November 17, 2018

তিমির শরীরে পুঁজিবাদের গোড়াপত্তন

প্রাচীন কাল থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তিমি শিকার একটি ঐতিহ্যবাহী পেশা। অনেক কারণেই তিমির প্রতি ভীতিও আছে মানুষের সব মিলিয়ে এক ধরনের রহস্য। ১৭ শতকে বিশালাকার এক তিমির ধাক্কায় এসেক্স নামের একটি মার্কিন জাহাজ ডুবে গিয়েছিল। সেই ঘটনা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিখ্যাত মার্কিন ঔপনাস্যিক হারমান মেলভিক লিখেছিলেন তার আলোচিত রহস্য উপন্যাস ’মবি ডিক’। মবি ডিক নিয়ে নির্মিত হয়েছে একটি চলচিত্রও। নাম ‘ইন দ্য হার্ট অব দ্য সি’।

উপন্যাসে দেখা যায়, প্রশান্ত মহাসাগরে তিমি শিকার করতে গিয়ে একটি জাহাজ তিমির ধাক্কাতেই ডুবে যায়। পানিতে ভেসে বেঁচে থাকে জাহাজটির ২০ নাবিক। এদের মধ্যে জাহাজের ক্যাপ্টেন পোলার্ডসহ মোট তিনজন একটি দ্বীপে আশ্রয় নেয়। বাকিরা ভাঙা জাহাজে করে দক্ষিণ আমেরিকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত জীবনের যাত্রা শেষ করতে হয় তাদের। বেঁচে থাকা তিনজন ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে খেতে শুরু করেন তাদের সঙ্গীদের মৃতদেহ। এটাও শেষ হয়ে যাওয়ার পর তারা খুঁজতে থাকেন- আর কী খাওয়া যায়। অবশেষে তারা খেতে শুরু করেন তিমির মাংস। ওই ঘটনা নিয়েই মবি ডিক উপন্যাসটি লিখেছিলেন হারমান মেলভিল।

তবে তিমির মাংস খাওয়াটা যত সহজ, তিমি শিকার ততটাই কঠিন। স্রেফ মাংস খাওয়ার উদ্দেশ্যে কেউ তিমি শিকারের মতো বিপজ্জনক কাজে যেতে চাইবেন না। যে কারণে কেউ তিমি শিকারের প্রতি ঝুঁকতে পারেন তা হলো- ব্যবসা, বড় ধরনের লাভ।

১৯ শতকে তিমি নিয়ে এমনই এক ব্যবসা শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের নিউ বেডফোর্ড বন্দরের প্রতিষ্ঠান গিডেওন অ্যালেন অ্যান্ড সন্স। বিভিন্ন দেশে তিমি রপ্তানি করতো তারা। ব্যবসা শুরুর বছরটিতে ভালো লাভও করেছিল গিডেওন অ্যালেন অ্যান্ড সন্স। এটা দেশটির ব্যবসার ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ওই বছর ৬০ শতাংশ লাভ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। ১৮১৭ থেকে ১৮৯২ সালের মধ্যে কোম্পানিটির গড় লাভের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪ শতাংশ।

তবে তিমির ব্যবসার জন্য নিউ বেডফোর্ড একমাত্র প্রতিষ্ঠান কিংবা যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র দেশ না হলেও ১৮৫৯ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৮৫০ সালে বিশ্বব্যাপী তিমির মোট ৯০০টি চালানের মধ্যে ৭০০টিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। এর মধ্যে আবার ৭০ ভাগই হয়েছে নিউ বেডফোর্ড থেকে।

তিমি ব্যবসার পেছনে তাদের এ একক আধিপত্যের পেছনে রয়েছে এক রহস্য। এক ব্যতিক্রম প্রযুক্তি। তারা নতুন কোনো জাহাজ আবিষ্কার করেনি; কিংবা তিমি অনুসন্ধানে ব্যবহার করেনি কোনো নতুন পদ্ধতি। তারা যা করেছে তা হলো, তারা ব্যবসার নতুন এক মডেল তৈরি করেছে। ব্যবসায় বড় ধরনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তারা বিনিয়োগ চালিয়ে গেছে এবং কাজে দক্ষ শ্রমিক নিয়োগ দিয়েছে।

এক সময় তিমি শিল্প প্রায় ধ্বংস হতে বসেছিল। তিমি মাছের তেলের স্থান যখন খনিজ তেল দখল করে নিল তখনই এ শুরু হয়েছিল সংকট।তবে তাদের ব্যবসায়ের নতুন ধরনের কারণে টিকে গিয়েছিল নিউ বেডফোর্ডের তিমির বাণিজ্য। বেশিরভাগ ইতিহাসবিদের মতে, তারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো রাষ্ট্রীয় সহায়তায় একচেটিয়া ব্যবসা শুরু করেনি। কিংবা শেয়ার বাজারে শেয়ার বিক্রির ওপরও নির্ভর করেনি। তারা সম্পূর্ণ নতুন এক পন্থা অবলম্বন করেছে।

এ পদ্ধতিতে রাষ্ট্রের কোনো সহায়তা ছিল না। ব্যবসায়ের ব্যবস্থাপকরাই সব ধরনের ঝুঁকি বহন করতো। এতে তারা লাভের প্রতি বেশি মনোযোগী হয় এবং বাণিজ্যের জন্য এক ধরনের সিন্ডিকেট গঠন করে। সাগর পথে নাবিকদের মজুরি পরিশোধ করা হতো লভ্যাংশ থেকে। এতে ব্যবসার সফলতার জন্য তারাও সচেষ্ট থাকতো। অর্থাৎ, রাষ্ট্র নির্ভরতার পরিবর্তে তারা সম্পূর্ণ ব্যক্তি নির্ভরতা কেন্দ্রিক এক ধরনের ব্যবসা গড়ে তুলেছিল।

১৮৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ছয়টি অঙ্গরাজ্য তিমির ব্যবসার জন্য জনগণের কাছে শেয়ার বেচাকেনার ভিত্তিতে ছয়টি করপোরেশন গড়ে তুলেছিল।

তবে ১৮৪০ সালের পর এগুলো আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, বিক্ষিপ্ত মালিকান এবং ব্যবসায়ে ব্যবস্থাপকদের ঝুঁকি না থাকায় ওইসব করপোরশেন ধ্বংস হয়েছে। যেহেতু ব্যবসার লাভক্ষতির সাথে ব্যবস্থাপকদের কোনো সম্পর্ক ছিল না, তাই তারা ব্যবসায়ে পূর্ণ মনোযোগী ছিল না।

তবে এক্ষেত্রে নিউ বেডফোর্ডের পদ্ধতি ছিল খুবই কার্যকর। তারা তাদের এ পদ্ধতির কারণেই লাভজনক বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পেরেছে বর্তমানে তিমি শিকার আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ। তবে নিউ বেডফোর্ডের ব্যবসায়িক ধারণাটিকে কাজে লাগিয়ে এখনো চলছে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্য। তাদের এ ব্যবসায়িক ধারণাটিকে এক কথায় বলা যায়, ‘উচ্চ ঝুঁকি, বিরাট মুনাফা’।বা.মে.

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts