September 19, 2018

ডিমলায় রহস্যজনক অন্তঃসত্ত্বার লাশ নিয়ে দুই চেয়ারম্যানের বানিজ্য

মহিনুল ইসলাম সুজন,
নীলফামারী প্রতিনিধিঃ
নীলফামারী জেলার ডিমলায় নয় মাসের এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধুর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। আর ওই গৃহবধুর মৃত্যুর পর তার স্বামী ও শশুর কে নিহতের পরিবারের লোকেরা আটকিয়ে বেধে রাখলেও কয়েক ঘন্টা পর অবশেষে দুই ইউপি চেয়ারম্যান, এক ইউপি সদস্যের লাশ নিয়ে মোটা অংকের বানিজ্যের ফলে তা রফাদফার অভিযোগ উঠেছে।

আজ বুধবার ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশটির দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

হৃদয় বিতারিত এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার নাউতরা ইউনিয়ন আকাশকুড়ির গোদার বাজার নামক স্হানে।

এলাকাবাসীর অভিযোগে জানা গেছে, উপজেলার গয়াবাড়ী ইউনিয়নের পাচ নং ওয়াড কলেজ পাড়া গ্রামের বাসীন্দা আকবর আলী পেট্টুর মেয়ে মোছাঃ ছালেয়া বেগম (১৫) এর সাথে এক বছর আগে একই উপজেলার নাউতরা ইউনিয়নের আকাশকুড়ি (গোদার বাজার) গ্রামের নইজার উদ্দিনের ছেলে জসিম উদ্দিন(২০)এর বিয়ে হয়। বিয়েতে যৌতুক বাবদ চল্লিশ হাজার টাকা নগদ দেয়া হলেও আরো টাকা দাবি করে স্বামী জসিম মাঝে মধ্যে সামান্য বিষয়েই গৃহবধু ছালেয়ার উপড় অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিল।

গত মঙ্গলবার ঘটনার দিন সকালে নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধুর পেটে প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করলে স্বামী জসিমকে সে তাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যেতে বলেন।কিন্তু জসিম ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া তো দুরের কথা উল্টো স্ত্রী ছালেয়াকে অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ করে বাবার বাড়ি থেকে চিকিৎসার টাকা এনে ডাক্তারের কাছে যেতে বলেন,আর নইলে ব্যথায় মরতে বলেন।স্ত্রী ছালেয়া বেগম তার প্রতিবাদ করে এটা কেমন কথা জানতে চাওয়া মাত্রই জসিম ক্ষিপ্ত হয়ে অমানবিক ভাবে এলোপাতারি নিজ অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে পেটাতে থাকেন।এক পর্যায়ে ওই অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধু পেটে আঘাত পেলে শুরু হয় রক্তক্ষরণ ।

ঘটনা বেগতিক বুঝতে পেরে স্বামী জসিম এবং তার পিতা নইজার উদ্দিন দায়সারা ভাবে কাদায় পা পিচলে পড়ে পেটে আঘাত পেয়েছেন বলে মিথ্যে তথ্য দিয়ে ডিমলা উপজেলা স্বাস্হ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করান ওই গৃহবধুকে ।কিন্তু কর্তব্যরত চিকিৎসক অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারনে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন।সেখানে মঙ্গলবারই বিকেলে চিকিৎসাধীন সময় গৃহবধু ছালেয়ার মৃত্যু হয়।

তারপর ওই গৃহবধুর লাশ সন্ধ্যারর সময় তার নিজ পিত্রালয়ে নিয়ে আশলে তার স্বামী ও শশুর নিজেদের বাচাঁতে কৌশলগত ভাবে সেখানে ছুটে এসে তারতারি করে লাশ দাফনের পায়তারা করলে নিহত গৃহবধুর পরিবার ও এলাকাবাসী তাদের দুজনকেই মেয়ের খুনি আখ্যা দিয়ে বেধে রাখেন।

দীর্ঘ ঘন্টা তাদের বেধে রাখবার পর নিহত গৃহবধুর স্বামীর এলাকা উপজেলার নাউতরা ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম লেলিন,পিতার এলাকা একই উপজেলার গয়াবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান ইবনে ফয়সাল মুন ও তার নিজ ওয়াডের ইউপি সদস্য(মেম্বর)আমজাদ হোসেনসহ প্রভাবশালীদের নেতৃত্বে উভয় পক্ষকে নিয়ে মঙ্গলবার রাত ১০টারও পরে গয়াবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদে প্রহসন নামের আপোষ মিমাংসার বৈঠকে বসেন।দীর্ঘক্ষন রুদ্ধকর চলা বৈঠকে ওই দুই চেয়ারম্যান ইবনে ফয়সাল মুন,সাইফুল ইসলাম লেলিন ও ইউপি সদস্য আমজাদ হোসেন নিহত গৃহবধুর পরিবারকে ভয়ভিতি, প্রলোভন দেখিয়ে ও চাপ প্রয়োগ করে প্রকাশ্যে একচল্লিশ হাজার টাকায় বিনিময়ে মিমাংসা চুরান্ত করেন।যা কিনা গোপনে কয়েকগুনে বেশি।এবং এ বিষয়ে কেউ তাদের কাছে কোনো কিছু জানতে চাইলে মেয়ের স্বাভাবীক মৃত্যু হয়েছে বলতে হুসিয়ার করে দেন প্রভাবশালীদের নানান মানসিক চাপে বাধ্য হন নিহত গৃহবধুর পরিবার মাত্র একচল্লিশ হাজার টাকাতে বিষয়টি রফাদফা করতে।

এ দিকে এমন মর্মান্তিক ঘটনার জোরপুর্বক মিমাংসার কথা জানতে পেরে স্হানীয় সাংবাদিকরা রাতেই গয়াবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদে ছুটে গেলে ওই দুই প্রভাবশালী চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য সাংবাদিকদের উপস্হিতি দেখতে পেরে দ্রুতই স্হান ত্যাগ করে চলে যান।

সেখানে নাম প্রকাশ না করবার শর্তে সালিশে উপস্হিত থাকা এক ব্যক্তি বলেন,নিহতের পরিবার একচল্লিশ হাজার টাকা জানলেও বিষয়টি রফাদফা হয়েছে তারও অনেক গুন মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে।নিহতের পরিবার আংশিক ওই টাকা পাবেন,আর বাকী পুরো টাকাটাই যাবে বিচারক নামের ওইসব প্রভাবশালী চেয়ারম্যান-মেম্বরের পকেটেই।

পরে সাংবাদিকরা গয়াবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান মুনের মোবাইল ফোনে কল করে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার ফোনের সুইচ বন্ধ পাওয়া যায়।আর নাউতরা ইউপি চেয়ারম্যান লেলিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,বিষয়টি আমিও আপোষের পক্ষে ছিলাম না,আমি এলাকার জনপ্রতিনিধি হিসেবে ছেলে ও তার বাবার খোজ নিতে গিয়েছিলাম মাত্র।কিন্তু মুন চেয়ারম্যান জোর করে একেবারে আপোষ করে ফেললেন।

টাকার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন,একচল্লিশ নয় একুশ হাজার টাকার বিনিময়ে আপোষ করা হয়েছে। এই টাকাটা অসুস্হ্য ওই গৃহবধুর চিকিৎসায় তার স্বামী কোনো রকম ব্যয় না করায় তা জরিমানা বাবদ দেয়া হয়েছে।

এবং বিষয়টি জানা জানি হয়ে যাবার ফলে লাশ আর আজকে রাতেই দাফন না করে সকালে পরিবেশ পরিস্হিতি দেখে পুনরায় সিদ্ধান্ত নেয়ার পরই লাশ দাফন করবার কথা বলা হয়েছে।আসলে মেয়ের পরিবার গরীব তো তাই দেখেন আপনারাও বিষয়টি এখানেই ইতি টানা যায় কি-না।

এদিকে রাতেই সরজমিনে নিহত গৃহবধুর বাড়িতে গেলে-নিহতের মা হামিদা বেগম বুক ফাটা কান্নায় জর্জরিত অবস্হায় সাংবাদিকদের দেখে ছুটে এসে মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত কারন জানাতে চাইলে পরিবারের অন্যান্য পুরুষ ব্যক্তিরা তাকে কিছু বলার আগেই জোরপুর্বক টেনে হ্যাচড়ে বাড়ির ভিতরে নিয়ে যান।

তবে নিহতের এলাকার দুঃসম্পর্কের এক আত্নীয় নাম প্রকাশ না করবার শর্তে অভিযোগ করে বলেন, নিহত ছালেয়াকে মাঝে মধ্যে স্বামীসহ শশুর বাড়ির লোকেরা কারনে-অকারনে যৌতুকের টাকার জন্য অমানসিক নির্যাতন করত।ঘটনার দিনেও তাকে অনেক মারপিট করা হয়েছে বলে তার পরিবারে খবর এসেছিল।এমন কি তার শরীরের অনেক স্হানে আঘাতের দাগ রয়েছে।

আর তারা যদি তাকে নির্যাতন নাই করে থাকেন তাহলে টাকার বিনিময়ে মিমাংসার কি প্রয়োজন আছে?আর তারাহুড়ো করে কেনোই বা লাশ দাফন করতে চাইবেন। লাশের ময়নাতদন্ত হলে তাদের কি বা ভয়?আমরা এলাকাবাসী মনে করি লাশের ময়নাতদন্ত করা হলে মুত্যুর প্রকৃত কারনটা মেয়ের পরিবারসহ আমরা সকলেই জানতে পারব।এবং এটাই করা শ্রেয়।

এদিকে ডিমলা থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের কাছে ঘটনার স্বত্যতা জানতে চাইলে তিনি দায়সারা ভাবেই বলেন,আমি এ বিষয়ে কিছুই জানিনা,আমাকে কেউ অভিযোগ করননি।এবং তিনি আপোষের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, আঘাতে মৃত্যু হলেতো লাশ রংপুর মেডিকেলেই আটক করে দিত।কাদায় পা পিচলে পড়ে আঘাত পেয়েছেন মর্মে তাকে মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছেন বলে তাকে জানালে তিনি আবারো বলেন যে,আমাকে কেউ তো অভিযোগ করেনি আমি কি করব।ওসির এমন দায়সারা যুক্তিতে এলাকার অনেকেই অবাক(!)

এলাকাবাসীর অনেকের অভিযোগ পুলিশ অনেক সময় স্বাভাবিক মৃত্যুবরন করা লাশকেও রহস্যজনক আখ্যা দিয়ে ময়নাতদন্ত করালেও এ বিষয়ে কেনো ভিন্ন ভুমিকায়।এলাকাবাসী চেয়েছিলেন নিহত গৃহবধুর লাশ ময়নাতদন্ত করা হোক, তারা মনে করেন শুধু মাত্র ময়নাতদন্তের মাধ্যমেই মৃত্যুর সঠিক কারন নিশ্চিত হওয়া যাবে।যা আমাদের (এলাকাবাসীর) মনের নানার রকম প্রশ্নের সঠিক উত্তর এনে দিত।

গয়াবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান ইবনে ফয়সাল মুনের বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ রয়েছে যে, নিহত এই গৃহবধু ছালেয়ার এক বৎসর পুর্বে তার বিবাহর সময়ে বয়স হয়েছিল মাত্র ১৪ বৎসর।আর এই নাবালিকা কিশোরী শিশু মেয়ের ঢাক-ঢোল বাজিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ের অনুষ্ঠানে এই চেয়ারম্যান নিজেই উপস্হিত থেকে তা সম্পন্ন করিয়েছিলেন(!)

বর্তমান দেশের সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কঠোর আইন করে বাল্যবিবাহ ও শিশু বিবাহ প্রতিরোধে যখন বিভিন্ন জনসচেতন মুলক সভা-সেমিনার করে তা বন্ধে আপ্রান চেস্টা চালিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন।তখন একজন ইউপি চেয়ারম্যান রাষ্ট্রের আইন উপেক্ষা করে তার উপস্হিতিতেই ছালেয়া নামের এক ১৪ বছরের শিশু কিশোরীর বিয়ে কি ভাবে দিয়েছিলেন তাও রাষ্ট্রকে গুরুত্ব সহকারে ক্ষতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা গ্রহনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

যদি এ ধরনের জনপ্রতিনিধিদের আইন অমান্য করবার ফলে উপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনা যায় তবে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকারের এত প্রচেষ্টা ফলপ্রসু হবে না খুব সহজেই।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts