November 20, 2018

ডলারের বিপরীতে টাকার মান এখন কত?

টাকার মান কমছে

স্টাফ রিপোর্টার: টাকার মান কমছে। কিছুদিন আগেও পাওয়া গেছে ৭৭ টাকা এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে। বর্তমানে তা ৮০ টাকা ছাড়িয়েছে। গত ১৫ দিন ধরে প্রতিদিনই ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমছে। খোলাবাজারে ডলারের দর উঠেছে ৮৩ টাকা পর্যন্ত। প্রায় ৯ মাস ৭৭ টাকা ৮০ পয়সায় স্থির থাকার পর ডলারের দাম একটু বাড়তে শুরু করে। আর এখন প্রতিদিনই কমছে টাকার মান। এর আগে কখনও বাড়ে কখনও কমে। তবে প্রায় তিন বছর ধরে ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী ছিল টাকা। গত কয়েক দিন ধরে টাকার দর পড়তে শুরু করে। বিপরীতে বাড়ছে ডলারের দাম। এদিকে ডলার শক্তিশালী হওয়ায় স্বস্তিতে আছেন রপ্তানিকারকরা। রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগী অনেক দেশে সামপ্রতিক সময়ে স্থানীয় মুদ্রার বিপরীতে ডলারের দর অনেক বেড়েছে।

স্থানীয় মুদ্রার দর কমলে রপ্তানিকারকরা লাভবান হন। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে এক ব্যাংক অন্য ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কিনেছে গড়ে ৮০ টাকা ১৫ পয়সা দরে। ১লা থেকে ২০শে অক্টোবর পর্যন্ত আন্তঃব্যাংকে গড়ে ৭৭ টাকা ৮০ পয়সা দরে ডলার কেনাবেচা হয়। তবে এরপর থেকে সামান্য দর বেড়ে ২৯শে অক্টোবর দর উঠে ৭৮ টাকা ৩ পয়সা। এরপর থেকে দর বাড়ছে ডলারের। ব্যাংকগুলো এখন নগদ ডলার কিনেছে ৭৯ থেকে ৮০ টাকা ৫০ পয়সা দরে। বিক্রি করছে ৮১ থেকে ৮৩ টাকা ১০ পয়সায়। আন্তঃব্যাংক ও নগদ কেনাবেচার পাশাপাশি রপ্তানিকারক ও রেমিট্যান্সের গ্রাহকরা এখন বেশি দর পাচ্ছেন। আবার আমদানি করতে ব্যয় কিছুটা বেড়েছে।

গত সেপ্টেম্বরে চীন তার মুদ্রা ইউয়ানের ৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন করে। বাংলাদেশের আরেক প্রতিযোগী ভিয়েতনাম গত আগস্ট মাসে তৃতীয়বারের মতো তার মুদ্রার নিম্ন্নমুখী দর নির্ধারণ করে। ভারতের বিনিময় হার ব্যবস্থা বাজারভিত্তিক। বাংলাদেশের প্রতিযোগী এই দেশেও গত এক বছরে ৫ শতাংশের বেশি দরপতন হয়েছে স্থানীয় মুদ্রা রুপির।

এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদি বলেন, প্রায় তিন বছর ধরে ডলারের বিপরীতে টাকা শক্তিশালী ছিল। একই সময়ে বাংলাদেশের প্রতিযোগী বেশির ভাগ দেশের মুদ্রার দরপতন ঘটানো হয়েছে। প্রতিযোগী দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জ্বালানি তেলের দাম কমালেও বাংলাদেশে এখনও কমেনি। এসব কারণে প্রতিযোগিতায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছি। এখন টাকার বিপরীতে ডলার শক্তিশালী হওয়াটা রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য স্বস্তির বিষয়। এতে করে রপ্তানিকারকদের সক্ষমতা বাড়বে।

বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, ইএবিসহ রপ্তানিকারকদের সংগঠনগুলো অনেকদিন ধরে বলছে, প্রতিযোগী দেশগুলোর রপ্তানিকারকরা বিনিময় হারজনিত বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। ফলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এমন কোন পদক্ষেপ আশা করে, যাতে টাকা দর হারায়। প্রয়োজনে রপ্তানিকারকদের জন্য আলাদা দর নির্ধারণ করে দেয়ারও দাবি জানায় এ খাতের ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংক তরফে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক। ডলারের দর যেটুকু বেড়েছে তা বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের কারণে। বাংলাদেশে বিনিময় হার ভাসমান বা ফ্লাটিং হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিস্থিতি বুঝে বাজার থেকে ডলার কেনে বা বিক্রি করে। কিছুদিন আগেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করেছে ব্যাংকগুলো। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে আর কেউ ডলার বিক্রির প্রস্তাব দিচ্ছে না।

বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদা) চেয়ারম্যান ও বেসরকারি খাতের মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার জোগান পর্যাপ্ত রয়েছে। তবে বড় কোন পরিশোধের কারণে হয়তো হঠাৎ করে ডলারের দর বাড়ছে। তার ধারণা, বেসরকারি খাতে বিভিন্ন সময়ে বিদেশ থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধ সমপ্রতি বেড়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন বড় প্রকল্পে বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে গিয়ে এমন হতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় জানা যায়, ২০১২ সালে ডলারের দর বাড়তে বাড়তে একপর্যায়ে ৮৫ টাকায় উঠেছিল। তখন এক ডলার কিনতে ৮৫ টাকা লাগত। গত তিন বছরে সে ডলারের দর পড়তে পড়তে গত বছরের আগস্টে ৭৭ টাকা ৪০ পয়সায় নেমে এসেছিল। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে প্রতি ডলার ৭৭ টাকা ৮০ পয়সায় স্থির ছিল। অর্থনীতিবিদরা ডলার কেনার সমালোচনা করলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাতে সাড়া দেয়নি। এখন সে অবস্থান থেকে সরে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দুই সপ্তাহ ধরে বাজার থেকে কোন ডলার কিনছে না তারা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, এখন আর কেউ ডলার বিক্রি করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসছে না। সর্বশেষ গত ১৩ই অক্টোবর ডলার কিনে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোট ১৭৫ কোটি ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সবমিলিয়ে ৩৪০ কোটি ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তার আগের বছরে (২০১৩-১৪) কেনা হয় ৫১৫ কোটি ডলার। ২০০৩ সালে বাংলাদেশে ভাসমান মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা (ফ্লোটিং) চালু হয়। অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা বাজারের উপর ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে টাকা-ডলারের বিনিময় হারে হস্তক্ষেপ করেছে।

গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি

Related posts