September 21, 2018

তুরস্কে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের নেপথ্যে কি?

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কঃ  এ যাত্রায় টিকে গেছেন এরদোগান সরকার। ১৫ই জুলাই রাত ন’টার কিছু পর যে সেনা অভ্যুত্থান শুরু হয় তার পরের কয়েক ঘণ্টা সবকিছু ছিল বিদ্রোহীদের দখলে। রাত ১২টার পর গণমাধ্যমে প্রথম কথা বলেন তুর্কি প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম। তখনও কেউ ভাবেনি এরদোগান সরকার সকাল পর্যন্ত টিকবে। তবে সবকিছু পাল্টে যায় রাত ১টার পর। এক মোবাইল বার্তায় প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান তার সমর্থকদের আহ্বান জানান রাস্তায় নেমে আসতে। তিনি নিজেও রাস্তায় নামার ঘোষণা দেন।

তারপরই সশস্ত্র এ অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে ঢল নামে সাধারণ জনতার। তারা রাস্তায় বেরিয়ে সেনাবাহিনীর ট্যাংকগুলো দখলে নেয়। জনতার চাপে তুরস্কের প্রধান বিমানবন্দর থেকে রাতেই সরে যেতে বাধ্য হয় সেনাবাহিনী। এরদোগান বিমানবন্দর হয়ে ইস্তাম্বুল ফিরে টেলিভিশনে ভাষণ দেন। রাস্তায় নেমে তাকেও বিক্ষোভে যোগ দিতে দেখা যায়। এই লেখাটা যখন লেখছি তখনও রাজধানী আঙ্কারার কিছু অংশ বিদ্রোহীদের দখলে। প্রেসিডেন্ট এরদোগান নতুন করে গণতন্ত্র বাঁচাতে তার সমর্থকদের আঙ্কারার রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছেন। এতকিছুর পরও খুব আচমকা কিছু না ঘটলে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকছে- এটা বলা যায়।

তবে কথা হচ্ছে কেন সেনাবাহিনীর একটি অংশ এরদোগান সরকারের অপসারণ চায় আর কে আছে এর পেছনে? গত শুক্রবার অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার পর বেশ কয়েকজন তুর্কি বন্ধুর সঙ্গে কথা বলি, যাদের অধিকাংশই সাংবাদিক, বা এখানকার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত। এমনই একজন বন্ধু, ইস্তাম্বুলের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, আমরাও রাষ্ট্রের কিছু পরিবর্তন চাই। কিছু জিনিসের পুনঃপ্রতিষ্ঠা চাই। তবে তা অস্ত্রের মাধ্যমে না। আসলে গতকাল দেখা গেল যারা এরদোগানের কট্টর বিরোধী তারাও সেনা অভ্যুত্থানকে সমর্থন করছেন না। প্রধান বিরোধী দল বলছে, সেনা অভ্যুত্থানের কারণে লম্বা ভোগান্তি গেছে তুরস্কের উপরে। নতুন করে আর চাই না। ফলে সব বিরোধী গোষ্ঠীর সমর্থনই এরদোগান পেয়েছেন গত রাতে। যাই হোক, সেনাবাহিনীর সঙ্গে বর্তমান সরকারের সমস্যা এখানেই। আসলে সেনাবাহিনীসহ অন্য বিরোধী দলগুলো বারবার অভিযোগ করছে এরদোগান সরকার যা করছে তা এ রাষ্ট্রের আদর্শবিরোধী। এ সরকার অব্যাহতভাবে ইসলামপন্থার সঙ্গে ঝুঁকে যাচ্ছে যা তুরস্কের রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের জন্য হুমকি। এর বাইরে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে তিনি একনায়কের মতো দেশ চালাচ্ছেন। দিনে দিনে কর্তৃত্ববাধী হয়ে উঠছেন।

এরদোগানের সরকার ক্ষমতায় আসার পর হিজাবের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়েছেন। প্রকাশ্য স্থানে ধর্মীয় আলোচনা করার সুযোগ করে দিয়েছেন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে ইসলাম প্রবেশ করেছে, যা আগে ছিল নিষিদ্ধ। মূলত এসবের পুনঃবিদায় চায় এরদোগান বিরোধী শক্তি। তারা আধুনিক তুরস্কের প্রবর্তক মোস্তফা কামাল পাশার মূলনীতির সমূহ বহাল চায়। এ অভ্যুত্থানের পেছনে এসব কারণই প্রধান বলে অনেক বিশ্লেষক বলছেন।

এদিকে এরদোগান সরকার এ অভ্যুত্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ফেতুল্লা গুলেন-এর হাত রয়েছে বলে দাবি করেছে। গুলেন আন্দোলনের এ নেতার সমর্থন নিয়ে প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছিল এরদোগান। এরপরই দুজনের মধ্যে নানা বিষয়ে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। পুরো তুরস্ক জুড়ে এখনও গুলেনের প্রচণ্ড প্রভাব। রয়েছে বিশাল ভক্ত বাহিনী। তবে এরদোগানের সঙ্গে তুরস্কের অভ্যন্তরে লড়াই করার ক্ষমতা ক্রমেই গুলেনের কমছে। এখন যা ‘নাই’-এর ঘরে এসে থামবে বলেই বলছেন বিশ্লেষকরা। এর আগে পুলিশসহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগ থেকে গুলেনপন্থিদের বিদায় করেন এরদোগান। গত শুক্রবার রাতের অভ্যুত্থানের পর এক শ’র উপরে ব্যক্তিকে ইতিমধ্যে চাকরি ছাড়া করা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। তাদের একটি বড় অংশই গুলেনপন্থি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ এই অভ্যুত্থানের পেছনের কাহিনী নিয়ে অনেক কথাই হয়তো আমরা জানবো। কিন্তু এ অভ্যুত্থান এরদোগানের জন্য শাপেবর হয়ে এলো না তো? একদিকে যেমন এরদোগান নিজের জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায় পাস করলেন আর একদিকে তিনি পেলেন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। এরদোগান আরো ক্ষমতাময়ী হয়ে উঠতে চাইলে অদূর ভবিষ্যতে এমন আশঙ্কার পুনরাবৃত্তির কথা বলছেন অনেকেই। তবে অনেকেই এ থেকে শিক্ষা নিয়ে এরদোগান তার প্রথম আমলের নমনীয়তার দিকেই ফিরে যাবেন বলে আশা করছেন। আপাতত আমরা দৃষ্টি রাখি তুরস্কে কী ঘটে, বা ঘটছে সে দিকে। আর নানা তর্ক-বিতর্কের পর গণতন্ত্রের প্রতিই রাখি আস্থা!

Related posts