December 10, 2018

তাহলে ইমরান হবেন, মাশরাফি?

স্পোর্টস ডেস্কঃ টেনিসের দলগত খেলায় ‘নন প্লেয়িং ক্যাপ্টেন’ বলে একটা চরিত্র আছে; তিনি কোর্টেই নামেন না। ফলে মাশরাফিকে টেনিসের সেই নন প্লেয়িং ক্যাপ্টেন বলা যাচ্ছে না। মাশরাফিকে কী তাহলে ‘মাইক ব্রিয়ারলি’ বলা যায়? ক্রিকেটেই মাইক ব্রিয়ারলি নামে ভূবন কাপানো একজন ইংলিশ অধিনায়ক ছিলেন; অধিনায়কত্বের জোরেই যিনি টেস্ট খেলতেন। কিন্তু, ব্রিয়ারলি ব্যাটিংটা অন্তত করতেন; খারাপ হলেও করতেন। মাশরাফিকে সেটাও করতে হচ্ছে না। তাই তাকে মাইক ব্রিয়ারলিও বলা যাচ্ছে না। তাহলে তার ভূমিকাটা কী? মাশরাফি বিব্রত হবেন ভেবে কয়েকবার করে হাত তুলেও প্রশ্নটা করতে পারছিলাম না। শেষ অবদি প্রশ্নটা করেই ফেললাম, ‘ক্রিকেটের অদৃষ্টপূর্ব এই ভূমিকা নিজে কী উপভোগ করছেন? নিজেকে কী ভাবছেন?’ কিসের বিব্রত! মাশরাফি কী বিব্রত হওয়ার লোক নাকি? তিনি খুব একটা দুষ্টুমি করার ভঙ্গিতে মাইক্রোফোনটা একটু সামনে টেনে ফিস ফিস করার মতো ভঙ্গি করে বললেন, ‘মালিকরা ভাবে, আমি ব্যাটসম্যান।’ এবার উল্টো আমি একটু পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে বললাম, ‘আমরাও তো তাই মনে করি।’

দুষ্টুমিতে একবার পেয়ে বসলে মাশরাফিকে সামলানো দায়। বিরাট একটা ভাব নিয়ে, চোখ-মুখ পাকিয়ে বললেন, ‘তাহলে প্রশ্ন করলেন কেন! আমি তো ব্যাটসম্যান…’ মাশরাফিকে ব্যাটসম্যান হিসেবে রাহুল দ্রাবিড় মেনে নিয়েছিলেন; আমি দেবব্রত কোথাকার এক তুচ্ছ মানব; আমার না মেনে উপায় আছে! ২০০৭-০৮ সালে এই মাশরাফির মতো একটা অলরাউন্ডার না থাকায় দ্রাবিড় আফসোস করেছিলেন। টানা দুই টেস্টে ফিফটি করে আফসোসটা বাড়িয়েছিলেন। এই সেদিনই টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে নিজের প্রথম ফিফটিটা করলেন। ফলে মাশরাফির ব্যাটসম্যানশিপ নিয়ে ইদানিং আলোচনাটা ফিরে ফিরে আসছে। ইদানিং ফিরে আসছে, বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে মাশরাফির ব্যাটিংটা নতুন করে প্রাণ পাচ্ছে; এমন ইঙ্গিত পাওয়ায়। আমি অবশ্য কয়েক মাস আগে নতুন করে মাশরাফির ব্যাটিং নিয়ে এক আলোচনা, বলা চলে ধাক্কার মুখোমুখি হয়েছিলাম।

মাশরাফি বিষয়ক বইয়ের জন্য সাক্ষাতকার নিতে গিয়ে সাকিব আল হাসানকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ক্রিকেটার মাশরাফি কতো বড়? সাকিব চোখ-টোখ পাকিয়ে বলেছিলেন, ‘মানে!’ ‘মানে, মাশরাফি তো একটা হাইপ। আসলে কী ক্রিকেটার মাশরাফি অতো বড় কিছু?’ সাকিব আমার দিকে অবিশ্বাসীর মতো চেয়ে থেকে একটু দম নিয়ে বলেছিলেন, ‘এই কথার কী উত্তর দেবো! বোলার কৌশিক ভাইয়ের কথা বাদ দেন। ব্যাটসম্যান মাশরাফির কথা ভাবেন শুধু। বাংলাদেশের হয়ে কতো রান করেছেন উনি? হাজার দেড়েক। এই দেড় হাজার রান দিয়ে উনি বাংলাদেশকে যে কয়টা ম্যাচ জিতিয়েছেন, তা আমরা তিন-চার হাজার রান করে করতে পারিনি। ওনার ১৫ রান মানেই ম্যাচে আমরা এগিয়ে গেলাম। শোনেন, একটা কথা বলি। কৌশিক ভাই নিজেকে নিয়ে খামখেয়ালী না করলে সে থাকতো বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার।

কৌশিক ভাই কতো বড় অলরাউন্ডার হতে পারতেন, উনি নিজেও জানে না।’ আচ্ছা, মাশরাফি কী পারেন না, নতুন করে সেই আফসোসটা মিটিয়ে দিতে? যেদি ভুল বুঝে না থাকি, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে বিশ্বকাপের ঠিক আগে আগে থেকে মাশরাফির ব্যাটিংয়ে আবার পুরোনো ঝলকটা দেখা যাচ্ছে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে পরপর দুটো ম্যাচে যে দুটো ফিফটি করেছেন এ বছর, তা দেখে অনেকেই পুরোনো আফসোস আরও বাড়িয়েছেন। আর্ন্তজাতিক ক্রিকেটে বিরাট কোনো স্কোর করতে পারেননি। তবে চোখে পড়ার মতো ব্যাপার হয়েছে, ব্যাট চালানোর ভঙ্গিতে ফিরে এসেছে ২০০৭-০৮ সালের আত্মবিশ্বাস। মাঝে কয়েকটা বছর ব্যাটিংয়ে মাশরাফির প্রধাণ সমস্যা ছিলো, পেস বল সামলানো। স্পিনটা যাও বা খেলতে পারছিলেন, পেস বোলিং এলেই যাচ্ছেতাই শট করতেন। ইদানিং সেই মাশরাফিই ফাস্ট বোলারকে অনেক সময় নিয়ে গ্লাইড করছেন, কাট করছেন, আবার মাথার ওপর দিয়ে তুলে মারছেন। তাহলে মাশরাফি কী ইমরান খান হয়ে উঠতে পারেন?

ইমরানের ক্যারিয়ারের একেবারে শেষ লগ্নটা একটু মনে করে দেখা যেতে পারে। ইতিহাসের অন্যতম তুখোড় এই ব্যাটসম্যান সারাটা জীবন পাচ-ছয়, এমনকি সাত-আটেও ব্যাট করেছেন। কিন্তু ১৯৯২ বিশ্বকাপের প্রাক্কালে এসে ইনজুরির কারণে টের পাচ্ছিলেন, বোলিংটা সেভাবে তাকে সাপোর্ট করছে না। কার্যত ওয়াসিমরা সে প্রয়োজনও টের পেতে দিচ্ছিলেন না। ফলে ইমরান নিজেকে তিন নম্বরে নিয়ে এলেন। ফল হিসেবে অন্তত ফাইনালের সেই সত্তরোধ্র্ব রানের ইনিংসটা ভোলার নয়। মাশরাফির ক্ষেত্রেও সমস্যাটা ইনজুরি। এমনিতে এখনও দলের অন্যতম সেরা বোলার। মুস্তাফিজদের মারমার কাটকাট পারফরম্যান্সের মধ্যেও ২০১৫ সালে বাংলাদেশের তৃতীয় সেরা বোলারটির নাম মাশরাফি বিন মুর্তজা। তারপরও বোলার মাশরাফির শরীর এখন বিশ্রাম চায়। অন্যদিকে তাকে বল করতেই হবে, এমন খুব দায় প্রতি ম্যাচে থাকে না। সে ক্ষেত্রে মাশরাফির ব্যাটিংয়ের আরেকটু ঝলক কী আমরা আশা করতে পারি? ইমরানের মতো তিন নম্বরে না হোক,

বহুকাল ধরে হাহাকার হয়ে থাকা সাত নম্বরে একজন পেস বোলিং অলরাউন্ডারকে কী ফেরত পেতে পারি? মাশরাফি এর মাঝে প্রশ্নটা শুনে ঠোট একটু বাঁকিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এখন নতুন ভাবনা! আই অ্যাম থার্টি টু, ম্যান।’ তো! তো কী হয়েছে? থার্টি টুতে অ্যাডাম ভোজেস ক্যারিয়ার শুরু করেছে। থার্টি সিক্সে আমি নতুন করে পড়াশুনা শুরু করছি। হোয়াই নট ব্যাটসম্যান মাশরাফি। লাইফ বিগানস অ্যাট ফরটি; আপনার এখনও আট বছর বাকী আছে শুরু করার জন্য।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts