September 21, 2018

তাজউদ্দীনের পদত্যাগ, এ কেমন খেলা

ঢাকাঃ  গুজব ছিল ক’দিন থেকেই। রাজনৈতিক ময়দান থেকে সচিবালয়ে। এরপর প্রেস ক্লাবের টেবিলে। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে অপসারণ করা হচ্ছে। তিনি তখন অর্থমন্ত্রী। ন’মাস মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া মানুষটির পদত্যাগ বা অপসারণের গুজব চাঞ্চল্যই সৃষ্টি করেছিল। ২৬শে অক্টোবর ১৯৭৪ সাল। যথারীতি প্রেস ক্লাবের আড্ডায়। আফতাব আহমাদ নানা যুক্তি দেখাচ্ছেন। গণকণ্ঠের সহকারী সম্পাদক আফতাব আহমাদ কথা বলতেন শব্দ করে। তবে তার কথায় যুক্তি থাকতো। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হয়েছিলেন। ক’বছর আগে আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান। তার মৃত্যুর কারণ আজও অজানা। সে দিনের সকালের আড্ডায় তিনি বলছিলেন তাজউদ্দীনকে সরতেই হবে। কি কারণ? শফিকুল আজিজ মুকুল এই প্রশ্ন করতেই আফতাব আহমাদের জবাব ব্যক্তিত্বের সংঘাত। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে এমন কিছু উদাহরণও টানলেন। শফিকুল আজিজ মুকুলও একজন পণ্ডিত লোক ছিলেন।

বাংলার বাণীর সহকারী সম্পাদক। তার বাসাটি বইয়ে বোঝাই থাকতো। দেখলে মনে হতো এ যেন এক সাজানো-গোছানো পাবলিক লাইব্রেরি। তিনি কথা বাড়ালেন না। এক পর্যায়ে শুধু বললেন, এটাই কী রাজনীতির খেলা! আড্ডা থেমে গেল। যার যার কাজে চলে গেলেন। সচিবালয় ঘুরে এলেন কয়েকজন সাংবাদিক। তারা জানালেন আজই তাজউদ্দীন সাহেব পদত্যাগ করবেন। চারদিক থেকে এ রকম খবরই আসতে লাগলো। প্রেস ক্লাব থেকে অনেকেই ছুটলেন সচিবালয়ে। তাজউদ্দীন সাহেবের দপ্তরের সামনে সাংবাদিকদের উপচেপড়া ভিড়। টান টান উত্তেজনা। গোয়েন্দারাও গিজ গিজ করছেন।

সকাল গড়িয়ে দুপুর। অপেক্ষার পালা। দুপুর ১২টার পর গুজব আরো জমাট হলো। ঠিকই বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘদিনের সহকর্মী পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। কাগজপত্র গুছাচ্ছেন এমন খবরও এলো। ১২টা ২২ মিনিটে পদত্যাগের কথা জানালেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে। এতো রেডিও-টেলিভিশন নেই তখন। অনলাইনও নেই। এর মধ্যেও খবরটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। তাজউদ্দীন সাহেব নিচে নামলেন। নিরাপত্তা কর্মীদের অযথা বাড়াবাড়ি নেই। তার জন্য বরাদ্দকৃত গাড়ি যদিও অপেক্ষা করছিল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি সেই গাড়িতে উঠলেন না। বন্ধু আরহাম সিদ্দিকীর গাড়ি করে সচিবালয় ছাড়লেন। সচিবালয় থেকে সোজা গেলেন মিন্টো রোডে সরকারি বাসভবনে। পতাকাবিহীন গাড়ি যখন গেটে ঢুকতে যাচ্ছিলো তখন নিরাপত্তা কর্মীরা বাধা দেয়ার চেষ্টা করলো। তাদের কাছে তখনও খবরটি হয়তো পৌঁছেনি। কাঁচ খুলে নিজেই বললেন গেট খুলো। ভেতরে কর্মরত নিরাপত্তা কর্মীরা এসে ভিড় জমালো।

স্যার পদত্যাগ করেছেন। লাল দালানটির চেহারা মুহূর্তেই বদলে গেল। জাতীয় পতাকা নেমে গেল। নিরাপত্তা কর্মীরা বাক্স-পেটরা গোছাতে শুরু করলো। দেড়টার দিকে গিয়ে দেখি বাড়ির সামনে ছোটখাটো এক জনসভা। শত শত মানুষের ভিড়। নেতার মুখ থেকে শুনতে চায়। তাজউদ্দীন সাহেব তখন ভেতরের ঘরে। স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীনকে সব কিছু জানাচ্ছেন। যদিও কয়েকদিন আগে থেকেই তিনি তার পরিবারের সদস্যদের এমন ধারণাই দিচ্ছিলেন যে কোনো সময় তিনি মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিতে পারেন। পদত্যাগের এক মিনিটের মধ্যেই তাজউদ্দীন সাহেব জোহরা তাজউদ্দীনকে ফোনে খবরটি জানান। বলেন, লিলি এখন থেকে তোমাকে বেশি বেশি করে সময় দেবো। সংবাদে থাকাকালে এক সাক্ষাৎকারে জোহরা তাজউদ্দীন আমাকে বলেছিলেন পদত্যাগের পর তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখিনি।

কোনো কথা বললেন না প্রচারবিমুখ এই মানুষটি। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলেন না। ফিরে এলাম এক রাশ হতাশা নিয়ে। কি এমন ঘটলো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। যে কারণে তাজউদ্দীনকে সরে যেতে হলো। ঘটনাপঞ্জি বিশ্লেষণ করেছেন এমন ক’জন ইতিহাসবিদের মূল্যায়ন হচ্ছে- সংঘাতটা নেতৃত্বের, ব্যক্তিত্বের। আওয়ামী লীগের ভেতরকার একটি শক্তি বরাবরই চেষ্টা করেছে দূরত্ব তৈরি করতে। তাজউদ্দীন নিজেও খুব অভিমানী ছিলেন। জাসদে যোগ দেবেন- এমন জল্পনা ছিল শুরুতেই। আসলে এটা গুজব ছিল। লাহোর ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর যোগদানে বাধা দিয়েছিলেন। জরুরি অবস্থা জারিতে ভিন্নমত দেন। ওয়াশিংটন থেকে ফিরে মার্কিন নেতৃত্বের সমালোচনা করেন। দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষজনকে বাঁচানোর জন্য সর্বদলীয় ত্রাণ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। সব দল নিষিদ্ধ করে বাকশাল গঠনের উদ্যোগেরও বিরোধিতা করেন। বলেন, এ জন্য আমরা ২৪ বছর পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করিনি।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাজউদ্দীনের দূরত্ব তৈরিতে যে চক্রটি কাজ করেছিল তার মধ্যে খোন্দকার মোশ্‌তাক অন্যতম। অবস্থা এমনই তৈরি করা হয়েছিল, ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর দিবসে বঙ্গবন্ধু কোনোদিনই সেখানে যাননি। পরদিন ঢাকার সব সংবাদপত্রে প্রধান শিরোনাম হলো তাজউদ্দীন আহমদের পদত্যাগের খবর। সরকার নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি পত্রিকা অবশ্য জাতীয় স্বার্থে তাজউদ্দীনকে পদত্যাগ করানো হলো- এ রকম শিরোনামও দিয়েছিল। টক অব দ্য কান্ট্রি হয়ে গেলেন তাজউদ্দীন। একদিন যারা তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন তারাও বুঝে গেলেন তাজউদ্দীন এক পতিত নক্ষত্র। রাজনীতি আসলেই নিষ্ঠুর। তাজউদ্দীনের পদত্যাগ নিয়ে হইচই যেটুকুই হলো মিজানুর রহমান চৌধুরীর পদত্যাগ পত্রিকার পাতাতেই থাকলো।

একজন প্রখ্যাত নায়িকার সঙ্গে ‘অন্যরকম’ সম্পর্কের কারণে তথ্যমন্ত্রী থেকে মিজান চৌধুরীকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। তাজউদ্দীন সাহেবের পদত্যাগের কাছাকাছি সময়ে খ্যাতনামা সাংবাদিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী অধুনালুপ্ত দৈনিক জনপদের প্রথম পাতায় এক সম্পাদকীয় লিখে নানা প্রশ্নের জন্ম দেন। তিনি এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ‘ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু’ শিনোনামে লেখেন ‘বঙ্গবন্ধু আপনাকে বেছে নিতে হবে আপনি আলেন্দে হবেন না জওহরলাল নেহেরু হবেন। বলে রাখা ভালো, চিলির আলেন্দেকে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি সোভিয়েতের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। ইতিহাসে তার মৃত্যুর ঘটনা এভাবেই চিত্রিত হয়ে আছে।

মানবজমিন
দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/১০ এপ্রিল ২০১৬/রিপন ডেরি

Related posts