November 15, 2018

তিনি তেরেসা হয়েই থাকতে চান


ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কঃ  প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পর ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করছেন তেরেসা মেবিতর্কে জড়াতে পছন্দ করেন তেরেসা মে। সমালোচনা তাকে টলায় না, বিচলিত করে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে একাধিকবার তিনি বিতর্কে জড়িয়েছেন। যার দৃষ্টিভঙ্গিতে রয়েছে বৃটিশ রক্ষণশীল রাজনীতির ঐতিহ্য। সরকারের অনেক সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তিনি অবস্থান নিয়েছেন। জনকল্যাণমুখী সুবিধা কমানো, স্নাতক স্তরের টিউশন ফি বাড়ানোর কথা বলে বিস্তর সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। ইরাক-আফগানিস্তানে সেনা পাঠানোর ব্যাপারেও তার অবস্থান ছিল ভিন্ন। হাউস অব কমন্সে স্টাফ কমানো, পুলিশ ও ক্রাইম কমিশনের ক্ষেত্রে নির্বাচন প্রথা চালু করার পক্ষে তার মত নিয়ে বিতর্ক হয়েছে অনেকদিন। সমকামী বিয়ের পক্ষে অবস্থান তেরেসার। অবৈধ অভিবাসীদের দেশে ফেরাতে লন্ডনের রাস্তায় গো হোম ভ্যান নামিয়েছিলেন তিনি। এ নিয়ে দল-মত নির্বিশেষে সবাই সমালোচনামুখর হয়েছিলেন। এমনকি সেই নাইজেল ফারাজও। অভিবাসীদের তাড়ানোই ছিল তার রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য। ৫৯ বছর বয়স্ক তেরেসা মে কাউকে ছেড়ে কথা বলেন না।

দু’বছর আগে পুলিশের একটি অনুষ্ঠানে পুলিশের বিরুদ্ধে এমন এক বক্তৃতা করেন, যা নিয়ে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়। তবে তিনি রাজনীতির চাল ভালো বুঝেন। ক্যামেরন ও জর্জ অসবর্ণের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে নিজেকে কৌশলে দূরে রাখেন। তেরেসা মে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে ব্রেক্সিট নেতা বরিস জনসনকে যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন তখন সবাই হতবাক। বৃটিশ মিডিয়াও এই সিদ্ধান্তকে চমকপ্রদ বলে বর্ণনা করছে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াই এসেছে এ সিদ্ধান্তে। ইউরোপীয় নেতারা এটা পছন্দ করেননি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। ওবামা প্রশাসন যদিও বলেছে, তার সঙ্গে কাজ করতে কোনো অসুবিধা নেই। পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র মার্ক টোনার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কথা টেনে বলেছেন, বরিস জনসনের সঙ্গে কাজ করতে তারা আগ্রহী। আইটিভি বলেছে, পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে যাই বলা হোক না কেন, বরিসকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অস্বস্তি ঠিকই রয়েছে। এর কারণটাও অনুমেয়। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে কটাক্ষ করে বরিসের লেখা এক নিবন্ধে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্র টিমের সদস্যরা।

ওই নিবন্ধে বারাক ওবামাকে অসংলগ্ন, সঙ্গতিহীন এবং পুরোদস্তুর ভণ্ডামিপূর্ণ একজন আংশিক কেনিয়ান প্রেসিডেন্ট হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। ওবামা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে আইটিভি বলেছে, ব্রেক্সিট যুক্তরাষ্ট্রে বৃটেনের অবস্থান খর্ব করেছে। এখন থেকে ইইউতে মার্কিন নীতি নিয়ে শীর্ষ ভূমিকা পালন করবে জার্মানি। ট্রাম্পকে নিয়েও কটাক্ষ করেছিলেন বরিস জনসন। বলেছিলেন, শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের ঝুঁকি এড়াতে তিনি নিউ ইয়র্কের অনেক স্থানেই যাবেন না। বরিস জনসনকে গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর করে এক ধরনের জুয়া খেলেছেন তেরেসা মে। নয়া এই বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী প্রথা ভাঙতে পছন্দ করেন। জুতো আর বেনকোটে তার জুড়ি নেই, বরাবরই যা মিডিয়া আকর্ষণ করে। ৮০’র দশকে লন্ডন বরোর মেরটন কাউন্সিলে তার প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে। পার্লামেন্টে প্রবেশ করেন ’৯৭ সনে। তার সমালোচকরা এখনই বলাবলি করছেন, তিনি কি মার্গারেট থ্যাচার হবেন না অ্যাঙ্গেলা মারকেল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, অ্যাঙ্গেলা মারকেলই প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান যিনি তেরেসাকে অভিনন্দন জানান। মার্গারেট থ্যাচার বিশ্বরাজনীতিতে লৌহ মানবী হিসেবেই খ্যাতি পেয়েছিলেন। তেরেসা মে কি তার পথ ধরবেন।

নাকি ১০ বছর শাসন করা উদারপন্থি জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মারকেলের পথেই যাবেন। এ মুহূর্তে এটা বলা যাবে না। সময়ই বলে দেবে। ইউরোপ থেকে বেরিয়ে আসার বিপক্ষে তেরেসার অবস্থান থাকলেও অভিবাসীদের ব্যাপারে তার অবস্থান সুবিদিত। তেরেসার নতুন জার্নি কেমন হবে? কঠিন, নানা চ্যালেঞ্জ সামনে। ইউরোপ থেকে বেরিয়ে আসা প্রথম চ্যালেঞ্জ। কাজটা খুবই জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি। হুট করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। যদিও তিনি প্রথম ছয়জনের মধ্যে ব্রেক্সিট মন্ত্রী করেছেন ডেভিড ডেভিসকে। রাজনীতিতে চরম এক অস্থিরতা। বৃটিশ কারেন্সিতে কিছুটা চাঙ্গা ভাব। অর্থনীতিবিদরা বলছেন এটা সাময়িক। ব্রেক্সিট পরবর্তী যে ধাক্কা লেগেছিল তা কাটাতে আরো সময় লাগবে। নিজের দলের মধ্যেও অনৈক্যের সুর। মাইকেল গোভ কী করবেন এটা স্পষ্ট নয়। তবে লেবার পার্টির টালমাটাল অবস্থা তাকে সাহায্য করছে অনেক। লিবারেল ডেমোক্রেটরা নতুন নির্বাচনের দাবি তুলেছে। লেবার পার্টি নিজেদের ঘর সামলাতেই ব্যস্ত। অবৈধ অভিবাসীদের ব্যাপারে তেরেসার অবস্থান সবার জানা। তাই একধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে তাদের মধ্যে। বিশেষকরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আসা অভিবাসীদের মধ্যে। ভিন্নমত তিনি পছন্দ করেন।

তবে নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। যা বুঝেন, তাই করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে এর প্রমাণ রেখেছেন বারবার। কোনো সিদ্ধান্তই নেন না হুট করে। ফ্যাশনপ্রিয় তেরেসা শত্রু যেমন তৈরি করতে জানেন, তেমনি ভালোবাসা দিয়ে জয় করতেও জানেন। প্রথম বক্তৃতায় বৃটেনকে এক করতে বলেছেন। ব্রেক্সিটের কারণে বৃটেন কার্যত দ্বিধা-বিভক্ত। স্কটল্যান্ড তার গলার কাঁটা হতে পারে। স্কটল্যান্ড বিষয়ে দ্বিতীয় গণভোটের দাবি জোরালো হচ্ছে। যদিও তেরেসা ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস আর উত্তর আয়ারল্যান্ডকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ বৃটেনের কথাই বলেছেন। অপেক্ষার পালা। কেমন হয় তেরেসা মে’র শাসন। অস্থির সময়ের এই প্রধানমন্ত্রী নতুন এক বৃটেন উপহার দিতে পারবেন কি?

শেষ কথাঃ তেরেসা মে’র এক সহকর্মী বলেছেন, তিনি থ্যাচার হতে চান না। অ্যাঙ্গেলা মারকেলও নন। তিনি তেরেসা হয়েই থাকতে চান।মানব জমিন

Related posts