November 14, 2018

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তুমুল বিতর্কে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির

375

মুহাম্মদ নূরে আলম
বরষণ,লন্ডন থেকেঃ
ক্রসফায়ার গুম খুন জঙ্গিবাদ আইএস উত্থান নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির। প্রকৃত পক্ষে মানবাধিকার লংঘন সংখ্যালঘু নির্যাতন ক্রসফায়ারসহ সন্ত্রাসবাদ জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে পরস্পরের ওপর দায় চাপানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অফ লর্ড সভার উদ্যোগে হাউস অফ কমন্সের একটি সেমিনার রুমে আয়োজিত সেমিনারে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের আলোচনা।

গতকাল মঙ্গলবার লন্ডনের স্থানীয় সময় বেলা ১টায় বাংলাদেশ সেমিনার অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাজনৈতিক দল সমূহের ভূমিকা শীর্ষক সেমিনার যৌথ ভাবে সভাপতি হিসেবে পরিচালনা করেন, ব্রিটিশ লর্ড সভার সদস্য আলেক্সান্ডার চার্লস কারলাইল ও বাংলাদেশ-বিষয়ক সর্বদলীয় কমিটির চেয়ার ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির এমপি অ্যান মেইন।

সেমিনারে বক্তব্য রাখেন, বিএনপির পক্ষ থেকে বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সাবিহ উদ্দিন আহমদ ও বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক নিতাই রায় চৌধুরী, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, ইউকে বিএনপির সভাপতি এম এ মালেক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির যুক্তরাজ্যের মুখপাত্র ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা প্রমুখ ।

সেমিনারে এম এ মালেক ও এম কায়সার ও মুফিদুল রহমানের নেতৃত্বে ইউকে বিএনপির নেতা কর্মীরা উপস্থিত ছিল। এবং ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লার নেতৃত্বে জামায়াতের কিছু সংখ্যক নেতা কর্মী উপস্থিত ছিল ।

সেমিনারে সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান, ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, জাতীয় পার্টির মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদার। বক্তব্য রাখেন মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধিও।

এতে উপস্থিত ছিলেন- সায়মন ডানসাক এমপি, রিচার্ড ফুলার এমপি, ব্যারোনেস ব্রিজ, এমোনেষ্টি ইন্টারন্যাশন্যালের আব্বাস ফয়েজ ও হিউম্যান রাইট ওয়াচের ব্রাড এডামস, মানবাধিকার সংগঠক ফরিদুল ইসলাম ও মনিরুল হক প্রমুখ।

সেমিনারে একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধি ও ব্রিটিশ এমপিরা বলেছেন, বিরোধীদের ওপর দোষ চাপিয়ে সরকার নিজের দায়িত্ব এড়াতে পারে না, এটা অগ্রহণযোগ্য। বর্তমান সরকার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে । বিরোধী দলের উপরে ক্রমাগত দমন নিপীড়নের ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতা থেকে দেশে সন্ত্রাসবাদ জঙ্গিবাদের উত্থান হচ্ছে । পুলিশ খেফাজতে মৃত্যু, ক্রসফায়ার গুম খুন, বিচার বিভাগীয় হত্যাকান্ডের দায় সরকার এড়িয়ে যেতে পারে না। গণতান্ত্রিক ভাবে দেশ পরিচালনা করতে শেখ হাসিনার সরকার সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ বলে অভিমত পোষণ করেন।

সেমিনারের শুরুতেই ‘ চ্যাথাম হাউস রুল’ এর নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করে সেমিনারের কোনো ছবি তুলা বা এবিষয় কোনো নিউজ প্রকাশ করা যাবে না বলে সবাইকে জানিয়ে দেন সেমিনারের অন্যতম উদ্যেক্তা লর্ড কার্লাইল। লর্ড কার্লাইল অনুরোধ করেন, যাতে সেমিনারের বক্তাদের উদ্ধৃত করে কোনো সংবাদ প্রচার করা না হয়। সেই অনুরোধের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সেমিনারে কোন বক্তা কী বলেছেন, তা উল্লেখ থেকে বিরত থাকছে এই প্রতিবেদক।

মানবাধিকার সংগঠনের আরে প্রতিনিধিরা বলেন, ক্ষমতার বাইরে থাকলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় রক্ষক বনে যান। কিন্তু ক্ষমতায় গেলেই তারা সেসব ভুলে প্রতিশ্রুতির বিপরীতে আচরণ করেন। এ সময় একজন ১/১১ পরবর্তী সময়ে লন্ডনে নির্বাসিত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের পক্ষে নানা উক্তির কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলেন, বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, খুন, গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো বন্ধ করার দায়িত্ব সরকারের। সুষ্ঠু তদন্ত এবং যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। কিন্তু একটি ঘটনাও সুষ্ঠু নিরপেক্ষ কোনো তদন্ত না হওয়ার কারণে দেশে বিচার বহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতন এবং সন্ত্রাসবাদ জঙ্গীবাদের উত্থান হচ্ছে ।

আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিরা সরকারের বিভিন্ন সাফল্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে বলেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলেই বাংলাদেশে যে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে, তার প্রভাব এখনো টেনে চলছে বাংলাদেশ।

এর জবাবে বিএনপির নেতারা বলেন, ৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল তখন রমনা বোমা হামলা, সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলা, ফরিদপুরের বোমা উদ্ধারসহ একটি বোমা হামলারও সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্ত তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার করেনি । কারণ হামলাকারী জঙ্গী আব্দুর রহমান আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আযম এমপির ভগ্নিপতি। জঙ্গী বাংলা ভাই ও মুফতি হান্নানও আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মীয় ।

বিএনপির নেতারা দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন, ক্রসফায়ার, গুম, খুন, গণগ্রেপ্তারের চিত্র তুলে ধরে বলেন, স্বাধীন মত প্রকাশ এবং রাজনীতির সুযোগ সীমিত হয়ে আসার কারণেই দেশে সন্ত্রাসী হামলার প্রবণতা বেড়েছে। জবাবে সরকারপক্ষ সন্ত্রাসবাদকে বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে সম্মিলিতভাবে এই সমস্যা সমাধানের কথা বলে। বিএনপির নেতারা পরিষ্কার ভাষায় বলেন জঙ্গী সন্ত্রাসবাদ সংখ্যালঘু নির্যাতন, ক্রসফায়ার, গুম, খুনের সাথে অবৈধ আওয়ামী লীগ সরকার জড়িত । তারা আরও অভিযোগ করেন বলেন বিরোধী দল বিএনপির উপরে সরকার ক্রমাগত দমন নীপিড়ন চালাচ্ছে এবং সর�কার বিরোধী আন্দোলনে বিএনপির নেতা কর্মীদের দেখা মাত্র গুলি করে হত্যা করছে।

বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, গুলশানের ঘটনার পর জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় খালেদা জিয়া জাতীয় ঐক্যের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার তা নাকচ করে দিয়েছে। জবাবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়, সন্ত্রাসী সংগঠন জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করার কথা বারবার বলা হলেও বিএনপি তা করছে না।

সেমিনারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর যুক্তরাজ্যের মুখপাত্র আবু বকর মোল্লার বক্তব্য দেওয়ার সময় হট্টগোল সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগের বক্তারা বলেন, জামায়াতের কেউ উপস্থিত থাকবে জানলে তাঁরা এই সেমিনারে অংশ নিতেন না।

জামায়াত প্রতিনিধি বিষয়ে হট্টগোল: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির যুক্তরাজ্যের মুখপাত্র ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা আমন্ত্রিত হয়ে সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন। জামায়াতকে সন্ত্রাসী সংগঠন উল্লেখ করে সরকারি দলের এক বক্তার বক্তব্যকে খণ্ডন করে আবু বকর মোল্লা বক্তব্য দিতে গেলে সেমিনারে তুমুল হট্টগোল সৃষ্টি হয়। সরকারি দলের ওই বক্তা বলেন যে, জামায়াতের কেউ উপস্থিত থাকবে জানলে তাঁরা এই সেমিনারে অংশ নিতেন না। এ নিয়ে তুমুল হট্টগোল শুরু হয়। ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লার জন্য নির্ধারিত দুই মিনিটের বক্তব্য শেষ করতে না দিয়ে এমপি অ্যান মেইন থামিয়ে দেয়। আবার একই বিষয়ে হট্টগোল সৃষ্টির জন্য অ্যান মেইন এমপি পুনরায় তারানা হালিমকে বক্তব্যের সুযোগ দেয় এইবার দেয়া নিয়ে মোট চার তারানাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেয় !?? বক্তব্যের সুযোগ
পেয়ে তারানা হালিম বলেন জামায়াত একটি সন্ত্রাসী সংগঠন এবং তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের রেফারেন্স উল্লেখ করেন । ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা আবারও ভুল তথ্যের প্রতিবাদ করে বলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টে এইধরনের কোনো বক্তব্য নাই। তখনই শুরু হয় তুমুল হট্টগোল। ঠিক তখনই ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লার কোনো রকম দোষ ছাড়ায় অ্যান মেইন এমপি পক্ষপাত দুষ্টু আচরণ করে জামায়াত প্রতিনিধিকে চলে যাওয়ার অনুরোধ করেন । কিন্তু ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা চুপচাপ বসে পড়লেও আওয়ামী লীগ হট্টগোল অব্যাহত রাখে। এবং অ্যান মেইন এমপি নিজে সেমিনার রুম থেকে বের হয়ে নিরাপত্তা কর্মীদের ডেকে আনেন। অবস্থা নাজুক হওয়ার প্রেক্ষিতে ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা প্রতিবাদ করে বের হয়ে আসেন। তিনি আসার সময় বলতে থাকেন এটা পক্ষপাত দুষ্টু আচরণ, আমি এখানে একজন আমন্ত্রিত অতিথি । আজকের সেমিনারের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো আওয়ামী লীগ একটি অগণতান্ত্রিক বাকশালী ফ্যাসিস্ট সরকার । বলতে গেলে পুরো সেমিনারে অ্যান মেইন এমপি বিএনপি জামায়াত প্রতিনিধিদের সাথে পক্ষপাত দুষ্টু আচরণ করেন ।

বিএনপির কর্মীদের সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের সাথে দুর্ব্যবহার:

ইউকে বিএনপির স্বেচ্ছা সেবকদলের কর্মী আবুল হোসেন নেতৃত্বে কয়েকজন উৎশৃঙ্খল কর্মী সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের সাথে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি শুরু করে কোনো প্রকার কারণ ছাড়া । কি হয়েছে জানতে চাইলে দৈনিক সংগ্রামের লন্ডন প্রতিনিধি ও টাইম নিউজ বিডির লন্ডন বু্্যরো চীফ মুহাম্মদ নূরে আলম বরষণকে মারতে তেড়ে আসে ইউকে বিএনপির স্বেচ্ছা সেবকদলের কর্মী আবুল হোসেন। আর শুরু করে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি । কয়েকজন সিনিয়র বিএনপির নেতা
উৎশৃঙ্খল কর্মী আবুল হোসেনকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। সেখানে উপস্থিত সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা হতবাক হয়ে যায় বিএনপির এইরকম আচরণে । বিএনপির এই উৎশৃঙ্খল কর্মীকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করাতে চাইলে বিএনপির নেতাদের অনুরোধে সেটা করেনি ।

বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সংলাপ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের লর্ড সভার প্রয়াত সদস্য এরিক অ্যাভবেরির উদ্যোগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের নিয়ে ২০০৫ সাল থেকে সময় সময় সেমিনারের আয়োজন শুরু হয়। অ্যাভবেরির মৃত্যুর পর লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলীয় লর্ড কারলাইল সেই দায়িত্ব নিয়ে এবারের সেমিনারের আয়োজন করেন।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই সেমিনারে যোগ দেওয়ার জন্য লন্ডনে এলেও আগের দিন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি সেমিনারে অংশ নেননি।

Related posts