November 20, 2018

তৃণমূলে দল গুছিয়ে আন্দোলনে নামতে চায় বিএনপি

ঢাকাঃ  তৃণমূলে দল গোছাতে ঈদের পর সারাদেশে সাংগঠনিক সফর কর্মসূচী শুরু করবে বিএনপি। এ সফরকালে দলের কমিটি পুনর্গঠন, আন্দোলনের প্রস্তুতি ও পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির কৌশল নির্ধারণ করা হবে।

সূত্রমতে, জাতীয় কাউন্সিলের বেশ কিছুদিন আগেই বিএনপি হাইকমান্ড সারাদেশের তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠনের কাজে হাত দেয়। কিন্তু গ্রুপিং-কোন্দলসহ বিভিন্ন কারণে এ কাজে পুরোপুরি সফলতা অর্জন করতে পারেনি। তাই তৃণমূলে দল পুনর্গঠন স্থগিত রেখেই এ বছর ১৯ মার্চ জাতীয় কাউন্সিল করে বিএনপি। কথা ছিল জাতীয় কাউন্সিলের পর স্বল্প সময়ের মধ্যে সারাদেশের সর্বস্তরে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। কিন্তু জাতীয় কাউন্সিলের পর এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ নির্বাহী কমিটি করতে না পারাসহ বিভিন্ন কারণে তৃণমূলে কমিটি পুনর্গঠনের কাজও থেমে আছে।

সম্প্রতি বিএনপির নতুন নির্বাহী কমিটিতে স্থান পাওয়া নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ বৈঠকেই নতুন কমিটির নেতাদের জানানো হয় তৃণমূলে দল গোছাতে ঈদের পর সাংগঠনিক সফর শুরু হবে। প্রতি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকরা এ সফর কর্মসূচীতে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন। তৃণমূলে দল গোছানোর জন্য কমিটি পুনর্গঠনের পাশাপাশি তারা আন্দোলনের প্রস্তুতি ও পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য নেতাকর্মীদের দলীয় কৌশল জানিয়ে দেবেন। এছাড়া উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলের অবস্থা সম্পর্কেও কিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করবে তারা। সেই সঙ্গে তারা সাংগঠনিক সফর শেষে প্রতিটি বিভাগের দলীয় অবস্থার বিস্তারিত বর্ণনা করে একটি রিপোর্ট পেশ করবেন বিএনপি হাইকমান্ডের কাছে।

সূত্রমতে, বিএনপি হাইকমান্ড মনে করছে দল গুছিয়ে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করতে না পারলে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সুবিধা করা যাবে না। বিশেষ করে এ সরকারের বিরুদ্ধে আগের ২ দফা আন্দোলন কর্মসূচীতে ব্যর্থতার পর পরবর্তীতে বুঝেশুনেই মাঠে নামতে চায় বিএনপি। তাই ঈদের পর থেকেই দল গোছানো কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে দলটি।

জানা যায়, তৃণমূল পর্যায়ে দল গোছানোর কাজ শেষ করে বিএনপি প্রথমেই জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আন্দোলন শুরু করতে চায়। তারপর আস্তে আস্তে জনমত তৈরি করে সরকারবিরোধী আন্দোলন করার প্রস্তুতি নেবে। তবে আন্দোলন শুরুর আগে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ দলের সিনিয়র নেতারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে জনসভা করবে। কোথায় কোথায় জনসভা করা যায় সে ব্যাপারে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের খোঁজখবর নিয়ে জানাতে বলা হয়েছে বলে জানা গেছে।

পরবর্তী আন্দোলন কর্মসূচী শুরুর আগেই বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের পাশাপাশি সারাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের কমিটি এবং সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠনের কাজ শেষ করা হবে। এছাড়া আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটিও পুনর্গঠন করা হবে। রাজধানীতে আন্দোলনের দায়িত্ব পালনের জন্য শতাধিক নেতাকে নিয়ে একটি বিশেষ টিম গঠনের কথাও বিএনপি হাইকমান্ড চিন্তা করছে বলে জানা গেছে।

বিএনপি সূত্র জানায়, জাতীয় কাউন্সিলের আড়াই মাস পরও নির্বাহী কমিটিতে ৪২ জন ছাড়া কেউ পদ না পাওয়া এবং সিনিয়রদের ডিঙ্গিয়ে রাজনীতিতে জুনিয়রদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়ায় দলের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা হতাশ। আর এ কারণেই আগে কেন্দ্রীয় নেতারা নিজ নিজ এলাকায় তৃণমূলের বিভিন্ন ইউনিট কমিটি গঠনের কাজ তদারকি করলেও এখন আর এ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন না। তাই তৃণমূল নেতারাও কোন দিকনির্দেশনা না পাওয়ায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। এ কারণে তৃণমূলে দলীয় কর্মকান্ডও স্থবির হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর বিএনপি সারাদেশের সকল জেলা ও মহানগরে বিক্ষোভ কর্মসূচী দিলেও তা অধিকাংশ এলাকায়ই পালন করা হয়নি। এতে সারাদেশে বিএনপির দৈন্যদশা প্রকাশ পায়। আর তখন থেকেই বিএনপি হাইকমান্ড নতুন উদ্যমে তৃণমূলে দল গোছানোর কথা ভাবেন।

জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে গত বছর ৯ আগস্ট কেন্দ্র থেকে চিঠি দিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিএনপির ৭৫ সাংগঠনিক জেলা ও প্রতিটি জেলার বিভিন্ন ইউনিট কমিটি পুনর্গঠন করতে বলা হয়। এর মাসখানেক পর ১৫ সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করার আগে গুলশান কার্যালয়ে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। বৈঠককালে তিনি বার বার দলের নেতাদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা সবাই মিলে তৃণমূল পর্যায়ে দল পুনর্গঠনের কাজে সহযোগিতা করবেন। তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ হলেই বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল সম্পন্ন করা হবে বলে তিনি জানান। সিনিয়র নেতারাও তখন খালেদা জিয়াকে আশ্বস্ত করেছিলেন তিনি দেশে ফেরার আগেই ৭৫ সাংগঠনিক জেলা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ইউনিট কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ করা হবে।

খালেদা জিয়া লন্ডন সফরে গিয়ে ছেলে তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ২ মাস অবস্থান করে গত বছর ২১ নবেম্বর দেশে ফেরার পরও তা করতে না পারায় বিএনপির সিনিয়র নেতারা তোপের মুখে পড়েন। দলীয় কোন্দলসহ বিভিন্ন কারণে অধিকাংশ জেলা-উপজেলায় কমিটি পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়নি জানতে পেরে একপর্যায়ে খালেদা জিয়া যেসব এলাকায় কমিটি পুনর্গঠন হয়নি সেসব এলাকা থেকে মনোনীত প্রতিনিধিদের কাউন্সিলর করার সিদ্ধান্ত নেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতা থেকে অনেক দূরে সরে যাওয়ার পর দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা নেমে আসে। এ পরিস্থিতিতে গত বছর ৬ জানুয়ারি থেকে টানা ৯২ দিন অবরোধ ও দফায় দফায় হরতাল কর্মসূচী পালনের পর নাশকতার মামলায় জড়িয়ে জেলা পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে অনেকেই পেরেশানির মধ্যে পড়েন। এমন নাজুক পরিস্থিতিতে তৃণমূল পর্যায়ে দল পুনর্গঠন করতে খালেদা জিয়া জাতীয় কাউন্সিলের আগে কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে দেন। তাতেও কাজ না হওয়ায় তিনি কাউন্সিলের পর তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন করার কৌশল নেন।

এবারের জাতীয় কাউন্সিলে গঠনতন্ত্র সংশোধন করে এক নেতার এক পদ করায় অনেক জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কোন কোন নেতা কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদ পেতে তৃণমূলের পদ ছেড়ে দিতে চাচ্ছেন। তাই এখন তৃণমূলে কমিটি পুনর্গঠনের কাজে হাত দিলে আগের মতো আর দ্বন্দ্ব-সংঘাত হবে না বলে দলীয় হাইকমান্ড মনে করছে। অবশ্য তৃণমূলের যেসব কমিটিতে কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাওয়ার তালিকায় নেতাদের নাম রয়েছে তাদের কাছে আগেই জানতে চাওয়া হবে কোন পদটিতে তারা থাকতে চান।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান বলেন, তৃণমূলে দল গোছাতে ঈদের পর সাংগঠনিক সফরে যাবে কেন্দ্রীয় নেতারা। এ সময় তৃণমূলের কমিটি পুনর্গঠনসহ দলীয় কর্মকা- গতিশীল করার উদ্যোগ নেয়া হবে। জাতীয় কাউন্সিলের আগে বিভিন্ন কারণে সব জেলা-উপজেলায় কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ করা যায়নি। তাই এবার নতুন উদ্যমে দল গোছানোর কাজ শুরু করা হবে।জনকণ্ঠ

Related posts