November 13, 2018

ড্রোন হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন

Captureইউরোপ ::

পত্রপত্রিকার পাতা খুললেই পাকিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলায় শিশুসহ বহু মানুষের মৃত্যুর খবর দেখা যায়। আমরা সবাই জানি, কোনো দেশের সরকারের অনুমতি ছাড়া বহিঃশক্তি কোথাও সামরিক তৎপরতা চালাতে পারে না এবং বেআইনিভাবে হামলা চালালে তা যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে গণ্য হবে। আন্তর্জাতিক আইন এ ধরনের হামলা অনুমোদন করে না। কিন্তু আমরা পাকিস্তানে আমেরিকার ড্রোন হামলায় নিরীহ মানুষের মৃত্যুর পাশাপাশি দেখতে পাচ্ছি, সিআইএ পাকিস্তান সরকারের অনুমতি ছাড়া ড্রোন হামলা পরিচালনা করছে।
উপজাতীয় তালেবান বিদ্রোহী ও আলকায়েদার সন্ত্রাসীরা সশস্ত্র হামলা চালালে দেশ-বিদেশে হইচই পড়ে যায়। সবাই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ঘৃণায় নাক সিটকায়। কিন্তু বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ড্রোন হামলা চালিয়ে নিরীহ নির্দোষ নর-নারী ও শিশুদের হত্যা করলে তাকে কেউ সন্ত্রাসী অথবা জঙ্গি আচরণ বলে নিন্দা করে না, বরং অমানবিক ও অগ্রহণযোগ্য হলেও অনেকে নির্বিচারে মার্কিন ড্রোন হামলার প্রতি সমর্থন দেয়। ইতিহাস এ দ্বিমুখী মানসিকতাকে কিভাবে বিচার করবে, জানি না। মানবজাতির এমন স্ববিরোধী মানসিকতা উপলব্ধি করে বোধহয় অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখে গেছেন, ‘সমাজে অর্থের জোরে, বংশের জোরে, গায়ের জোরে অনেক অপকর্ম এবং অন্যায় করে সসম্মানে, এমনকি নির্বিঘেœ থাকা যায়। কিন্তু গরিবের সামাজিক শাসন বড় কড়া।’ শরৎচন্দ্র সামাজিক প্রেক্ষাপটে এ মন্তব্য করলেও বিশ্বরাজনীতিতেও তার কথা ষোলআনা সত্যি।
২০০৪ সাল থেকে মার্কিন সরকার আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে উপজাতি অধ্যুষিত উত্তর ও দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে শত শত ড্রোন হামলা চালিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে ড্রোন হামলা শুরু হয় এবং তার উত্তরসূরি ওবামার আমলে এ হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। মিডিয়ায় এসব হামলাকে ‘ড্রোন ওয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দেখতে পেয়েছে, হতাহতদের বেশির ভাগ নিরস্ত্র এবং কোনো কোনো ড্রোন হামলা যুদ্ধাপরাধ। ২০১৩ সালের অক্টোবরে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ড্রোন হামলার প্রতিক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চালায় এবং এসব হামলার কঠোর সমালোচনা করে। অ্যামনেস্টির রিপোর্টে বলা হয়, একতরফা বেসামরিক লোকের মৃত্যু, হামলায় ব্যবহৃত কৌশল এবং পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায়। ২০১৬ সালের মে মাসে বেলুচিস্তানে ড্রোন হামলায় তালেবান শীর্ষ নেতা মোল্লা মোহাম্মদ মনসুর নিহত হন। ওবামা প্রশাসনের একটি নীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এসব হামলায় বিরতি দেয়া হয়। এই নীতিতে বলা হয়েছে, বেসামরিক লোকদের টার্গেট করা হবে না এবং আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে মার্কিন সামরিক বাহিনী ও সিআইএ’র উপস্থিতি হ্রাস করা হবে।
পেশোয়ার হাইকোর্টের রায়েও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অভিমতের প্রতিধ্বনি করা হয়েছে। ২০১৩ সালের মে’তে এই হাইকোর্টের এক রায়ে বলা হয়, ড্রোন হামলা অবৈধ, অমানবিক, সর্বজনীন মানবাধিকারের লঙ্ঘন এবং একটি যুদ্ধাপরাধ। পেশোয়ার হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি দোস্ত মোহাম্মদ খান তার রুলিংয়ে দেশের উত্তরাঞ্চলে প্রয়োজনে শক্তিপ্রয়োগে ড্রোন হামলা বন্ধ করতে সরকারকে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানে ড্রোন হামলা একটি যুদ্ধাপরাধ এবং মৌলিক মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বিচারপতি দোস্ত মোহাম্মদ খান জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদকে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানাতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে বিগত ওবামা প্রশাসন এ রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেছে, এসব হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন নয় এবং হামলার ধরন হচ্ছে নির্ভুল ও কার্যকর।
পাকিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলা নিয়ে ইসলামাবাদের ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির দু’জন অধ্যাপক ড. আমনা মেহমুদ ও ড. সাদাফ ফারুক ব্যাপক গবেষণা করেছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সম্পর্ক বিভাগের এ দু’জন অধ্যাপক ‘ইউএস ড্রোন অ্যাটাক ইন পাকিস্তান : অ্যান ইন্টারন্যাশনাল ল’ পারসপেক্টিভ’ শিরোনামে একটি গবেষণাপত্রে মন্তব্য করেছেন, Drone attacks are not supported by International law. They are not justified under US domestic laws since Pakistan government never refused to take action against terrorists. Moreover, there is no transparency in conduct of these drone attacks. In current scenario the US has lost all justification to continue these attacks because Pakistan army is conducting an aggressive military action against terrorist in FATA (আন্তর্জাতিক আইন ড্রোন হামলা সমর্থন করে না। পাকিস্তান সরকার সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কখনো অস্বীকার না করায় এসব হামলা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইনে ন্যায়সঙ্গত নয়। অধিকন্তু এসব হামলা পরিচালনায় স্বচ্ছতা রক্ষা করা হয় না। বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ড্রোন হামলা পরিচালনায় সব যৌক্তিকতা হারিয়েছে। কেননা পাকিস্তান সেনাবাহিনী কেন্দ্রশাসিত উপজাতীয় অঞ্চলে জোরালো সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে)।
পাকিস্তানে ড্রোন হামলা জেনেভা কনভেনশনেরও স্পষ্ট লঙ্ঘন। ১৮৬৪ সালে প্রণীত জেনেভা কনভেনশনে রুগ্ণ ও আহতদের ওপর হামলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০০৫ সালে আন্তর্জাতিক রেডক্রস কাউন্সিলের ৪৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী ‘হোরস দ্য কম্ব্যাট’ (লড়াইয়ে অক্ষম) হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের ওপর হামলা অনুমোদনযোগ্য নয়।
সিআইএ দাবি করেছে, ২০১০ সালের মে থেকে ২০১১ সালের আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত ড্রোন হামলায় ছয় শতাধিক ‘জিহাদি’ নিহত হয়েছে। তবে এ দাবি নিয়ে দ্বিমত প্রকাশ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউ আমেরিকা ফাউন্ডেশনের হিসাবে বলা হয়েছে, হামলায় নিহতদের ৮০ শতাংশ জঙ্গি। অন্য দিকে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেছেন, সত্যিকারভাবে আরো অনেক কম জিহাদি এবং বেশি সংখ্যক বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে। ২০০৯ সালে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক ড্যানিয়েল এল. বায়ম্যান একটি নিবন্ধে লিখেছেন, ড্রোন হামলায় প্রত্যেক জিহাদির বিপরীতে ১০ জন অথবা আরো বেশি বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী দাবি করেছে, নিহতদের বেশির ভাগ আলকায়েদা অথবা তালেবান যোদ্ধা। ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম দেখতে পেয়েছে, নিহত দুই হাজার ৪৭৬ থেকে তিন হাজার ৯৮৯ জনের মধ্যে ৪২৩ থেকে ৯৬৫ জন বেসামরিক লোক এবং সাত বছরে ড্রোন হামলায় ১৬৮টি শিশু নিহত হয়েছে।
জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন সরকারিভাবে পাকিস্তানে ড্রোন হামলা চালানোর সত্যতা অস্বীকার করেছিল। ২০১৩ সালে ওবামা প্রশাসন প্রথমবার স্বীকার করে, ড্রোন হামলায় চারজন মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, ড্রোন হামলা পাকিস্তানে অত্যন্ত অজনপ্রিয়। ড্রোন হামলায় পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিদ্বেষ জন্ম নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান উভয় প্রশাসন প্রকাশ্যে দাবি করছে, এসব হামলায় বেসামরিক লোকের মৃত্যুর হার সর্বনিম্ন। ফাঁস হওয়া সামরিক নথি থেকে দেখা যাচ্ছে, নিহত লোকদের বেশির ভাগই লক্ষ্যবস্তু ছিল না। মাত্র ১৩ শতাংশ ছিল লক্ষ্যবস্তু এবং ৮১ শতাংশ ইসলামি জঙ্গি এবং ৬ শতাংশ বেসামরিক লোক। যুক্তরাষ্ট্র কখনো ব্যাপকভাবে বেসামরিক লোকের মৃত্যুর বিষয়ে তদন্ত করেনি। মার্কিন বাহিনী ধারাবাহিকভাবে সামরিক বয়সের প্রতিটি নিহত পুরুষকে যুদ্ধে নিহত ‘শত্রু’ হিসেবে গণনা করে। ২০১৬ সাল নাগাদ পাকিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলায় ১৭২ থেকে ২০৭টি শিশুসহ ৪২৩ থেকে ৯৬৫ জন বেসামরিক লোকের মৃত্যু হয়েছে। ২০০৪-১৩ সাল পর্যন্ত ড্রোন হামলার সংখ্যা ৩৪২। এসব হামলায় নিহতের সংখ্যা তিন হাজার ১৮৩ এবং আহতের সংখ্যা এক হাজার ২২৬ জন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ বারবার ড্রোন হামলা বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেছেন, ড্রোন ব্যবহার শুধু আমাদের আঞ্চলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন নয়; বরং আমাদের দেশ থেকে সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের দৃঢ় প্রচেষ্টার প্রতি অসম্মান। কোনো কোনো রিপোর্টে বলা হয়, পাকিস্তান সরকার ২০১১ সালের ২১ এপ্রিল নাগাদ শামসি বিমানঘাঁটি থেকে চালকবিহীন মার্কিন গোয়েন্দা বিমান উড্ডয়নের অনুমতি দেয়। প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, কোথাও কোথাও পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ অতি গুরুত্বপূর্ণ টার্গেটে হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তথ্য বিনিময় করেছে। সাড়া জাগানো ওয়েবসাইট উইকিলিকসের ফাঁস করা তারবার্তায় বলা হয়েছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানি শুধু ড্রোন উড্ডয়নে পরোক্ষভাবে সম্মত হননি, ২০০৮ সালে তিনি ড্রোনের সংখ্যা বৃদ্ধির অনুরোধও করেছেন। অন্য দিকে পাকিস্তানের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেহমান মালিক বলেন, ড্রোন থেকে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। ড্রোন হামলায় মুষ্টিমেয় জঙ্গি নিহত হয়েছে। বরং হতাহতদের বেশির ভাগ নির্দোষ বেসামরিক মানুষ। এসব হামলায় পাকিস্তানে মার্কিনবিরোধী মনোভাব জোরালো হচ্ছে এবং সিআইএ’র তৎপরতার বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। জঙ্গি ও বেসামরিক লোক নিহত হওয়ার সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন। সাধারণভাবে সিআইএ এবং অন্যান্য আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা দাবি করছে, ড্রোন হামলায় নিহতদের বেশির ভাগ জঙ্গি।
পাকিস্তান আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা সংস্থার (আইএসআই) অনুমোদন নিয়ে সিআইএ পাকিস্তানে ড্রোন হামলা পরিচালনা করছে। ২০০৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল রশিদ কোরেশি ড্রোন হামলায় বেসামরিক লোক হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেন এবং প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দেন। ২০০৮ সালের ৪ অক্টোবর ওয়াশিংটন পোস্টের এক রিপোর্টে বলা হয়, ড্রোন হামলার অনুমতি দিয়ে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি গোপন চুক্তি হয়েছে। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ড্রোন হামলায় নিহতদের পরিবার ইসলামাবাদে কর্মরত সিআইএ’র স্টেশন প্রধান জোনাথন ব্যাংককে (ছদ্মনাম) আসামি করে মামলা দায়ের এবং তাকে হত্যার হুমকি দিলে তিনি পাকিস্তান ত্যাগ করেন। পাকিস্তানি এক সাংবাদিকের ভাই ও পুত্র ড্রোন হামলায় নিহত হলে তিনি ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেন। ২০১১ সালের ৯ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল কায়ানি অনুপ্রবেশকারী মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার নির্দেশ দেন।
২০১২ সালের জানুয়ারিতে কাতারে আইএসআইএ’র পরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল শুজা আহমদ পাশা এবং সিআইএ’র পরিচালক জেনারেল ডেভিড প্যাট্রিয়াস একটি গোপন চুক্তিতে উপনীত হন। প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি বিভিন্ন চ্যানেলে ড্রোন হামলা বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করলেও হামলা অব্যাহত রাখা হয়। ২০১৪ সালে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ দ্য নিউইয়র্কারের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি জঙ্গি হেলিকপ্টার ও নাইট ভিশন যন্ত্রপাতির বিনিময়ে সিআইএকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ড্রোন হামলার অনুমতি দিয়েছিলেন। জেনারেল মোশাররফ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে ড্রোন উড্ডয়নের প্রস্তাব দেন, কিন্তু ওয়াশিংটন তার প্রস্তাব নাকচ করে দেয়।
২০০৪ সালের ১৮ জুন দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের প্রধান শহর ওয়ানার কাছে ড্রোন হামলায় পাকিস্তানি জিহাদি নেক মোহাম্মদ ওয়াজির এবং দু’টি শিশুসহ পাঁচ থেকে আটজন নিহত হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রাথমিকভাবে দাবি করেছিল, তাদের হামলায় নেক মোহাম্মদ নিহত হয়েছেন। আসলে সত্যিকারভাবে তিনি চালকবিহীন মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন। ২০০৫ সালের ১৪ মে আফগান সীমান্তের কাছে, উত্তর ওয়াজিরিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলায় আলকায়েদার ইয়েমেনি বিস্ফোরকবিশেষজ্ঞ হাইছাম আল-ইয়েমেনিসহ দু’জন নিহত হয়। সিআইএ কখনো তার মৃত্যুসংক্রান্ত বিবৃতি প্রকাশ করেনি। পাকিস্তান ভূখণ্ডে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ায় বিবৃতি প্রকাশ করা ছিল স্পর্শকাতর ব্যাপার।
২০০৫ সালের ৫ নভেম্বর ড্রোন হামলায় আলকায়েদার মিসরীয় সদস্য ও আলকায়েদা কমান্ডের তিন নম্বর নেতা আবু হামজা রাবিয়ার বাড়ি ধ্বংস এবং তার স্ত্রী, তিন সন্তান ও অন্য চারজন নিহত হয়। ২০০৫ সালের ৩০ নভেম্বর উত্তর ওয়াজিরিস্তানের মিরানশাহর কাছে আশোরোয়ে সিআইএ পরিচালিত ড্রোন হামলায় চারজন সহযোগীসহ আবু হামজা রাবিয়া নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিল আট বছরের নূর আজিজ এবং ১৭ বছরের আবদুল ওয়াসিত। আবু হামজার মৃত্যুতে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানি ভূখণ্ডে হামলা চালানোর অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও মার্কিন ড্রোন উত্তর ওয়াজিরিস্তানে অনুপ্রবেশ করেছিল। প্রাথমিকভাবে পাকিস্তানি ও মার্কিন উভয় কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করে, মার্কিন ড্রোন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়নি। পরবর্তী ঘটনায় সাংবাদিক হায়াতুল্লাহ খান নিখোঁজ হওয়ার ছয় মাস পর তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
২০০৬ সালের ১৩ জানুয়ারি বাজাউরের দামাদোলায় মার্কিন ড্রোন হামলায় ১৮ জন বেসামরিক লোক নিহত হয়। আলকায়েদার দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ড. আইমান আল-জাওয়াহিরি বেঁচে যান। নিহতদের মধ্যে পাঁচজন মহিলা, আটজন পুরুষ ও পাঁচটি শিশু। ২০০৬ সালের ৩০ অক্টোবর বাজাউরের চেনাগাইয়ে জাওয়াহিরিকে হত্যার জন্য ড্রোন হামলা চালানো হলে একটি মাদরাসা ধ্বংস এবং ৭০-৮০ জন নিহত হয়। পাকিস্তান সামরিক বাহিনী দাবি করে, নিহতদের মধ্যে জঙ্গি ছিল। পাকিস্তানের প্রাদেশিক মন্ত্রী সিরাজুল হক ও স্থানীয় একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, নিহতরা ছিল নির্দোষ ছাত্র। ঈদের ছুটি শেষে এসব ছাত্র মাদরাসায় যোগদান করেছিল।
এসব মৃত্যুতে কারো চোখে পানি আসে না। কেউ তাদের কথা ভাবে না। মুসলমানদের রক্তের যেন কোনো দাম নেই। অনাগত দিনে হয়তো কোনো মানবশিশু আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলবে- হে রাহমানুর রাহিম, তুমি আমাকে মার্কিন ড্রোন হামলার খোরাক হওয়ার জন্য পৃথিবীতে পাঠিও না।

Related posts