September 20, 2018

ট্রাফিক মামা!!


মেহেদী হাসান উজ্জল,
দিনাজপুর প্রতিনিধিঃ
সাদা রঙ্গের হেলমেটটা মাথা থেকে খুলে দাঁত মুখ খিকিয়ে বার কয়েক টাক মাথাটা চুলকিয়ে নিলো করিম। চন্চনা রোদ। চৈত্র মাসের ভর দুপুর রাস্তায় সে রকম যানজট নেই তাই করিম মাথা চুলকাতে চুলকাতে সুন্দরদার মিষ্টির দোকানে গিয়ে আরাম করে বসে বসে সিগারেট জ্বালালো। সাত বছর গড়িয়ে দিয়েছে এই ট্রাফিকের চাকুরীতে। এই সাত বছরে পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, দিনাজপুর দেখেছে আরো যে কত জায়গা দেখবে তার নাই ঠিক। পাবলিককে লাঠি দিয়ে মারা কিংবা পাবলিকের সাথে সংঘর্ষ তার মোটেই পছন্দ নয়। তাই পুলিশের চাকুরী করতে এসে ট্রাফিকের পোষ্টটা মন্দ নয়। এখানে পিটাপিটির ভাগটা খুবই কম পরে, আর শান্তিতে চাকুরী করে জীবন কাটানো যায়।

সেই দিন ছিল কিসের প্রতিবাদ দিবস। বেলা এগারোটার দিকে রাজনৈতিক দলের ছেলেরা তাকে ট্রাফিক পোষ্টের উপর থেকে জোর করে নামিয়ে দিয়ে সেকানে দাঁড়িয়ে তারা আরাম্ভ করলো ভাষণ। করিম রাস্তার পাশে পানের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তারা আরাম্ভ করলো ভাষন। করিম রাস্তার পাশে পানের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাষণ শুনছে। আর মাঝে মাঝে হেলমেট খুলে টাকা মাথাটা চুলকিয়ে নিচ্ছে। দলের ছেলেরা ভাষণের মধ্যে পুলিশের বিরুদ্ধে কিছু উত্তেজনাপূর্ণ কথা বলতেই দাঁড়িয়ে থাকা কিছু স্রোতারা খুব গম্ভীর চোখে করিমের দিকে কাতালো।

গনরোষে পরতে পারে করিম। টাকা মাথা চুলকিয়ে হেলমেটটা মাথায় বসিয়ে সোজা চলে গেল সুন্দরদার মিষ্টির দোকানের রান্না ঘরে। জায়গাটা বেশ নিরাপদ একানে তাকে কেউ দেখতে পাবেনা, মনে মনে করিম ভাবছে‘যত পারিস পুলিশকে গালিদে তোরা না গেলে আমি আর বাহির হচ্ছি না’। ঐ দিকে রাস্তার জটের সৃষ্টি হয়েছে। এতে করিমের তো কোন দোষ নেই পথ সভার জন্য জট। করিম হাতে একটা গোল্ডলিপ সিগারেট নিয়ে তাতে আগুন দিয়ে টুলের উপর বসে বসে সুখ টান দিচ্ছে আর ভাবছে যে বটতলা মোড় থেকে কতক্ষণে এ ঝামেলা শেষ হবে।

দুম! বিকট একটা শব্দে এলাকা কেঁপে উঠলো। ভাষণ বন্ধ। চারিদিকে লোক জনের ছুটোছুনি। ঘর ঘর শব্দে আশেপাশের দোকানে সাটার গেট মুহুর্তের মধ্যে বন্ধ। সুন্দরদা তার মিষ্টির দোকানের সার্টার গেট অর্ধেক নামিয়ে মাথা বের করে অনেকটা শেয়াল পন্ডিতের মত মাথা বের করে বোঝার চেষ্টা করছেন যে বোমটা কে ফাটালো আর কোন দিকে ফাটলো। ঐ দিকে করিম মিষ্টি তৈরী করার রান্নাঘরে অস্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরের খবর নেবার জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যে এক ভ্যান লাঠি ও ঢাল ওয়ালা পুলিশ বাঁশি বাজাতে বাজাতে ভ্যান থেকে লাফিয়ে পড়ে মোড়টা দখল করে নিলো। পুলিশ দেখে পাবলিক শূন্য মোড়টা আরো ভংকর রূপ ধারণ করে নিয়েছে। ঘটনার বিরবণ জানার জন্য ওসি সাহেব একজনকেও না পেয়ে হাবিলদার দীন মোহাম্মদকে জোরে একটা ধমক দিয়ে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলো। এই মোড়ের ট্রাফিক কই?

এই নিয়ে বেশ হৈ চৈ শুরু হয়ে গেছে পুলিশদের মধ্যে। ওসি সাহেবের প্রশ্নের জবাব হালিদার দিতে পারছেনা। হাবিলদার তখন অন্যান্য পুলিশদের ধমক দিয়ে তাড়াতাড়ি ট্রাফিককে খুজে আনার জন্য বললো। শুরু হলো ট্রাফিক খুজার অভিযান। এরি মধ্যে ওয়ারলেস এর মাধ্যমে ইন্সপেক্টর হাবিব খবর নিয়ে জানলেন যে, এই মোড়ে করিমের ডিউটি ছিলো। এখন সব পুলিশের একটিই প্রশ্ন ‘করিম গেল কই’? চারিদিকে করিম-করিম শব্দটা বেশ জোরে সোরে উচ্চারণ হচ্ছে। শব্দটা সুন্দরদার কানে এসেছে। সুন্দরদা তাড়াতাড়ি করে পেছনের রান্না ঘরে গিয়ে করিমকে জানালেন। আর যায় কোথায়। শুরু হলো করিমের হাটু কাঁপুনি আর মাঝে মাঝে চুল শূন্য টাক চুলকানি। নির্ঘাৎ এবার চাকুরী যাবে। জনগণের বিপদের সময় ট্রাফিক পালিয়ে গেছে তাও আবার ওসি সাহেবের হাতে ধর খেয়েছে।

করিম এবার চাকুরী বাঁচানোর জন্য লাফ দিয়ে উঠে বাইরে যাবার জন্য দিলো দৌড় আর ওমনি পুড়া মবিলের টিনের সাথে ধাক্কা খেয়ে উল্টে পরলো মেঝের উপর। টিন উল্টে সমস্ত পুড়া মবিল করিমের গায়ে। সুন্দদার পিকাপ গাড়ীটার মবিল বদল করে ছিল গত রাতে থকন থেকে পুড়া মবিলগুলো ঐ টিনে করে রান্না ঘরের কোনে রাখা ছিল। এবার ক্যাশ কাউন্টার থেকে মামা দৌড়ে এল টিনের বিকট শব্দ শুনে। হঠাৎ করে করিমের ভূতের মত চেহারা দেখে ফাস্ট গিয়ারের একটা হাসি দিয়ে আবার ব্রেক। তারপর হাতের কাছে কিছু না পেয়ে গাড়ীর ইঞ্জিন মোছা নেকড়া দিয়ে করিমের হাত মুখ মুছিয়ে দিলো। যত মুছে নেকড়ার কালি ততই বেড়িয়ে করিমের চেহারাকে বিকট করে তোলে।

বাইলের পরিবেশ শান্ত পাবলিক একএক করে রাস্তায় বেডিয়েছে। সুন্দরদা সার্টার গেট খুলতেই করিম এক লাফে বাইরে গিয়ে ওসি সাহেবকে সেলুট দিলো। সবাই চমকে উঠলো এটা আবার কে? সমস্ত  ইউনিফর্ম কুচকুচে কালো। সাদা-সাদা চোখ আর দাত বেড়িয়ে আছে মনে হচ্ছে আফ্রিকা দেশের বিকট মানুষ। কাঁপতে কাঁপতে ওসি সাহেবের সামনে সেলুট দিয়ে বললো– ‘স্যার আমি করিম-মানে ট্রাফিক। এই মোড়ে আমার ডিউটি স্যার।’ তার চেহারা দেখে রাগে ওসি সাহেক কোন কথা না বলে হাবিলদারকে নির্দেশ দিলেন- ‘ওকে থানায় যেতে বলো।’

একটু পরে খবর পাওয়া গেল যে রাস্তায় সামনে রাখা ট্রাকের পেচনের চাকাটি হঠাৎ করে বিকট শব্দে ফেটে যায়। ওটা তারই শব্দ। বোমা ফাটার শব্দ নয়।

নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাষা

বাবুই পাখির বাসা গ্রাম গঞ্জের একটি ঐতিহ্যবাহী দৃশ্য। বাবুই পাখি নিয়ে কবি সাহিত্যীক অনেক গল্প লিখেছেন আরও লিখেছেন কবিতা।

তাল গাছের পাতার নিচের অংশে বাবুই পাখি বাসা তৈরী করে। বাবুই পাখিদের বাসা বানানোর নির্মাণ শৈলী, কারিগরী দক্ষতা দেখে আধুনিক যুগের প্রকৌশলীদের ভাবিয়ে তোলে। তাল পাতার ছেড়া তন্তু দিয়ে তারা বাসা বাঁধে। শুখ্য ভাবে ঠোঁট দিয়ে পাতা ছিরে এনে তা গাঁথুনী করে বাসা তৈরী করে তাই বাবুই পাখি একটি শিল্পী পাখি। বাঁতাসে দুললেও বাসা ভেঙ্গে পরে না। তাল পাতার বাসায় কোন ভাবেই জল ঢোকে না। বাসায় প্রবেশ ও বাহির হওয়ার জন্য রয়েছে একাধিক দরজা। বাবুই পাখির বাসার ভিতর আধুনিক যুগের মত লাইটের ব্যবস্থা আছে।

বাসার ভেতর একটু গোবর রাখা হয় তার ভেতর জোনাকি পোকার মাথাটি ঢুকিয়ে দেয়। ফলে জোনাকির আলোতে বাসা আলোকিত হয়ে উঠে।  এ এক অদ্ভুত দৃশ্য। অন্ধকার ঘরকে কিভাবে আলোকিত করতে হয় তা বাবুই পাখির ভালো ভাবে জানেন, বাবুই পাখি দেখতে অনেকটা চুড়ই পাখির মত দেখতে। তবে আকারে একটু বড়। এড়া ঝাঁক বেধে বসবাস করে, এরা খুব পরিশ্রমি পাখি।

কুমর পাড়ার গরুর গাড়ী, বোঝাই করা কলসি হাড়ি

কুমর পাড়ার গরুর গাড়ী, বোঝাই করা কলসি হাড়ি। গাড়ী চালায় বংশি বদল, সঙ্গে যে তার ভাগনে মদন-। কুমরদের জীবন নিয়ে “হাট নামে” একটি কবিতা লিখে গেছেন বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এখন গরুও নেই আর গরুর গাড়ীও নেই।

কোন এক সময় কুমরদের একটি চলমান জীবন ছিল। হাঁসি খুশি আদোর সোহাগে ভরপুর ছিল কুমারদের পারিবারিক জীবন মাটির হাড়ির কলস, ঘটি, বাটি, সানকি, ফুলের টপ তৈরী করতে দিনরাত ব্যস্ত থাকতো। বৌ ঝিরাও বসে থাকতো না তারাও পুরুষদের সাথে কাজ করতো। কিন্তু প্লাস্টিকে সামগ্রী আবিস্কার হওয়ার ফলে মাটির জিনিসের কদর আর নেই।  প্লাস্টিকের ঘটি, বালটি, বদনা, চালন আর সিলভারের হাড়ি কলস ঢাকনা বাজারে সয়লাব হওয়ায় মাটির হাড়ি পাতিল কেউ কিনে না। তাই কুমররা কর্মহিন হয়ে পরেছেন। বন্ধ হয়ে গেছে তাদের রুটি-রুজী। কুমর পরিবারে চলছে এখন হাহাকার। দুবেলা দু মুঠো আহার যোগার করতে পরছেন না তারা। দুঃখ কষ্ট আর অনাহার এখন তাদের নিত্য সঙ্গি।

দারুন যন্ত্রনা নিয়ে বেচে আছে এখন কুমর পরিবার। যাদের বয়স কম তারা অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। আর যাদের বয়স তারা ভিক্ষে করছেন অথবা কারও উপর নির্ভর করে বেচে আছেন। দিনাজপুর ১২শত কুমার পরিবার ছিল এখন ৫০টি পরিবারকেও খুজে পাওয়া যাবে না। তার মধ্যে দিনাজপুর শহরের ছিল ১০টি কুমর পরিবার কিন্তু এখন রয়েছে মাত্র ২টি। মৃৎ শিল্পে এখন কদর নেই সরকারের পক্ষ থেকেও কুমর পরিবারকে কোন সহায়তা প্রদান করা হয় না ফলে কুমর পরিবার এখন ধ্বংসের মুখোমুখি হয়ে দারিয়েছে।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি ৩ জুন ২০১৬

Related posts