November 15, 2018

ট্রাম্পের বক্তব্যে হতভম্ব হয়েছি—ফরিদ জাকারিয়া

ফরিদ জাকারিয়া

আমি নিজেকে প্রথম এবং সবার আগে একজন আমেরিকান মনে করি। এই পরিচয়ে আমি গর্বিত, কারণ একজন অভিবাসী হিসেবে দৃঢ় প্রত্যয় ও কঠিন কাজ বা কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে দুর্ঘটনাক্রমে জন্ম নিয়ে নয়, আমি এই গৌরব করার মতো পর্যায়ে পৌঁছেছি। আমি নিজেকে ভারত থেকে আসা একজন স্বামী, পিতা, একজন সাংবাদিক ও একজন নিউ ইয়র্কার এবং (আমার ভালো দিনগুলোতে) একজন বুদ্ধিজীবী মনে করি। কিন্তু আজকের বিদ্যমান রাজনৈতিক অবস্থায় অপর একটি পরিচয় নিয়ে আমি অবশ্যই বিব্রত। আমি একজন মুসলিম।

আমি মুসলিম হলেও ধর্মকর্ম তেমন একটা পালন করি না (প্র্যাকটিসিং মুসলিম নই)। পর্যটক ছাড়া সর্বশেষ এক দশক আগে আমি একটি মসজিদে গিয়েছিলাম। আমার স্ত্রী খ্রিষ্টান। আমরা আমাদের সন্তানদের মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলিনি। ঈমান বা বিশ্বাসের ব্যাপারে আমার অভিমত জটিল- কোনো কোনো ক্ষেত্রে যারা কোনো ধর্ম মানে না, কিন্তু ঈশ্বরবাদী এবং যারা অজ্ঞবাদী- এ দুইয়ের মাঝামাঝি আমার অবস্থান। আমার দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী আমি সম্পূর্ণ সেকুলার। কিন্তু রিপাবলিকান দলীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী যেভাবে আমেরিকানদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করছেন। তাতে আমি উপলব্ধি করলাম যে, আমি যে ধর্মীয় সম্প্রদায়ে জন্ম নিয়েছি, সেটা স্বীকার করা গুরুত্বপূর্ণ এবং যদিও ওই পরিচিতি আমাকে অথবা আমার মতামতকে পরিপূর্ণভাবে প্রতিনিধিত্ব করে না। তবুও ডোনাল্ড ট্র্যাম্পের গোঁড়ামিপূর্ণ বক্তব্যে আমি আতঙ্কিত। আমি একজন মুসলিম হিসেবে নই, আমি একজন আমেরিকান হিসেবে তার বক্তব্যে আতঙ্ক বোধ করছি।

ভিক্টর ক্লেমপেরের ১৯৩০-এর দশকের ডায়েরি থেকে জানা যায়, ডায়েরিতে তিনি কিভাবে একজন সেকুলার, সম্পূর্ণভাবে অঙ্গীভূত জার্মান ইহুদি এবং হিটলারকে যে ঘৃণা করতেন, তা তিনি ডায়েরিতে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনি মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করেন, একজন জার্মান হিসেবেই তিনি তা করেছিলেন। তাকে তার জার্মান পরিচিতিই নাৎসিবাদকে হাস্যকর অনুকরণ হিসেবে দেখতে সাহায্য করে। অবশেষে হায়, তাকে কেবল একজন ইহুদি হিসেবে দেখা হয়। এটা হচ্ছে ট্রাম্পের বাগাড়ম্বরের সত্যিকার বিপদ। যেসব লোক নিজেদের সমাজের মূল স্রোতের সাথে অঙ্গীভূত করে নিতে চায়, যারা নিজেদের নানা ধরনের বা বিভিন্নভাবে পরিচয় দিতে চায়, তাদেরকে একটি বাক্সে আবদ্ধ করে ফেলা হচ্ছে। তার বাগাড়ম্বর ইতোমধ্যে পরিস্থিতিকে বিষাক্ত করে ফেলেছে। মুসলিম আমেরিকান অধিকতর ভয়ভীতির মধ্যে রয়েছেন এবং তারা নিজেদের আরো বিচ্ছিন্ন করে ফেলবেন। বৃহত্তর সম্প্রদায় তাদের সম্পর্কে বেশি জানবে না এবং তাদেরকে বিশ্বাসও করবে কম।

ট্র্যাজেডি হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভালোভাবে অঙ্গীভূত বা আত্তীকরণ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি ইউরোপের মতো নয়। আমি গত বছর নরওয়েতে মরক্কোর একজন অভিবাসীর সাথে যে কথা বলেছিলাম, এ মুহূর্তে তা স্মরণ করতে চাই। নিউ ইয়র্কে ওই অভিবাসীর একজন ভাই থাকেন। আমি তাকে তাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে কোনো ভিন্নতা আছে কি না জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘এখানে আমি সব সময় একজন মুসলিম অথবা একজন মরক্কোবাসী বা মরক্কোর নাগরিক থাকব, কিন্তু আমার ভাই ইতোমধ্যেই একজন আমেরিকান হয়ে গেছেন।’

পররাষ্ট্রবিষয়ক এক রচনায় ব্রিটিশ লেখক কেনান মালিক উল্লেখ করেন, ফ্রান্সে ১৯৬০ ও ’৭০-এর দশকে উত্তর আফ্রিকা থেকে আগত অভিবাসীদের মুসলিম হিসেবে দেখা হতো না বা মুসলিম বলে ডাকা হতো না। তাদেরকে উত্তর আফ্রিকান বা আরব হিসেবে বর্ণনা করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ওটা পরিবর্তন হয়ে গেছে। তিনি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার কথা উল্লেখ করেন। যিনি বলেছেন, ‘বর্তমান ফ্রান্সে ধার্মিক আলজেরীয় অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক, আমার মতো নাস্তিক ফরাসি-মৌরিতারিয়ান পরিচালক, ফুলানি সুফি ব্যাংক কর্মচারী, যিনি মান্টেস ইয়া-জুলি থেকে এসেছেন। বারগুন্ডি থেকে আগত সমাজকর্মী যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং অজ্ঞাবাদী পুরুষ নার্স যিনি কখনো তার পূর্বপুরুষের বাড়ি ওয়োজদাতে পা রাখেননি সবাই একত্রে মিলেছে। কি তাদেরকে একত্র করেছে? তার জবাব হচ্ছে : ‘আমরা এমন একটি সমাজে বসবাস করি, যারা আমাদেরকে মুসলিম বলে মনে করে।’

আপনি যদি একবার জাতিগোষ্ঠী এবং ধর্মের ভিত্তিতে সব মানুষকে পরিচয় করাতে শুরু করেন, তাহলে গোটা বা সম্পূর্ণ গ্রুপকেই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হবে এবং এতে করে উত্তেজনা সৃষ্টি হবে।

মুসলিম আমেরিকান সৈন্যদের তীব্র খোঁচা দিয়ে লেখা এক নিবন্ধে বসনিয়া থেকে আসা উদ্বাস্তু ও মেরিন গোলন্দাজ সার্জেন্ট ইমির হাজদিক, যিনি ১৯৯০-এর দশকে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে যে বলকান যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তা ব্যাখ্যা করেন।

জনাব হাজদিক বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প যা বলেছেন তা খুবই আতঙ্কিত করার মতো বিষয়। তিনি বলেন, ‘আমি জানি কোনো ব্যক্তি যখন তার প্রতিবেশী ও বন্ধুদের মধ্যে বিশ্বাস ভঙ্গের জন্য প্রচেষ্টা চালায় তখন কী হয় আমি দেখেছি। তাদের প্রত্যেকেই একে অন্যের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন।’

আমি আশাবাদী ট্রাম্প- দেশকে বিস্ময়ের দিকে নিয়ে গেছেন। জনগণ আদৌ জানে না তার এই অস্পষ্ট ও অকার্যকর প্রস্তাবে কিভাবে তারা সাড়া দেবে (আমাদেরকে কিছু করতে হবে)। টেলিফোনে নেয়া পরিসংখ্যান, রহস্যময়- কৌশলী ও পরোক্ষ ইঙ্গিতপূর্ণ ষড়যন্ত্র (তিনি প্রেসিডেন্ট ওবামা সম্পর্কে কী বলেছেন আমরা জানি না)। এবং জনগণের কুসংস্কার বা পক্ষপাতের প্রতি নগ্ন আবেদন ইত্যাদির ব্যাপারে আমাদেরকে কিছু করতে হবে।

এখন কিন্তু ১৯৩০-এর দশক নয়। সব পর্যায় থেকে মানুষ ট্রাম্পের বক্তব্যের বিরুদ্ধে নিন্দা জানাচ্ছে। রিপাবলিকান প্রার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ তার বক্তব্য সমর্থন করলেও সর্বপর্যায়ের মানুষ তার নিন্দা করেছে।

দেশ ভীতসন্ত্রস্ত থাকতে পারে না। এমনকি ১৪ বছর আগের ৯/১১-এ আমেরিকায় ইসলামি সন্ত্রাসীরা হামলা চালানোর পর সান বারনার দিনোতে ৪৫ জনকে হত্যা করা হয়। প্রতি বছর গড়ে প্রায় তিনজন লোক। চলতি বছরই গুলি করে শুধু যে লোক হত্যা করা হয়েছে, তার সংখ্যা হবে পায় ১১ হাজার।

পরিশেষে বলতে চাই, যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক নেতার এই ভীতিকর বক্তব্য অতীতের মতোই প্রত্যাখ্যান করবে। তবে আমরা রাজনৈতিক ও নৈতিক চরিত্রের ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছি। আমি আশা করি, কয়েক দশক আগের জনগণ এখানকার জনগণের দিকে ফিরে তাকাবে এবং জিজ্ঞেস করবে, ‘ট্র্যাম্প যখন আমেরিকায় ধর্ম নিয়ে পরীক্ষা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন আপনারা কী করেছিলেন?

ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার( নয়া দিগন্ত )
দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts