November 13, 2018

ডিপিডিসির গণশুনানী নিয়ে লুকোচুরি

169

রফিকুল ইসলাম রফিক,নারায়ণগঞ্জঃ  শহরের কিল্লারপুলে ডিপিডিসির প্রধান প্রকৌশলী এনওসিএস (সাউথ) এর দফতরে দু’দিন ব্যাপী গণশুনানীর আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ‘নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ-উৎফুল্ল গ্রাহক’ এই স্লোগানে ৬টি এনওসিএস নিয়ে সোমবার গণশুনানীর আয়োজন করা হলেও সেখানে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের চেয়ে বেশীই ছিল তোষামোদকারীরা। যাদেরকে দেখা যায় সার্বক্ষনিক বিদ্যুৎ অফিসে অবস্থান করতে। অনেকে তাদেরকে দালাল বলেও আখ্যায়িত করে থাকেন। তবে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ শুনে তাৎক্ষনিক সমস্যার সমাধান দিয়েছেন ডিপিডিসির চেয়ারম্যান ও এমডি। এছাড়া যেসকল কর্মকর্তা ও কর্মচারী গ্রাহকদের দুর্ভোগের সৃষ্টি করছেন তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তারা।

জানা গেছে, শহরের কিল্লারপুলে ডিপিডিসির প্রধান প্রকৌশলী এনওসিএস (সাউথ) এর দফতরে ১২টি এনওসিএস (জোন) নিয়ে দু’দিন ব্যাপী গণশুনানীর আয়োজন করে ডিপিডিসি। এর মধ্যে সোমবার সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পূর্ব ও পশ্চিম, সিদ্ধিরগঞ্জ, ডেমরা, কাজলা ও মানিকনগর এনওসিএস বিভাগের গ্রাহকগণ এবং কর্মকর্তাবৃন্দদের নিয়ে গণশুনানী অনুষ্ঠিত হয়। তবে ডিপিডিসি গণশুনানীর আয়োজন করলেও অনুষ্ঠানস্থলে বেশীরভাগই উপস্থিত ছিলেন ডিপিডিসির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অনুগত কিছু লোকজন। যাদেরকে অনেকেই দালাল হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। যাদের অনেককেই আনা হয়েছিল স্ব স্ব জোনের কর্মকর্তাদের গুনগান গাইতে। যেমন সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে আনোয়ার হোসেন, মোবাশের, রমিজউদ্দিন ও ফিরোজুর রহমানকে আনা হয়েছিল শুধুমাত্র ধন্যবাদ জানাতে। একইভাবে পূর্ব ও পশ্চিমের ইরফান উদ্দিন ইপু, সুফিয়ানকে আনা হয়েছিল ধন্যবাদ জানাতে।

মানিকনগর ও কাজলা এলাকায় যাদের বিদ্যুৎ সংযোগের ফাইল সম্পূর্ণরূপে কমপ্লিট হয়ে গিয়েছিলেন তাদেরকে আনা হয়েছিল আইওয়াশ হিসেবে। গণশুনানীর বিষয়ে ওই ১২টি এনওসিএস এলাকায় মাইকিং করার কথা থাকলেও বেশীরভাগ এলাকাতেই কোন মাইকিং করা হয়নি। এ বিষয়ে অনুষ্ঠানস্থলেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দৈনিক আমাদের সময়ের নিজস্ব প্রতিবেদক লুৎফর রহমান কাকন। তিনি অনুষ্ঠানস্থলে বলেন, মাইকিং করা হয়নি। এখানে যদি আরো ভুক্তভোগী গ্রাহকরা আসতে পারতো তাহলে অনুষ্ঠানটি ফলপ্রসু হতো। ডিপিডিসির সচিব মুনীর চৌধুরী যদি একাই ৬০০ কোটি টাকা আদায় করতে পারেন তাহলে ডিপিডিসির উর্ধ্বতনরা সবাই যদি তাদের সহযোগিতা করেন তাহলে আরো বেশী বকেয়া আদায় করা সম্ভব হবে এবং বিদ্যুতের চুরি বন্ধ হবে। বিভিন্ন ব্যাংক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে সুবিধা দিয়ে অনেক কর্মকর্তা অর্থ হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনও অভিযোগ রয়েছে একবছর ঘোরার পরে ফাইল মিসিং হয়ে যায়।

যমুনা ফার্টিলাইজারের অবসরপ্রাপ্ত চাকুরীজীবী জুলহাসউদ্দিন বলেন, সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে দালালে ভরা দেখেছি। সিদ্ধিরগঞ্জের ৮ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রুহুল আমিন মোল্লা বলেন, বিদ্যুতের খুটি ও তারের এমন অবস্থা যা দেখলে আপনারাই লজ্জায় পড়ে যাবেন। গত দুই বছরে একাধিকবার নির্বাহী প্রকৌশলীকে অভিযোগ জানানোর পরেও তিনি যাননি। গণশুনানীর অনুষ্ঠান সামনে হওয়ায় তিনি কয়েকদিন আগে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন। ওয়ান ব্যাংকের কর্মকর্তা এনামুল হক জানান, বাবা মারা যাওয়ার পরে বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে আমার বিরল অভিজ্ঞতা হয়েছে। মিটার নষ্ট থাকার কথা বলে আমাকে একাধিকবার একই ইউনিটের বিল দেয়া হয়েছে। পরে মিটারটি বদলাতে হয়েছে যদিও আমার মিটারটি নষ্ট ছিলনা। দৈনিক ইয়াদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ব্যাটারীচালিত অটোরিকশা যদি অবৈধ হয় তাহলে তারা কিভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ পাচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নাফিজ আশরাফ বলেন, ব্যাটারী চালিত অটোরিকশার গ্যারেজে কিভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়। ফুটপাতে শত শত সংযোগ কিভাবে দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে অনেক সংযোগ সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া। অনেক সড়কে বিদ্যুতের খুটি লাগানো হয়নি। পূর্ব জোনের ভুক্তভোগী গ্রাহক আমেনা খাতুন জানান, তার বিদ্যুৎ বিল বেশী আসে। পশ্চিম জোনের ভুক্তভোগী গ্রাহক মনির হোসেন জানান, ৮ মাস পূর্বে তার মিটার জ¦লে যায়। কিন্তু অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাননি। রোকসানা পারভীন নামের একটি বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক জানান, তিনি ৬ মাস আগে সংযোগ নিলেও বিল পাননি।

তার স্বামী খোঁজ নিতে এসে জানতে পারেন তার নামে ১৭০০ ইউনিট বিল করা হয়েছে। অথচ মিটারে রয়েছে মাত্র ৭০০ ইউনিট। বিকেএমইএ’র সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যারা বিদ্যুৎ চুরির সঙ্গে জড়িত বিকেএমইএ ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি তাদের পক্ষে নেই। গণশুনানী পাবলিককে দেখানোর জন্য করা হয়। সিস্টেম লস এর নামে যে চুরি সেটা বন্ধ করা প্রয়োজন। আমাদের সেক্টরে যারা নিয়মিত বিল দেয়না এমন প্রতিষ্ঠানের তালিকা আমাদের কাছে দিলে আমরা পদক্ষেপ নিব। কিন্তু আমাদেরকে অবহিত না করা কারখানার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলে সেটাতে বিশাল ক্ষতি হয়ে যায়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ডিপিডিসির প্রধান প্রকৌশলী এনওসিএস (সাউথ) একরামুল হক বলেন, আপনারা তৃতীয় পক্ষের কাছে যাবেন না। সরাসরি আমাদের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলবেন। আমাদের অফিসগুলোতে কিছুটা সমস্যা এখনো আছে। তবে আগের থেকে ভোগান্তি অনেক কমেছে। অনুষ্ঠানটির আয়োজনের পূর্বে তারা ১২টি এনওসিএস এলাকাতে মাইকিং করেছেন। এছাড়া একটি জাতীয় ও কয়েকটি স্থানীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন।

ডিপিডিসির এমডি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) নজরুল হাসান বলেন, আমরা প্রতিবছরেই একবার গণশুনানীর আয়োজন করে থাকি। এছাড়া আমরা গ্রাহকদের সমস্যা শুনতে প্রতিদিনই অফিসে থাকি। আমাদের আরো অনেক দূর যেতে হবে। আমরা এখনো গ্রাহকদের মানসম্মত সেবা দিতে পারিনি। গ্রাহকদের কিছু অভিযোগ রয়েই গেছে। আগামীতে আমরা প্রযুক্তি নির্ভর সেবা দেয়ার চেষ্টা করবো। অভিযোগগুলো গ্রাহকের কাছ থেকে অনলাইন সিস্টেমে নিব। তিনি বলেন, ডিপিডিসির সেবার মান উন্নয়ন ৮০ মিলিয়ন ইউএস ডলার ব্যায়ে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম আগামী জুলাইয়ে শুরু হবে। প্রকল্পগুলো শেষ হতে দেড় বছর সময় লাগবে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জে দু’টি গ্রীড স্টেশন হবে যার একটি প বটি ও ১টি চরসৈয়দপুরে স্থাপিত হবে যা ১৩২ কেভি ক্ষমতাসম্পন্ন। ইতিপূর্বে নারায়ণগঞ্জ যেমন ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল তেমনভাবে আবার নারায়ণগঞ্জকে ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে আমরা দেখতে চাই। নতুন সংযোগ পেতে গ্রাহকদের আর কোন সমস্যা হবেনা। তিনি যেসকল গ্রাহকদের অভিযোগ রয়েছে তা মঙ্গলবারের মধ্যে সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ডিপিডিসির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান তাপস কুমার রায় বলেন, আজকের এই গণশুনানীর অনুষ্ঠানটি ছিল ব্যাতিক্রমধর্মী ও সাহসী। এটি গতানুগতিকের বাহিরে ছিল। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য পরীক্ষাও বটে। আমরা ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছি। ডিপিডিসির যে মূল উদ্দেশ্য গ্রাহকদের হাসি ফোটাতে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। আগে গ্রাহকদের বিল দিতে লম্বা লাইন ধরতে হতো এখন তারা অনলাইন ও মোবাইলের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করতে পারেন। অনলাইনে আবেদন করে সেটা ট্রাকিংও করতে পারেন। মিটার রিডারদের দ্বারা ভোগান্তি কমাতে পশট রিডিং চালু করতে যাচ্ছি। ভবিষ্যতে ডিপিডিসির কার্যক্রম দেখতে বিদেশীরাও আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) এটিএম হারুনুর রশিদ, নির্বাহী পরিচালক (প্রকৌশল) রমিউদ্দিন সরকার, নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) গোলাম মোস্তফাসহ বিভিন্ন এনওসিএস এর নির্বাহী প্রকৌশলীগণ।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts