November 18, 2018

তীব্র শীতে উত্তরবঙ্গে দরিদ্র ও অসহায়দের কষ্ট বেড়েছে

ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতে এভাবেই কাহিল হয়ে পড়েছে মানুষ

স্টাফ রিপোর্টারঃ   গত কয়েকদিন ধরে অব্যাহত ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতে কাহিল হয়ে পড়েছে রংপুর বিভাগের দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষজন। সেই সাথে দু’দিন ধরে দেখা মিলছে না সূর্যের। প্রচণ্ড শীতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না পাওয়ায় তাদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ আরও চরমে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অব্যাহত ঘন কুয়াশাপাত ও কনকনে শীতে এবং সূর্যের দেখা না মেলায় হাড় কাঁপানো শীতে মানুষের পাশাপাশি কাবু হয়ে পড়েছে গবাদিপশু ও পাখি। সন্ধ্যার পর পরই কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ জনপদ। শীতজনিত রোগবালাইও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। কনকনে ঠাণ্ডায় ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসনালীর প্রদাহ ও সর্দি-জ্বরসহ শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শীতজনিত রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এদের অধিকাংশ শিশু ও বৃদ্ধ। হাড় কাঁপানো শীতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে শিশু-বৃদ্ধরাই। গতকাল রবিবার রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডেই বিভিন্ন শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ২০ জন শিশু।

রংপুর আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, গতকাল রংপুরে দিনভর সূর্যের দেখা মেলেনি। আকাশ ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন। রংপুরে গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৬ দশমিক ৬ এবং শনিবার ১৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। গত ৩ দিন ধরে রংপুর বিভাগে চলছে সূর্যের লুকোচুরি। গতকাল রবিবার সকাল থেকে সারাদিন আকাশ ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন সেসাথে হিমেল হাওয়ায় কনকনে শীত। সূর্যের দেখা মেলেনি। বিরূপ আবহাওয়ায় জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দুপুরের দিকে রংপুর মহানগরীতে মানুষজন দেখা গেলেও বিকেল থেকে রাস্তা-ঘাট ছিল প্রায় মানুষশূন্য। দিনভর হাত-মুখ ঢেকে মানুষজনকে চলাচল করতে হচ্ছে। সামান্য এক টুকরো গরম কাপড়ে বেঁচে থাকা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল ও চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। রংপুর বিভাগের ৮ জেলার দরিদ্র শীতার্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখের ওপর। এসব শীতার্ত মানুষের পাশে এখন পর্যন্ত সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসেনি। এদিকে শীতের জন্য নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষগুলোর কর্মের অভাব দেখা দিয়েছে। খেটে খাওয়া মানুষরা নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে না পেরে বেকায়দায় রয়েছে। ঘন কুয়াশা ও কনকনে শীতের কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম কমে গেছে। গৃহপালিত পশু-পাখিকে ঠাণ্ডার হাত থেকে রক্ষায় নানা চেষ্টা করছে গৃহস্থরা। গোয়ালঘরে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। খড়ের বিছানাও পেতে দিয়ে পশু-পাখিকে রক্ষা করা হচ্ছে।

রংপুর মহানগরীর ছালেক মার্কেট, জামাল মার্কেট, সুপার মার্কেটসহ পুরাতন কাপড়ের মার্কেট, সুরভী উদ্যানের সামনের মার্কেট, স্টেশন মার্কেট এবং নগরীর মোড়ে মোড়ে অবস্থিত গরম কাপড়ের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। গবাদিপশুর মাঝে কোল্ড ডায়রিয়া ও রোটা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। ঘন কুয়াশাপাতে রংপুর অঞ্চলের আলুচাষিরা মৌসুমের শুরুতেই ছত্রাকজনিত আরর্লি ব্লাইট ভাইরাস আক্রমণে আলু ক্ষেতে পচন ধরার ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। তীব্র ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে নগ্ন পায়ে কাদামাটিতে কাজ করতে গিয়ে চাষিরা ঠাণ্ডায় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের কারণে ঠাকুরগাঁওয়ে ইরি-বোরোর বীজতলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষকরা পলিথিন ঢাকনা দিয়ে বীজতলা তৈরি করছে। কম সময়ে স্বাস্থ্যবান ও ভালো চারা পাওয়ায় ইতোমধ্যে এ পদ্ধতিটি চাষিদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে এ জেলায় যেসব বীজতলা তৈরি করা হয়েছে তার অর্ধেকই পলিথিন দিয়ে ঢাকা। সদর উপজেলা আকচাঁ এলাকার কৃষক রমজান আলী জানান, গত ৩ বছর ধরে পলিথিন দিয়ে বীজতলা তৈরি করা হচ্ছে। তাই বীজতলা রক্ষার জন্য পলিথিন ব্যবহার করা হচ্ছে।

রংপুরের বদরগঞ্জে হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করেছে। অগ্রহায়ণ মাসের শুরু থেকে ঠাণ্ডা শুরু হলেও গত শনিবার থেকে হঠাত্ যেন শীত জেঁকে বসেছে। হিমেল বাতাসে জবুথবু অবস্থায় মানুষজনকে রাস্তায় চলাচল করতে দেখা গেছে। কনকনে ঠাণ্ডায় কাহিল হয়ে পড়েছে বৃদ্ধ ও শিশুরা। ঘন কুয়াশার কারণে সড়কে দিনের বেলা যানবাহন হেড লাইট জ্বালিয়ে অতি সাবধানে চলাচল করছে। এদিকে গরম কাপড়ের খোঁজে ফুটপাতের দোকানগুলোতে ভিড় ছিল লক্ষ্য করার মত। শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে শিশু ও বয়স্ক লোকেরা। হাসপাতালে ভিড় বেড়েছে শিশু ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানি রোগীদের। গতকাল রবিবার বদরগঞ্জ পৌরশহরের বিভিন্ন ফুটপাত ও বাজার ঘুরে চোখে পড়ে শীতের কাপড় বিক্রির চিত্র। গরম কাপড়ের দোকানপাটসহ ফুটপাতে ছিল উপচেপড়া ভিড়। ফুটপাতের দোকানগুলোতে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের ভিড় লক্ষণীয়। বদরগঞ্জ পৌরশহরের পুরাতন বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী আব্দুর রউফ সরকার বলেন, হঠাত্ শীত জেঁকে বসায় গরম কাপড়ের চাহিদা বেড়েছে। বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোখলেছার রহমান জানান, গতকাল পর্যন্ত উপজেলা হাসপাতালে ঠাণ্ডাজনিত রোগে আটজন শিশু ভর্তি হয়েছে।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts