংগ্রহ, বাংলাদেশের গণহত্যা ও স্বাধীনতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ব্রিটেনের তৎকালীন মন্ত্রী, আইন প্রনেতা থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষকে। বঙ্গবন্ধুকে যাতে জীবিত ফিরে পাওয়া যায় তার জন্য গড়ে তুলেছিলেন বিশ্ব জনমত।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম ন্যাভাল ফ্রীগেট ও প্রথম বিমানের জন্য অগ্রীম অর্থ  ও দেশের নিজস্ব টাকা ছাপানোর জন্য যে প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট পরিমাণ তহবিল জমা দিতে হয়, তারও জোগান দিয়েছিল এ প্রবাসীরাই।

আমেরিকার প্রবাসীরা তৎকালীন ৮১ হাজার ডলার মূল্যের ওয়াকি টকিসহ যুদ্ধে ব্যবহৃত বিভিন্ন যোগাযোগ সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি প্রদান করেন মুক্তিযুদ্ধে।

ব্রিটিশ-বাংলাদেশ চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রীর দীর্ঘ দিনের একটি দাবী ছিল, বছরের একটা দিন অনাবাসী বাংলাদেশী দিবস /এনআরবি ডে বা দিবস ( NRB Day ) ঘোষণার। আমাদের পাশের দেশ ভারতে এ দিবস জাকজমকপূর্ণভাবে পালন করে, যেদিন অনাবাসী ভারতীয়রা সেদেশে গমন করে ও বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে।

খুবই আশার কথা যে, এ অনুষ্ঠানে ডঃ এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে ইতিমধ্যে নৈতিক সমর্থন দিয়েছেন। এখন নির্দিষ্ট দিনটি ঘোষণা সময়ের ব্যাপার মাত্র। এ দিবস ঘোষণা করা হলে, একে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা দেশে গমন করবেন, তাঁরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করবেন, বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত হবেন এবং এদের মাধ্যমে দেশের ট্যুরিজমের খাতও প্রসারিত হবে।

সারা বিশ্বে যখন অর্থনৈতিক মন্দা চলছে সে সময় অনেক প্রথম সারির দেশও হয়েছে ধরাশায়ী। এর হাত থেকে নিজের দেশকে বাঁচানোর জন্য এ প্রবাসীরাই হাত প্রসারিত করে পাঠিয়েছে কষ্টার্জিত রেমিটেন্স। যার ফলে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চাকা সচলই শুধু নয়, ক্রমাগত প্রবৃদ্ধি বেড়ে চলছে।

প্রবাসে এ বাংলাদেশীদের যথেষ্ট কদর। তাঁরা বিভিন্ন সেক্টরে আজ যথেষ্ট দক্ষতার সাথে কাজ করে দেশের সুনাম বয়ে আনছে। তাঁদের এ দক্ষতা বাংলাদেশ সহজেই কাজে লাগাতে পারে। কারন দেশে রয়েছে দক্ষ লোকের যথেষ্ট অভাব। তাই আমাদের দেশে বিভিন্ন সেক্টরে ভারতীয়, শ্রীলঙ্কান নাগরিকসহ ৫০ হাজার বিদেশী কর্মী কাজ করছেন। প্রতি বছর আমাদের দেশ থেকে চলে যাচ্ছে রিজার্ভের একটি অংশ যেটা প্রবাসীদের সাহায্যে গড়ে উঠেছে। শুধু  ভারতেই প্রতি বছর চলে যাচ্ছে ৫ বিলিয়ন ডলার।   অনাবাসী ভারতীয়দের মাধ্যমে ভারতের রেমিটেন্স প্রাপ্তির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২য়।

এ যোগসূত্রে যুক্তরাজ্যের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজ সেবক বসির আহমেদ বলেন, চীন, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান ও ভারতের প্রবাসীদের কাজে লাগিয়ে দেশ আজ উন্নত বিশ্বের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে।  ২০০৫ ও ২০১০ সালে আমেরিকার সিলিকন ভ্যালী থেকে চেন্নাইতে চলে যায় প্রচুর অনাবাসী ভারতীয়, আজ সারা বিশ্বে তাঁরা  আইটিতে ১ নম্বরে অবস্থান করছে। অনাবাসী ভারতীয় ছাড়া ভারত এ অবস্থানে আসতে পারতো না কোন ভাবেই।

তিনি উল্লেখ করেন, আমাদের প্রবাসে কমপক্ষে ৮০ হাজারের উপর স্নাতকধারী নতুন প্রজন্ম আছে, যাদের শিক্ষা ও দক্ষতা বিশ্ব মানের। বাংলাদেশও যদি পুরাতন ও নতুন প্রজন্মের দক্ষতা কাজে লাগাতো তাহলে দেশ আরো সমৃদ্ধশালী হত। কিন্তু দেশের কিছু বৈরী পরিবেশের কারনে প্রবাসীরা দেশের উন্নয়নে একশত ভাগ মনোনিবেশ করতে পারছে না। তাঁদের জন্য করতে হবে ব্যবসা বান্ধব আইন, ওয়ান স্টপ সার্ভিস ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা।

সরকার অঞ্চল ভেদে করতে পারে সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রি যেমন সিলেট বিভাগকে করতে পারে এডুকেশন ও ট্যুরিজমের হাব। এ বিষয়ে যেসব প্রবাসীদের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা রয়েছে তাঁরা চলে যাবে সেই হাবে।

শুনা যাচ্ছে, প্রস্তাবিত সিটিজেন শিপ অ্যাক্টে প্রবাসীদের স্বার্থ বিঘ্নিত হচ্ছে। যারা বাংলাদেশে জন্মগ্রহনকারী প্রবাসী ও বিদেশী নাগরিকত্ব গ্রহন করেছে তাঁরা  প্রস্তাবিত এ আইনের আলোকে, দেশে ফিরে  চাকুরী বা প্রতিনিধিত্বকারী অবস্থানে আর যেতে পারবেন না। তাঁদের সন্তান যারা বিদেশে জন্ম নিয়েছে, তাঁদেরকে বিদেশী হিসেবে গন্য করা হতে পারে। আর তাতে তাঁদের পূর্ব পুরুষদের সম্পত্তি হতে বঞ্চিত হবেন তাঁরা। বিদেশীদের মতো ভিসা নিয়ে যেতে হবে তাঁদের নিজ দেশেই।

তাই তাঁরা ইতিমধ্যে বেশিরভাগ প্রবাসী আর দেশে বিনিয়োগ করতে উৎসাহ পাচ্ছেন না বরং কেউ কেউ তাদের জমি বিক্রি করে  প্রবাসে টাকা আনার কথা ভাবছেন।

প্রস্তাবিত সিটিজেন শিপ অ্যাক্টে প্রবাসীদের ধারনা সত্য হলে, দেশের সাথে সেতু বন্ধনে ও উন্নয়নের সক্রিয় উদ্যোগে পড়বে ভাটা । প্রস্তাবিত এ অ্যাক্টে থাকতে হবে প্রবাসীদেরও প্রতিনিধিত্ব, দিতে হবে তাঁদের মতামত দেয়ার সুযোগ।

ভুলে গেলে আমাদের চলবে না প্রধানমন্ত্রী তনয় সজীব ওয়াজেদ জয় প্রবাসে থেকেই ধারনা পেয়েছিলেন ডিজিটাল বাংলাদেশের। প্রবাসে অবস্থানরত এ বাংলাদেশীরা দেশের যে কোন বিপদে বা প্রয়োজনে প্রবাসীরা তাগিদ অনুভব করেন এবং ঝাপিয়ে পরেন নিজের সর্বস্ব নিয়ে। ব্রিটেনে সিলেটে অঞ্চলের ৫০ টির অধিক শিক্ষা বিষয়ক সংগঠন আছে যারা নিয়মিত টাকা পাঠাচ্ছেন লেখাপড়ার মান উন্নয়নের জন্য। ঢাকার যানজট কমানোর জন্য নিজের টাকায় প্রবাসীরা টিউব তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন।বলেছেন নিজেদের অর্থায়নে দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো করে দিবেন। তাঁদের এ ধরনের পরিকল্পনা বলে শেষ করা যাবে না।

প্রবাসীরা তার দেশকে সবসময় করেছে আপন, এখন দেখার বিষয়, দেশ প্রবাসীদের কতখানি আপন করে। তবে, প্রবাসীরা ‘চ্যানেল আই’ ও তাঁর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান তৃতীয় মাত্রাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে অতি প্রয়োজনীয় একটি অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে প্রবাসীদের আপন করে নেয়ার জন্য। সেই সাথে ধন্যবাদ জানাচ্ছে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও অতিথিদেরকেও, আপন ভেবে ও আপন হয়ে বক্তব্য দেয়ার জন্য।

প্রবাসীরা এখন সতর্ক পর্যবেক্ষণ করছেন প্রস্তাবিত অ্যাক্টের দিকে, আর প্রত্যাশায় আছেন, দেশ মাতৃকা তাঁদের বঞ্চিত করবে না। তাঁদের এ আকাঙ্ক্ষা কোন অনুদান নয় বরং এটার জন্য প্রবাসীরা নিজ কর্মগুনেই যোগ্য।

 

ভিডিওঃ তৃতীয় মাত্রার ‘উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় প্রবাসীদের অংশগ্রহন’ পর্ব 

 

Related posts