November 22, 2018

তুরস্ক কি পারবে রাশিয়াকে সামলাতে ?

রাশিয়া-তুরস্কের বাগযুদ্ধ

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কঃ     রাশিয়া-তুরস্কের বাগযুদ্ধ গড়িয়েছে অবরোধ পর্যন্ত। অবরোধের পরের ধাপ কি হবে তা এখনো অজানা। বিমান ভূ-পাতিত করায় রাশিয়া দাবি, ক্ষমা চাইতে হবে তুরস্ককে। কিন্তু ক্ষমা চাইতে নারাজ তুরস্ক।

ঘটনার পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছিলেন, ‘এজন্য চরম মূল্য দিতে হবে তুরস্ককে।’ একধাপ এগিয়ে দেশটির প্রভাবশালী এক নেতা কর্নেল ভ্লাদিমির ঝিরিনোভস্কি তুরস্কের ঐতিহাসিক শহর ইস্তাম্বুলে পারমাণবিক হামলা চালানোর হুমকি দেন। তবে নিজের জায়গায় অনড়ই ছিলেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।

সামরিক ও আর্থিক দুই নিক্তিতেই তুরস্কের চেয়ে রাশিয়া যোজন যোজন এগিয়ে। রুশদের সঙ্গে বিবাদ বাড়িয়ে কৌশলগতভাবেও দুর্বল হয়ে পড়ছে তুরস্ক। সামরিক মিত্র ন্যাটো আপাত দৃষ্টিতে কাছে থাকলেও কঠিন সময়ে তাদের পাবে কি না তা নিয়েও আছে সন্দেহ। তার ওপর অর্থনীতি পঙ্গুর হওয়ার আশঙ্কা।

রাশিয়া তুরস্কের দ্বিতীয় বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। তারা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করায় চিন্তার ভাজ এরদোগানের কপালে। আর সে কারণেই হয়তো ক্ষমা না চাইলেও সুর নরম করে বিমান ভূ-পাতিতের জন্য ‘দুঃখ’ প্রকাশ করেছেন তিনি।

পুতিন তুরস্কের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের যে ডিক্রিতে সই করেছেন, তাতে রাশিয়ায় তুর্কি কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনা এবং রুশ কোম্পানিতে তুরস্কের নাগরিকদের কাজ করার ওপর বিধি-নিষেধের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ফ্লাইট বন্ধ ও রুশ নাগরিকদের তুরস্ক ভ্রমণেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তুরস্কের সঙ্গে ভিসা ফ্রি চুক্তিও বাতিল করে দিয়েছে রাশিয়া।

এই তিক্ততা দুদেশের অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তবে রাশিয়ার চেয়ে ক্ষতিটা তুরস্কেরই বেশি হবে বলে ধারণা। ঘটনার পর পণ্য নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সীমান্ত থেকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে তুরস্কের পণ্যবাহী ট্রাক। বন্ধ করা হয়েছে খাদ্যপণ্য আমদানীও। এর ফলে হুমকিতে পড়েছে দুই দেশের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য। সেই সঙ্গে সিরিয়া যুদ্ধের ভবিষ্যতও আরো জটিল হয়ে উঠছে।

তুরস্কের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার রাশিয়া। বাণিজ্য বাড়াতে নতুন গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন এবং খাদ্য ও পর্যটনের ক্ষেত্রে অনেকগুলো চুক্তি করেছে দুদেশ। গত সেপ্টেম্বরে দুদেশের বাণিজ্য বাড়াতে বৈঠকে বসেছিলেন পুতিন-এরদোগান। বৈঠকে আগামী আট বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের পরিকল্পনা করেন দুই নেতা।

কিন্তু বিমান ভূ-পাতিতের পর সেই পরিকল্পনায় বড় ধরনের ধাক্কা খেলো বলেই মনে হচ্ছে। ক্রিমিয়ার ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী রুশলান বালবেক রুশ বার্তা সংস্থা ইতার তাসকে বলেছেন, রাশিয়া এরই মধ্যে তুরস্কের ৩০ টি বিনিয়োগ কোম্পানির ৫০০ মিলিয়ন ডলার আটকে দিয়েছে। আর কাস্নোদার অঞ্চলের স্থানীয় একটি টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, ভিসা আইন অমান্য করার কারণে রাশিয়ায় একটি কৃষি সম্মেলনে আসা তুরস্কের ৩৯ জন প্রতিনিধিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

রাশিয়ার অবরোধের পর যেসব সেক্টর ঝুঁকির মধ্যে আছে তার একটি জ্বালানি। ক্রিমিয়া সংকটের পর ইউরোপিয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে ভাটার কারণে তুরস্কের দিকে বেশি ঝুঁকে রাশিয়া। দুদেশ নতুন গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের কাজও শুরু করেছে।

আঙ্কারায় অবস্থিত জার্মান মার্শাল ফান্ডের ডিরেক্টর ওজগুর আনলুসিয়াস্কি বলেন, রাশিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি পেয়ে থাকে তুরস্ক। এটা বন্ধ হলে রাশিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে ক্ষতির পরিমাণটা তুরস্কেরই বেশি। সারা দুনিয়ায় জ্বালানির চাহিদা থাকায় রাশিয়া হয়তো অন্য কোনো ক্রেতা খুঁজে নেবে।।

তিনি আরো বলেন, কোনো চুক্তি ছাড়াই রাশিয়া থেকে জ্বালানি পাচ্ছিলো তুরস্ক। রাশিয়ার জ্বালানির ওপর অনেকাংশেই নির্ভর তুরস্কের অর্থনীতি। বছরে প্রায় ৫০ কিউবিক মিটার গ্যাস রাশিয়া থেকে আমদানি করে তুর্কি। বিশ্ববাজারের চেয়ে ১০ শতাংশ কম দামে রাশিয়া থেকে গ্যাস কেনে তুরস্ক।

নিরাপদে জ্বালানি সরবরাহের জন্য কৃষ্ণ সাগর পর্যন্ত একটি পাইপলাইন স্থাপন করছে দুদেশে। জ্বালানি কোম্পানি গ্যাসপ্রমের ওই পাইপলাইন স্থাপনে খরচ হবে ১২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। তুর্কির বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ সালে তুরস্ক রাশিয়ায় ৫৯০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। একই সময় রাশিয়া থেকে আমদানি করেছে ২৫২০ কোটি ডলারের পণ্য।

আনলুসিয়াস্কি বলেন, কোনো রকম চুক্তি না থাকায় রাশিয়া জ্বালানি সরবরাহ না করলেও তুরস্কের কিছুই বলার থাকবে না। শুধু জ্বানানি নয়, রাশিয়া চাইলেল সবই বন্ধ করে দিতে পারে।

শুধু জ্বালানি সরবরাহ নয়, তুরস্কের প্রথম পরমাণু চুল্লির কাজও করছে একটি রুশ কোম্পানি। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় কোম্পানি রোসাটম পরমাণু চুল্লির কাজের জন্য তুরস্কের সঙ্গে ২০১০ সালে ২০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে। এই চুল্লির কাজ এখনো শেষ হয়নি। রুশ অর্থনীতি উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী অ্যালেক্সি উলিকভ বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার আওতায় পরমাণু সেক্টরও থাকতে পারে।

রুশ নিষেধাজ্ঞার ফলে তুরস্কের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগবে পর্যটন খাতে। তুর্কির সমুদ্র সৈকতগুলোতে সারা বছরই বিচরণ করেন রাশিয়ার পর্যটকরা। আরেক বিমান বিধ্বস্তের ফলে মিশরে নাগরিকদের ভ্রমণ করতে নিষেধ করে রাশিয়া। যার ফলে তুরস্কে বেড়ে যায় রুশ পর্যটকের সংখ্যা। কিন্তু রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সারগেই ল্যাভরভ তার দেশের নাগরিকদের তুরস্ক ভ্রমণ করতে না করেছেন। সেই সঙ্গে ট্রাভেল এজেন্সিগুলোকে ফ্লাইট বন্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছে।

রাশিয়ার হিসেবে গত বছর তাদের দেশের প্রায় ৪৫ লাখ নাগরিক তুরস্ক ভ্রমণ করেন। যা মোট পর্যটকের ১২ শতাংশ। আর তুর্কির হিসেবে সংখ্যাটা ৩৩ লাখ। জার্মানির পর তুরস্কে পর্যটকের সংখ্যায় রাশিয়া দ্বিতীয়। মস্কোভিত্তিক পর্যটক গবেষক টম মার্কো বলেন, রাশিয়াই হতে পারতো তুরস্কের পর্যটনের সবচেয়ে বড় বাজার। তবে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে অর্থনীতি থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার হারাবে তুরস্ক। আর রাশিয়া যদি ভিসা ফ্রি চলাচল পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে তাহলে আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তুর্কি।

জ্বালানি ও পর্যটনের মতো খাদ্য আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তুরস্ক। এরই মধ্যে তুরস্কের খাদ্যপণ্য বয়কট করে দেশীয় পণ্য কিনতে নাগরিকদের অনুরোধ করে রাশিয়া। রুশ ভোক্তা নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে, চলতি বছরের এ পর্যন্ত তুরস্ক থেকে শুধু ১৭৮ টন মুরগিই রাশিয়ায় এসেছে। তবে বিমান ভ-ভূপাতিতের পর সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। আমদানি-রফতারি বন্ধ হয়েছে অন্য পণ্যেরও।

তবে কিছুটা চাপে আছে রাশিয়া। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল(আইএমএফ) জানিয়েছে, তেলের দাম কম ও পশ্চিমা অবরোধে চলতি বছর রাশিয়ার জিডিপি ৩.৮ শতাংশ কমে যেতে পারে। চাপে আছে তুরস্কও। এবার দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩.১ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ছিল ৯ শতাংশ। গত জুনের সংসদ নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ডলারের বিপরীতে তুরস্কের লিরার দামও ২০ ভাগ কমে গেছে। ফলে তুরস্কের যে স্বল্পমেয়াদী ১২৫ বিলিয়ন বৈদেশিক ঋণ আছে তা পরিশোধ করা আরো ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে।

আমদানি-রফতানি আটকাতে সীমান্ত কড়াকড়ি আরোপ করেছে রাশিয়া। রুশ সীমান্ত থেকে তুরস্কের পণ্য বোঝাই বহু ট্রাক ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তুরস্ক রাশিয়াতে গত বছর দেড় বিলিয়নেরও বেশি ডলারের পল্য রপ্তানি করে। জর্জিয়া সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সীমান্তে যানবাহন আটকে দেয়ার পর রাশিয়া-জর্জিয়ার নিরপেক্ষ অঞ্চলে শত শত তুর্কি ট্রাক অপেক্ষা করছে। বেশিরভাগ ট্রাকেই খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য ছিলো।

তবে পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, তুরস্কের কোনো পণ্য নিষিদ্ধ করা হয়নি। কিন্তু ‘নানাবিধ কারণে’ শুল্ক কর্মকর্তারা অধিক সতর্কতার সঙ্গে সবকিছু খুটিয়ে দেখছেন। ধারণা করা হচ্ছে পেসকভের এই বার্তা, তুরস্কের বিরুদ্ধে নেয়া রাশিয়ার অনিশ্চিত অ্যাকশনের প্রথম স্বাভাবিক পদক্ষেপ।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts