September 24, 2018

তুরস্ক-দায়েশ এর তেল বাণিজ্যের দাবি; গাণিতিক বিশ্লেষণ

জঙ্গী গোষ্ঠী দায়েশ এবং রাশিয়ার সমর্থনপুষ্ট সিরিয়ার অবৈধ আসাদ সরকারের মাঝে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা তেল বাণিজ্য’কে ভিন্ন দিকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে রাশিয়া এখন তুরস্ক’কে এই অঞ্চলের অবৈধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে তেল বাণিজ্যরত একজন হিসেবে অঙ্কিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে ।

বছরের সবসময়ের মতো এটাও একটি সচরাচর তোলা গুঞ্জনঃ তুরস্ককে আইএস এর কাছ থেকে তেল ব্যাবসার জন্য অভিযুক্ত করা । প্রতি একক সময়েই যখনি তুরস্কের সাথে ভিন্নশক্তির মধ্যকার রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় তখনি এই গুঞ্জনকে শক্তদাবী আকারে এবং ক্রমাগত আওরানো কিছু যুক্তি দিয়ে সামনে এগিয়ে আনা হয় । আগের মতই এতে তুরস্ক সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যাক্তিদের বিবৃতিকে সামনে আনা হয়েছেঃ তবে প্রতিবারই সামান্য পরিবর্তন সহকারে। দাবীকৃত কথিত তেল বাণিজ্যের পরিমান শুরুর দিকে অতি সামান্য বলা হলেও প্রতিবারই যখনি কেউ একই ধারণা নিয়ে কথা বলেন তখনি এই কথিত লেনদেন এর পরিমান নাটকীয় ভাবে বেড়ে যায় । শুরুতে যেখানে এই লেনদেন এর পরিমান দিনে এক মিলিয়ন ডলার করে দেখানো হয়েছিল তাকে অতিনাটকীয় ভাবে বর্তমানে প্রত্যেক মাসে একশত মিলিয়নে উন্নীত করা হয়েছে ।

তুরস্কের আকাশসীমা লঙ্ঘনের দায়ে রাশিয়ার যুদ্ধবিমান ভূপাতিতকরণের পর রাশিয়ার প্রচার মাধ্যম বর্তমানে তুরস্কের নামে কলঙ্কলেপনের প্রচারণা শুরু করেছে। যদিও তুরস্কের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনসমর্থ ও বৈধ ছিল তবুও রাশিয়া একে সঠিক উপায়ে মোকাবেলার বদলে অপরিণত প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করার উদ্দেশ্যে তার প্রচার শক্তিকে ব্যাবহার করে তুরস্কের বিরুদ্ধে কুৎসিত প্রচার আরম্ভ করেছে; এমনকি স্থানীয় কিছু প্রচারমাধ্যমকে এইসব বিভ্রান্তিকর সংবাদের প্রচারে উদ্ধুদ্ধ করছে।

সবচেয়ে হাস্যকরভাবে এই প্রচারযুদ্ধের সর্বশেষ সংযোজন হল রাশিয়া টুডে’র (রাশিয়ার সরকারের আর্থিক সমর্থনপুষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত সংবাদ মাধ্যম) প্রকাশিত একটি ছবি; যাতে অতি জঘন্যভাবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ছেলেকে কিছু শুশ্রুধারী মানুষের মাঝে দেখানো হয় এবং রাশিয়া টুডের ভাষ্যমতে যাদের দায়েশের নেতা হিসেবে পরিচয় দেয়া হয় এবং আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে দাবী করা হয় এই সকল লোকেরা সিরিয়ার রোজাভা এবং হোমসের গণহত্যায় দায়ী । রাশিয়া টুডে যদিও একে তাদের একটি সফল সাংবাদিকতার উদাহরণ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছে কিন্তু আদতে একে প্রতিশোধের দীনতা হিসেবে চিহ্নিত করা যায় । সঠিক সত্য এই ছিল যে শুশ্রুধারী এই লোকগুলো ছিলেন ইস্তানবুল এর আকসারাই এলাকার একটি সুপরিচিত কাবাব দোকান(জিয়েরিস্তান) এর মালিক । সম্ভবত তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন; তবে সেটা ছিল টম্যাটোর গনহত্যা। আক্ষরিকভাবেই তারা প্রতিদিন শত শত কেজি টম্যাটো হত্যা করেন তাদের কাবাব তৈরির প্রয়োজনে । এই ঘটনায় বর্তমানে এটাই প্রতীয়মান যে বিরুদ্ধ-প্রচারণামূলক সংবাদ পরিবেশনায় রাশিয়ান গণমাধ্যম কি ধরনের অদ্ভুত ভুমিকায় লিপ্ত রয়েছে । সুতরাং অতি আবশ্যিক ভাবেই রাশিয়ান গণমাধ্যম পরিবেশিত তুরস্ক সম্পর্কিত খবরাখবর অতি সাবধানতার সাথে যাচাই করা প্রয়োজন।

“স্পুটনিক” নামের রাশিয়ার আরেকটি গণমাধ্যম প্রকাশিত হাস্যস্পদ খবরের বরাত থেকে জানা যায়; ‘দায়েশ গত আট মাসে তুরস্কের সাথে তেল বাণিজ্যের মাধ্যমে ৮০০ মিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য করেছে’ । “মোওয়াফফাক-আল-রুবাই” নামক এক ইরাকি রাজনীতিবিদের বরাত দিয়ে স্পুটনিক জানায় “দায়েশ” তুরস্কের কাছে কালোবাজারে মাত্র ২০ ডলার ব্যারেল প্রতি করে তেল বিক্রি করছে । যেখানে বৈধ ভাবে এর দাম ব্যারেলপ্রতি ৫০ ডলার। এই দাবির পক্ষে এক মাত্র সত্য এইযে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৫০ ডলার (ক্ষেত্রবিশেষে ৪৫) । এছাড়া সাধারণ গাণিতিক হিসাবে পরীক্ষাতেই বাকি সমস্ত অভিযোগের দাবীকে খণ্ডন করে দেয়া যায় ।

আমাদের হাতে দুইটি “রাশিয়া”র মৌলিক দাবী আছে, প্রথমত, “দায়েশ” প্রতি মাসে ব্যারেল্প্রতি ২০ ডলার করে ১০০ মিলিয়ন ডলারের তেলবাণিজ্য করে “তুরস্কে”র সাথে।সেই হিসেব মতে “দায়েশ” তুরস্ককে এই পর্যন্ত ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বিক্রি করেছে। সহজ হিসেবে,প্রতি ব্যারেলে তেল থাকে ১৫৯ লিটার । আমরা যদি একে ৫ মিলিয়ন এর সাথে গুন করি তবে এই পরিমাণটি হচ্ছে ৭৯৫ মিলিয়ন ডলার। দেখা যাচ্ছে এটি অত্যন্ত বিরাট পরিমান তেল। আমরা জানি আন্তর্জাতিক ভাবে তেল সরবরাহের মাত্র চারটি পথ রয়েছেঃ রেলপথে, তেল ট্যাংকার,তেলের ট্রাক কিংবা পাইপলাইন । তুর্কি কর্তৃপক্ষ বা ঐ এলাকায় বসবাসকারী কারো অজান্তে যদি “দায়েশ” তাদের নিজস্ব পাইপলাইন তৈরি না করে থাকে তবে “তুরস্ক” পর্যন্ত তেল পরিবহনের একমাত্র উপায় হল তেল ট্যাংকার কিংবা ট্রাকের মাধ্যমে সড়ক পথে সরবরাহ করা । গড়ে একটি তেল ট্যাংকারের পরিবহন ক্ষমতা হল ৩৫০০০ লিটার, এই হিসেবমতে “দায়েশ”কে প্রতি মাসে অন্তত ২৩০০০ বার ট্রাক পারাপারের বন্দোবস্ত করতে হবে, প্রতিদিনে অন্তত ৭৬৬ টি করে । তাদেরকে অবশ্যই তাহলে প্রতিদিন “তুরস্ক” সীমান্ত পেরিয়ে যেতে হবে এবং ফিরে আসতে হবে। রাশিয়ার দাবী মতে গত আট মাস ধরে এই ঘটনাই ঘটে চলেছে । আপাতদৃষ্টিতে, যখন আমরা কিছু উদ্দেশ্যহীন সংখ্যা দেখি তখন তাকে বিশ্বাস করাটা সোজা, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই সব পরিসংখ্যানকে যাচাই করতে গেলে এর নিদারুণ অর্থহীনতা প্রকাশ হয়ে পড়ে। সাধারণ জ্ঞানেই, দায়েশের পক্ষে প্রতিদিন তুরস্কে ৭৬৬’টি তেলের ট্রাক প্রেরণ করা এবং দুই দেশের সীমান্তে কারো নজরে পড়া ছাড়াই এতো বিপুল সংখ্যক যানকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা অসম্ভব। এটাও নজরে রাখা উচিৎ যে সকল বিদেশি গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা এই মুহূর্তে সিরিয়ায় সংঘটিত সর্বশেষ খবরাখবর সরবরাহের নিমিত্তে তুরস্ক-সিরিয়ার সীমান্তে অবস্থান করছেন। মোদ্দাকথায়, তুরস্কের সাথে দায়েশের যে ১০০ মিলিয়ন ডলারের তেল বাণিজ্যের যে রাশিয়ান দাবী তাকে অর্থহীন এবং অকার্যকর বলা চলে।

যেকোনো ওয়াকিবহাল মহলের চোখে এই বিষয় অবশ্যই ধরা পড়বে । তবে কেন রাশিয়া প্রতিনিয়ত এই সকল সংবাদ প্রচার করছে ? এর পক্ষে বহু সম্ভাব্য যুক্তি বিদ্যমান। তবে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ উত্তরটি হল আসাদ সরকারের সাথে “দায়েশ” এর তেল বাণিজ্যকে ভিন্ন দিকে প্রভাবিত করা । চলমান মাসের ২৫ তারিখে “আমেরিকা” “জর্জ হুসাইনি” নামের একজন সিরিয়ান ব্যাবসায়ীর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যিনি আগে থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর নিষেধাজ্ঞা ভোগ করছেন । যাকে দায়েশ এবং আসাদ সরকারের মাঝে তেল বাণিজ্যের প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এছাড়াও নতুন করে আরও দুজন মধ্যস্থতাকারী “মুদালাল খুরী” এবং “কিরসান লিউমঝিনুভ”কেও রাশিয়ার হয়ে সিরিয়ার আসাদ সরকারকে সহায়তার অভিযোগে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে । বর্তমানকালের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সঠিক ভাবে বিশ্লেষণ করলেও দেখা যায়’যে সিরিয়ার অবৈধ আসাদ সরকার নিজেই দায়েশের সাথে তেল বাণিজ্যের প্রধান অংশীদার । সাম্প্রতিকসময়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং রাশিয়ান গণমাধ্যমের উপর্যুপরী ভিত্তিহীন দাবীকে বিশেষজ্ঞরা সত্যিকারের এই শীতল বাস্তবতাকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা হিসেবে মনে করছেন ।

অতএব, এটা গাণিতিক এবং যুক্তিগত ভাবেই প্রমানিত যে তুরস্কের দায়েশের কাছ থেকে তেল কেনার যে গুজব তা বাস্তবিকপক্ষেই অসম্ভব। এমনকি যদি তুরস্ক কর্তৃপক্ষ বাণিজ্যের ইচ্ছা পোষণ করেও থাকে, তবুও তা সম্ভব নয়। কারন “দায়েশে”র কাছে কম পরিবহন খরচ এবং কাস্টমসের কোন সমস্যা ছাড়াই একজন স্থিতিশীল ক্রেতা রয়েছে, সেটা হল রাশিয়ান সমর্থনপুষ্ট সিরিয়ার অবৈধ আসাদ সরকার ।

লেখকঃ রাহমি কোপার

(লন্ডন সেন্টার অফ ইন্টারন্যাশনাল “ল” প্র্যাকটিস এর তেল ও গ্যাস বিষয়ক আইন গবেষক এবং সেন্টার ফর এনার্জি, পেট্রলিয়াম এন্ড মিনারেল ল এন্ড পলিসি, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডির পি.এইচ.ডি গবেষক )

অনুবাদঃ রাইফ ইফতিখার

Related posts