November 18, 2018

তিস্তার নিদারুণ ভাঙ্গনে গ্রাম,স্কুল,ব্রীজ,বিলিন<<হুমকির মুখে-বিজিবি ক্যাম্পও


মহিনুল ইসলাম সুজন,
নীলফামারী প্রতিনিধিঃ
দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা নদীর বেস্টিত এলাকায় বন্যা পরবর্তী নতুন করে নিদারুণ ভাঙ্গনে ভয়ানক আকার ধারন করেছে।ইতিপুর্বেই নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তা নদী বেষ্টিত টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়ন সর্বনাশী তিস্তার গতিপথ পরিবর্তন হয়ে অব্যাহত নিদারুন ভাঙ্গনে ইউনিয়নটির- ৪টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১টি উচ্চ বিদ্যালয়, ১টি শিশু কিন্টার গার্ডেন, ২টি কমিউনিটি ক্লিনিক, বিজিবি ক্যাম্প, একতা বাজার, ১০টি গ্রামের প্রায় ৫শত পরিবারের বসত ভিটাসহ রাস্তাঘাট, ব্রীজ, কালভার্ট, আবাদী জমি তিস্তার নিদারুন ভাঙ্গনের কবলে পরে ধ্বংস হতে চলেছে।

শুক্রবার বিকালে তিস্তার নিদারুণ ভাঙ্গনে  ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের মধ্যচরখড়িবাড়ির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নদীতে ভেঙ্গে পড়েছে। টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ী গ্রামের টাপুর চর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, টেপাখড়িবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয় ও ওই গ্রামের ত্রানের ৩৯ ফিট একটি ব্রীজ উদ্বোধনের আগেই বন্যার কবলে পরে পুরোটাই ভেঙ্গে গেছে। এছাড়া বিএডিসি চরখড়িবাড়ী এলাকায় নির্মিত ১৭ ফিট ১টি ব্রীজ, জিঞ্জির পাড়ায় এলজিইডি নির্মিত ৭০ ফিট ১টি ব্রীজ ও পূর্বখড়িবাড়ী এলাকায় এডিপি নির্মিত ১০ফিট একটি ব্রীজসহ ১০টি গ্রামের ৫শ পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে  বিলীন হয়ে গেছে।

গত কয়েকদিনের টানা বর্ষন ও উজানের ঢলে তিস্তার পানি বিপদ সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও সপ্তাহক্ষানিক থেকে তিস্তানদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
আর হটাৎ পানি বিপদসীমার নিচে নেমে আসার পরেই এখানে ভয়াবহ ভাঙ্গনের দেখা দিয়েছে।এ ছাড়াও পানিবন্দী হয়ে হুমকির মুখে পড়েছে বিজিবি ক্যাম্প,বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক, একাধিক নির্মিত বাধসহ আরও অনেক,বিদ্যালয়,রাস্তাঘাট,ব্রীজ,গ্রাম,স্হানীয় বাজারসহ শত শত অসহায় পরিবার।এলাকার মানুষেরা স্বেচ্ছাশ্রমে বালির বস্তা, বাঁশ,কাঠ, ও গাছের পাইলিং করে ভাঙ্গনের কবল থেকে ওই সব হুমকির মুখে পড়া এলাকা রক্ষা করার জোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

তিস্তার নিদারুণ ভাঙ্গনে ইতিমধ্যে টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের টেপাখড়িবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়টির একটি ভবন ও মাঠের একাংশ নদীতে বিলিন হয়ে গেছে।

শুক্রবার বিকালে বন্যা দুর্গত এসব এলাকায় ঘুড়ে জানা গেছে, গত কয়েকদিনের  অব্যাহত ভাঙ্গনে উচ্চ বিদ্যালয়টির ৪০ ফিট ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এছাড়া দেবে যাওয়া ২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন গুলোসহ কমিউনিটি ক্লিনিক দুটি দুমরে মুচরে নদীগর্ভে বিলীন হতে চলছে।সে গুলো এমন ভাবে রয়েছে যা যে কোন মুহুর্তেই ইট ধ্বসে নদীতে পড়তে পারে।
বন্যাদুর্গত এই এলাকার একাধিক এলাকাবাসী জনান, ১৯৬২ সালে তিস্তা গতিপথ পরিবর্তন করে যে পথ দিয়ে চলছিলো। এবারের বন্যায় তিস্তার গতিপথ পরিবর্তন করে বয়ে যাচ্ছে উল্টো দিকে। যার কারনেই আমাদের সবকিছুই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে আমরা প্রায় নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি। সরকারের পক্ষ হতে জরুরী ভিত্তিতে একটি বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ দেয়া হলে এ এলাকার হাজারো মানুষ ও পরিবার রক্ষা পেত।

টেপাখড়িবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহীন জানান,আমি নিয়মিত ক্ষতিগ্রস্হ্য এলাকা গুলো প্রতিদিন ঘুরে দেখছি ও সার্বক্ষণিক তাদের খোজ খবর নিচ্ছি। ক্ষতিগ্রস্থ্য এলাকার মানুষেরা ভিষন অসহায় হয়ে পড়েছেন। তাদের বাচার জন্য জরুরী ভিত্তিতে দরকার বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের।এবারের বন্যা ও বন্যা পরবর্তি ভাঙ্গনে টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নটি ৫টি ওয়ার্ড একবারেই ধ্বংশের দিকে। নিঃস্ব হয়েছে ইউনিয়নের হাজার হাজার পরিবার। তিস্তার ভাঙ্গনের কারনে তাদের মাথা গোজার ঠাইটুকু হারিয়ে তারা বিভিন্ন নিরাপদ স্হানে আশ্রয় নিয়েছেন।আর বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রটি আটকানোয় তা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা নেয়া হয়েছে।

নতুন করে ক্ষতিগ্রস্হ্য মানুষেরা সরকারের কোন সহযোগীতা পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, ক্ষতির তালিকা তৈরী করা হচ্ছে।তা ছাড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে সার্বক্ষণিক খোজ খবর নেয়া হচ্ছে,তালিকা সম্পুর্ন করা হলেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করবেন বলে জানিয়েছেন তারা।

টেপাখড়িবাড়ী আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সরকার দলীয়(আওয়ামীলীগ)মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী  মঈনুল হক জানান, এবারের বন্যায় ও ভাঙ্গনে পুরো ইউনিয়নটির প্রায় অধিকাংশ এলাকা বিলিন হয়ে যাচ্ছে।আমি ক্ষতিগ্রস্হ্য এলাকা গুলো ঘুরে দেখেছি।এবং নিয়মিত তাদের খোজ খবর নিচ্ছি।এই এলাকার মানুষদের আকুতি তারা যত দ্রুত সম্ভব বন্যা নিয়ন্ত্রন বাধ চান। সরকারের কাছে আমরা এলাকার সকলেই একটি বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ নির্মান করবার জোর দাবী জানিয়েছি।বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধটি দ্রুত তৈরী করা হলে এই এলাকা মানুষ সর্বনাসী তিস্তার গ্রাস হতে নিশ্চিত রক্ষা পাবেন।তা ছাড়া এলাকাবাসীর স্বেচ্ছায় নির্মিত একটি বাধ নির্মান করে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডে দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও সেই বাধটি  আরো শক্তিশালী করে তা রক্ষার অনুরোধ করা হলেও ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ কোনো রকমের সহযোগীতা না করার ফলে তা আজ নদী ভাঙ্গনে বিলিন হয়ে গেছে।

শুক্রবার সাংবাদিকদের দেখে ক্ষতিগ্রস্হ্য টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করবার শর্তে অভিযোগ করে বলেন, তিস্তার গতিপথ পরিবর্তন হয়ে এবার তিস্তা নদী চরখড়িবাড়িসহ নতুন নতুন এলাকার উপড় দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।অগনিত প্রভাবশালী ব্যক্তি, নিজ স্বার্থলোভী, অসাধু পাথর ব্যবসায়ীরা খড়া মৌসুমে তিস্তানদীর চরের বুকজুড়ে রাত-দিন অবাধে পাথর উত্তোলন না করলে হয়তোবা আজ এই সব এলাকা এতবেশি ক্ষতির কবলে পড়তোনা।

পাথর ব্যবসায়ীরা অবাধে তিস্তার বুকজুড়ে পাথর উত্তোলন করে তা নিয়মিত অন্যত্রে সরিয়ে নিলেও নদীর প্রধান গতিপথে ও নদীর বুকজুড়ে অসংখ্য আকাশ ছোয়া বড় বড় বালুর পাহাড়(বালুরঢিব) রয়েই গেছেন নদীর বুকে।এবং নদীর বুকজুড়ে মাটির অনেক বড় বড় হয়েছে। যার ফলেই তিস্তানদী তার নাব্যতা হারিয়ে স্বাভাবিক ভাবে প্রবাহিত হতে না পেরেই বাধ্য হয়েছে গতিপথ পরিবর্তন করে প্রবাহিত হতেই।আর ওই সব অবৈধ পাথর উত্তোলনকারীরা এখন রাতারাতি কোটিপতি হয়ে গেলেও সর্বস্ব হারিয়ে পথের ভিখারী হয়েছেন এই ইউনিয়নের হাজারও নিরঅপরাধ,সহজ-সরল,নিরহ মানুষজন(!)

ক্ষতিগ্রস্হ্য এলাকাবাসী ক্ষোভ করে সাংবাদিকদের আরও জানান,পাথর উত্তোলনে এ এলাকার মানুষ নিজেরা এই পেশায় তুলনামুলক ভাবে কম জড়িত থাকার পরেও তারা যেনো সব সময় অবৈধ পাথর উত্তোলনকারীদের কাছেই ছিলেন অসহায় ও জিম্মি হয়েই।কেনো না উপজেলা প্রশাসনের নাকের ডগায় দীর্ঘদিন থেকে অবৈধ ভাবে পাথর উত্তোলন করা হলেও উনারা সব সময়ে থেকেছেন দর্শক ও নির্বোধের ভুমিকায় (!)

এমন কি জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্হ্য এলাকা পরিদর্শন করা হলেও প্রধান নদী পথে কিভাবে এত বড় বড় বালুর একাধিক পাহাড় তৈরী হলো তা নিয়ে এলাকাবাসীর কাছে কখনোই জানতে চাওয়াই হয়নি(!)তারা সেগুলো দেখেও না দেখবার ভান করে চলে যান।আর অবৈধ পাথর উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে গ্রামের এই সহজ সরল মানুষদের তো দুরের কথা গোটা উপজেলার কার বাবার সাধ্য আছে কথা বলবার।

এলাকার যে কেউ অভিযোগ করলেই নিশ্চিত তাকেই উল্টো কারনে-অকারনে পড়তে হবে মহা বিপদে।

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান,আমি নিজেই বন্যা দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছি। টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করা হচ্ছে। সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন, স্কুল, ক্লিনিক, বাজারসহ ক্ষতিগ্রস্হ্য সকল প্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাট, ব্রীজ, কালভার্টের তালিকা হাতে পেলেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ  গ্রহনের জন্য জেলা প্রশাসকের নিকট তা প্রেরন করা হবে।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি/১৬/০৭/২০১৬

Related posts