December 13, 2018

তদন্তে তিন ‘ক্লু’

117

নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর ফাইভ মার্ডার তদন্তে ৩ ক্লু নিয়ে এগুচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, নৃশংসভাবে ৫ জনকে হত্যার আগে ঘাতকরা তাদের সঙ্গে নিয়ে আসা নাশতা খাওয়ায়। যেই নাশতায় চেতনানাশক কিছু মেশানো ছিল। অচেতন হওয়ার পর তাসলিমা বেগম, তার ভাই মোশাররফ ওরফে মোর্শেদ ও জা লামিয়াকে মাথায় ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত করা হয়। পরে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করতে গলায় ফাঁস দিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়। তিনজনের এ হত্যাকাণ্ড

দেখে ফেলা তাসলিমার দুই শিশুসন্তান শান্ত ও সুমাইয়াকে শ্বাসরোধ ও মাথা থেঁতলে হত্যা করা হয়। যাতে হত্যাকাণ্ডের কোনো সাক্ষী না থাকে। হত্যা মিশনে ৩-এর অধিক অংশ নেয় এবং হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত ও ঘাতকরা নিহতদের পূর্ব পরিচিত। যারা তাসলিমার বাসায় আসা-যাওয়া করতো।

এদিকে রোববার সকালে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান, র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদসহ পুলিশ ও র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

একাধিক সূত্র জানায়, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহভাজন ও সম্ভাব্যদের ওপর নজরদারি রেখেছে। নিহতের পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে ইতিমধ্যে কিছু সন্দেহভাজনের নাম সংগ্রহ করেছে পুলিশ। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের পরিচয় ও অবস্থানের কোনো তথ্য প্রকাশ করছে না পুলিশ।

অন্যদিকে নিহতদের ময়নাতদন্ত শেষে বিকালে লাশ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। এর মধ্যে ৪ জনের লাশ নারায়ণগঞ্জে দাফন করা হবে। আর লামিয়ার লাশ গ্রামের বাড়ি ময়সনসিংহে নিয়ে যাওয়া হবে। এর আগে বেলা পৌনে ১১টার দিকে নিহত তাসলিমার স্বামী শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। পুলিশ ঘটনার পর থেকে রোববার পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ জনকে আটক করেছে।

পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান বলেছেন, দীর্ঘ চাকরির অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, শিশুরা কখনও টার্গেট হতে পারে না। চিনে ফেলবে বা সাক্ষ্য দেবে, এজন্যই দুই শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে আমার কাছে এমনটিই মনে হয়েছে। দুই শিশুসহ একই পরিবারের ৫ জনকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। তার মধ্যে ৩ জনের মাথায় আঘাত করা হয়েছে।

রোববার বেলা ১১টায় নারায়ণগঞ্জ শহরের ২নং বাবুরাইলে ৫ খুনের ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিনসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

খুনিরা পেশাদার নয়-সিআইডি

হত্যার ঘটনায় জড়িতরা ‘পেশাদার নয়’ বলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। মরদেহের সুরতহাল ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন আলামতের ভিত্তিতে এমনটাই দাবি করছে সিআইডি। রাত ১২টায় ঢাকা থেকে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তারা প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে তদন্ত করে। সিআইডির কাজ শেষ হলে লাশের সুরতহাল করে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার পুলিশ। ভোররাত চারটার দিকে পুলিশ লাশ পাঁচটি নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
সিআইডির নারায়ণগঞ্জ জোনের সহকারী পুলিশ সুপার এহসান উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ঘরে থাকা রুটি, হালুয়া, রক্তমাখা কাপড়, চুল, দেয়ালে দৃশ্যমান রক্তের দাগ, মেঝেতে থাকা রক্তের ছাপ উল্লেখযোগ্য। সিআইডির এ কর্মকর্তা বলেন, খুনিরা সংখ্যায় অন্তত তিনজন ছিল। তবে এর চেয়ে বেশিও হতে পারে বলে তারা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন।

সিআইডির এ কর্মকর্তা বলেন, প্রায় নয় মাস আগে তাসলিমা ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জে এসে বসবাস শুরু করেন। এর প্রধান কারণ ছিল সুদের ব্যবসা। তাসলিমা বিভিন্নজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে সেই টাকা চড়া সুদে বিভিন্নজনকে দিতেন। এ কারণে পাওনাদাররা তার কাছে তাগাদা দিতে শুরু করলে তিনি আত্মগোপন করেন। প্রথমে তিনি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার হোসেনপুর, এরপর বন্দর এবং সর্বশেষ বাবুরাইলে বসবাস শুরু করেন। বাবুরাইলের বাসায় তারা তিন মাস ধরে থাকছিলেন।

র‌্যাব ছায়া তদন্ত করবে-র‌্যাবের ডিজি

একই সময় ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, এটি একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড। জেলা পুলিশ ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি র‌্যাবও ছায়া তদন্ত শুরু করেছে। সবগুলো কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশা করছি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে রহস্য উদ্‌ঘাটন করে জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারবো।

কয়েকজনকে আটকের বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের আটক নয়, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেয়া হয়েছে। খুনিরা পেশাদার কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খুনিরা পেশাদার নাকি অপেশাদার সেটা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পারিবারিক বিরোধ সম্ভাব্য একটি কারণ হতে পারে। এ সময় র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসানসহ র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার সঙ্গে ছিলেন।

নৃশংসতার সাক্ষী ফ্ল্যাটটি সিলগালা

২নং বাবুরাইলের ১৩২/১১নং ছয় তলার ভবনটির মালিক আমেরিকা প্রবাসী ইসমাইল হোসেন। এ ভবনের নিচ তলার তিনটি ঘরের দরজার একটি নারায়ণগঞ্জের পাঁচ খুনের নৃশংসতার সাক্ষী। আর কোনো সাক্ষী নেই! না ওই ভবনের কোনো বাসিন্দা, না বাড়িওয়ালা, না অন্য কেউ। ছয় তলা ভবনের যে ঘরটিতে রোমহর্ষক এ হত্যাকাণ্ড, তার ওপরের তলাগুলোতে অন্তত ১০টি পরিবারের বসবাস। নিচ তলায় নিহতদের পরিবার ছাড়াও আরও দুটি পরিবার থাকে। পরিবারগুলোর ভাষ্য, ‘কোনো কিছুই আঁচ করতে পারিনি’।

তারা বলছেন, খুনের শব্দ এমনকি খুনের শিকার হওয়া পাঁচজনের রক্তও বাইরে গড়ায়নি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভবনটির বাসিন্দাদের মতে, চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ড পুরোপুরি ‘সাইলেন্ট কিলিং মিশন’। যেখানে শুধু মিশনের লোকরা ছাড়া ঘটনার সময় কেউ কিছুই বুঝতে পারেননি। দিন-রাত ভবনটির সিঁড়ি বেয়ে বাসিন্দারা ওপরে-নিচে ওঠানামা করলেও কাউকে কিছু বুঝতে দেননি হত্যাকারীরা। ওই বাড়ির নিচ তলায় তিনটি ফ্ল্যাট। এর মধ্যে পশ্চিম-উত্তর দিকের ফ্ল্যাটে খুনের ঘটনা ঘটে। পূর্বপাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, এত বড় ঘটনার কোনো কিছুই তিনি আঁচ করতে পারেননি।

হত্যা মামলা দায়ের, আটক ৭

গতকাল সকালে অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন নিহত তাসলিমা বেগমের স্বামী শফিকুল ইসলাম। মামলায় কাউকে আসামি না করা হলেও নাজমা ও শাহজাহান নামে যে দুজনের কাছ থেকে তাসলিমা ঋণ নিয়েছিলেন, তাদের এবং শফিকুল ইসলামের ভাগ্নে মাহফুজ ওরফে মারুফ এ হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন বলে এজাহারে বাদী উল্লেখ করেছেন।

মামলার বাদী শফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি ঢাকায় নিউজিল্যান্ড ডেইরি ফার্মের প্রধান কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার গাড়িচালক। তিনি ঢাকার কলাবাগানে দীর্ঘ ১৮ বছর বসবাস করেছেন। তিনিও স্বীকার করেন, তার স্ত্রী তাসলিমা একই এলাকার নাজমা এবং শাহজানের কাছ থেকে ১০-১২ লাখ টাকা সুদে ঋণ নিয়েছিলেন। ওই টাকা আবার অন্যদের চড়া সুদে ঋণ দিতেন। কিন্তু তাসলিমা যাদের ঋণ দিয়েছিলেন তাদের কাছ থেকে আসল টাকা বা সুদ আদায় করতে পারেননি। এ কারণেই নাজমা ও শাহজাহান তাকে প্রায়ই হুমকি দিতেন। এ কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলে তিনি পুলিশ এবং সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তার ছেলে শান্ত স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণিতে পড়ালেখা করতো। মেয়ে সুমাইয়াকে স্কুলে ভর্তি করা হয়নি।

এদিকে ঘটনার পর থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত ৭ জনকে আটক করা হয়েছে জিজ্ঞাবাদের জন্য। তারা হলো নিহত তাসলিমার খালাতো ভাই দেলোয়ার ও শাহাদাত, তাসলিমার স্বামী শফিকুল ইসলামের ভাগ্নে মাহফুজ, তাসলিমার ভাই মোর্শেদুলের কারখানার ৪ কর্মচারী নয়ন, রাসেল, নজিমুন ও সাইফুল।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদউদ্দিন বলেন, প্রাথমিকভাবে ৩টি ক্লু নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তবে এর বাইরেও আরও কিছু থাকলে সেগুলোও তদন্তে বাদ যাবে না।
ত্রিশালে শোকের মাতম

নারায়ণগঞ্জের বাবুরাইল এলাকায় হত্যাকাণ্ডের শিকার পাঁচজনের বাড়িই ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের পাটুলী গ্রামে। এ খুনের খবরে পাটুলী গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নৃশংসতার শিকার মোর্শেদুল ও তাসলিমা আক্তারের পরিবার নিহতদের লাশ ফেরত দাবি করেছে। পিতার বাড়িতে নিকটাত্মীয়দের কান্নায় এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে। তাসলিমা ও মোর্শেদুলের পিতা আব্দুল বারেক জানান, টেলিভিশনের খবরে তাদের খুনের ঘটনা জানতে পারেন এবং তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগও করতে পারছেন না।

মা হারা সন্তান খুনের ঘটনায় পিতা আব্দুল বারেক জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। তাসলিমা ও মোর্শেদুলের ভাই মকবুল হোসেন জানান, আমার ভাই, বোন ও আত্মীয়দের যারা নির্মমভাবে খুন করেছে আমরা তাদের বিচার চাই। আমি আমার ভাই, বোন ও আত্মীয়দের লাশ ফেরত চাই। বালিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ বাদল জানান, আমরা এ ঘটনায় শোকাহত, নিহতদের বাড়িতে আমি গিয়েছি এবং তাদের সান্ত্বনা দিয়েছি।মানবজমিন

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts