November 15, 2018

তুমি থাক খালে-বিলে আমি থাকি ডালে, তোমার আমার দেখা হবে মরনের কালে

এম লুৎফর রহমান, নরসিংদী প্রতিনিধিঃ
‘তুমি থাক খালে-বিলে/আমি থাকি ডালে/তোমার আমার দেখা হবে/মরনের কালে।’ উপর্যুক্ত পংতিগুলো টাকি মাছের পোনার ঝাক আর লেবু সম্পর্কিত কল্পকথা নিয়ে রচিত একটি শ্লোক। দেহাতী ভাষায় যাকে বলে শিলুক বা শিল্লুক। এই শ্লোক বা শিল্লুকটি কল্পকথা নিয়ে রচিত হলেও এর মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে বাঙালীর ভোজন সংস্কৃতির এক বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতাটি হচ্ছে বাঙালীরা টাকি মাছের পোনা রান্না করে লেবুর রস দিয়ে খাওয়ার পুরনো সংস্কৃতি। হাজার নদীর এই বাংলাদেশের মাছের প্রাযুর্যের মধ্যে টাকি একটি জনপ্রিয় মাছ। খাল-বিল, পুকুর, ডোবা-নালা, খানা-খন্দরের মত বদ্ধ জলাশয়ের টাকি মাছেরা বসবাস করে। টাকি এক প্রকার শক্ত প্রাণের জিয়ল মাছ বিধায় এর প্রাকৃতিক উৎপাদনের হারও বেশী।

স্বল্প পানিতেই এরা জীবন ধারণ ও বংশ বিস্তার করতে পারে। আর তাই ছোট খাট খানা-খন্দরে অন্য যেকোন মাছের চেয়ে টাকি মাছের সংখ্যা অনেক বেশী থাকে। সংখ্যায় বেশী বলে এরা ধরা পড়েও বেশী হারে। প্রতি বছর বর্ষা হলেই টাকি মাছদের প্রজনন শুরু হয়। শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে এরা বদ্ধ জলাশয়ের কিনারে ডিম পাড়ে। এসব ডিম ফুটে জন্ম নেয় হাজার হাজার পোনা। এরা ঝাক বেধে একত্রে জলাশয়ের কিনারে কিনারে ঘুরে বেড়ায়। সাথে পাহাড়া দেয় মা ও বাবা টাকিরা। পোনাগুলা এক দেড় ইি লম্বা হলে খুবই দৃষ্টিন্দন রুপ ধারণ করে। জলাশয়ের স্বচ্ছ পানিতে সোনালী ও কাঁচরা রঙ্গের পোনাদের খেলা সকলের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। হাজার হাজার পোনা যখন শ্বাস নেয়ার জন্য পানির উপরে ভেসে উঠে তখন মনে হয় পানির নিচ থেকে যেন চিড়ি চিড়ি স্বর্ণ খন্ড ভেসে উঠছে।

মানুষ এসব টাকি মাছের পোনার ঝাঁক দেখলে নিষ্পলক নেত্রে তাকিয়ে থাকে। ডুবে যায় পানি ও পোনাদের কল্পনগরে। গ্রামের মানুষ ঠেলা জাল, মশারী, গামছা, লুঙ্গী এমনকি মহিলারা আঁচলে ছেকেও এসব পোনার ঝাঁক ধরতে পারে। গ্রামের ছেলেরা প্রতিদিন খাল-বিল, পুকুর, ডোবা-নালা থেকে ঝাকে ঝাকে এসব পোনা ধরে আনলে গ্রাম্য বধুরা লবন দিয়ে ধুয়ে নেয়। এরপর তারা পেয়াজ, রশুন, কাঁচা মরিচ কুচি দিয়ে শুকনো বুনা করে রান্না করে। এরপর খাবার সময় গাছ থেকে লেবু পেড়ে রস মিশিয়ে পোনা মাছের স্বাদ গ্রহণ করে। এসব পোনার ঝাঁক ধরার সময় দেখা যায় খালের পাড়ে, বিলের ধারে, কিংবা পুকুরের কোনে লেবু গাছের ঝুলন্ত ডালের নিচে টাকি মাছের ঝাক খেলা করছে। উপরেই ডালে ডালে ঝুলে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ বন্য লেবু।

এ দৃশ্য দেখেই গ্রাম্য পন্ডিতরা লেবুর কল্প কথা দিয়ে রচনা করেছেন সেই ঐতিহাসিক শ্লোকগাঁথা- ‘তুমি থাক খালে-বিলে/আমি থাকি ডালে/তোমার আমার দেখা হবে/মরনের কালে।’ এই শ্লোকটি শুধু একটি শ্লোকই নয় এর মধ্যে বিধৃত রয়েছে আবহমান বাংলার সেই চিরায়ত রুপ। বাঙালীর মাছের উৎস সেই খাল, বিল, পুকুর, ডোবা-নালা, খানা-খন্দর, রয়েছে বন্য লেবু গাছে ঝুপড়ির দৃশ্যের কথা। যা আজ ইট-পাথরের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। আজ আর এই সেই খাল-বিল দেখা যায় না। দেখা যায়না ডোবা নালা, খানা খন্দর। যেখানে ১২ মাস প্রাকৃতিক মাছ পাওয়া যেতো। যেখানে পাওয়া যেতো ঝাঁকে ঝাঁকে টাকি মাছের পোনা। যে ঝাঁকে ঝাঁকে পোনা ধরে খাবার পরও টাকি মাছের কোন কমতি ছিলো না।

বর্ষা শেষ হলে ডোবা-নালা, খানা-খন্দরগুলোতে পাওয়া যেতো প্রচুর সংখ্যক টাকি মাছ। যে টাকি দিয়ে বাঙালীরা যুগযুগ ধরে ভর্তা বানিয়ে খেতো। লাকড়ির চূলায় টাকি মাছ পোড়া দিয়ে শুকনো মরিচ টালা দিয়ে পেয়াজ কুচি ও আদা কুচি দিয়ে ভর্তা বানিয়ে খেতো বাঙালীরা। শীত মৌসুমে টাকি মাছ দিয়ে লাউ রান্না করে খেতো। মা-চাচীরা বলতেন, টাকি মাছে শুকনো বুনা একবার খেলে নাকি বার বার আঙ্গুল চুষতে হতো। আজ এসব শুধু কল্পকথাই পরিনত হতে চলছে। বাঙালী হারাতে বসেছে এর যুগযুগের মাছ খাবার সংস্কৃতি।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts