November 15, 2018

টোকাই থেকে প্যানেল মেয়র!

ঢাকাঃ  পাথরঘাটা মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের সংক্ষিপ্ত নাম বিএফডিসি। এখানে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার বিভিন্ন জাতের মাছ বেচাকেনা হয়। এই বাজারে মাছ কুড়িয়েই আজ পাথরঘাটা পৌরসভার প্যানেল মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান সোহেল। এলাকায় এক সময় টোকাই হিসেবে অনেকেই তাকে আড়ালে ডাকতো। গত বৃহস্পতিবার বিভিন্ন মামলায় বরগুনা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে হাজিরা দিতে গেলে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়। দুপুর ২টায় মোস্তাফিজুর রহমান সোহেল জেলে যাওয়ার কথা ছড়িয়ে পড়লে পাথরঘাটায় জনমনে স্বস্তি ফিরে আসে। অনেকে মিষ্টিও বিতরণ করেছেন। তার বিরুদ্ধে পাথরঘাটা থানায় ১৩টি মামলা রয়েছে। গত পৌর নির্বাচনে সোহেলের আমলনামা পাথরঘাটা থানা থেকে নির্বাচন অফিসে জমা দেওয়া হয়। সেখান থেকে মামলার তথ্যটি পাওয়া গেছে। তা ছাড়া ১৩টি মামলার কথা ওসি এসএম জিয়াউল হক স্বীকার করেছেন।

পাথরঘাটা বিএফডিসি মাছ বাজারের পাইকার সমিতির সভাপতি সাফায়েত হোসেন জানান, পাথরঘাটা বিএফডিসি মাছ বাজারে ৭৪ আড়তদার ও ৫২ পাইকার রয়েছেন। সোহেলের একক আধিপত্যের কাছে জিম্মি সব আড়তদার ও পাইকার। সাফায়েত বলেন, মাছ কিনতে সোহেলকে সব পাইকার প্রতি মণে ৩শ’ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। এর প্রতিবাদ করলে শ্রমিকদের ঘাটে কাজ করতে দেয় না সোহেল। প্রতিদিন এই বাজার থেকে প্রায় ৫০ হাজার টাকা চাঁদা নিয়ে যায় সে। এ ছাড়া খাবার মাছ হিসেবে প্রতি আড়ত থেকে তার পছন্দ মতো দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার মাছ নিয়ে যায়। ইলিশ মৌসুমে আরও বেশি নেয়। মাছ দিয়ে প্রভাবশালীসহ প্রশাসন ও এমপিদের ম্যানেজ করে সে।

২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সোহেল ওরফে মৎস্য রাজা মাছ বাজারে টোকাই ছিলেন। সকালে ট্রলার থেকে মাছ নামানোর কাজ করতেন। এতে আড়তদাররা মণপ্রতি তাকে ২০ টাকা করে দিতেন। সারাদিনে মাছ কিনারে তুলে দুই থেকে আড়াইশ’ টাকা পেতেন। এ দিয়েই তার নিজের খোরাকি চালাতেন। পরে কক্সবাজারের মাছ ধরার ট্রলার মাছ বিক্রি করতে যখন পাথরঘাটায় আসে তখন তাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে মাদকের ব্যবসা শুরু করেন। এতে রাতারাতি অনেক টাকার মালিক হয়ে যান। ২০০৯ সালে সংসদ নির্বাচনের পর বিশিষ্ট শিল্পপতি গোলাম সবুর টুলু এমপি নির্বাচিত হলে তার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি করে এমপির প্রভাব খাটিয়ে ২০১০ সালে মাছ ঘাটের শ্রমিক নেতা হিসেবে সংগঠনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিএফডিসি মৎস্য ঘাট শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর থেকে তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তার মৎস্য সংগঠনের কিছু লোক নিয়ে এখন পর্যন্ত তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।

পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য জালাল আহম্মেদ পঞ্চাইত জানান, সোহেল গত ৫ বছরে চাঁদাবাজি করে ৩ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার একটি টিনশেড বিল্ডিং নির্মাণে কোটি টাকার বেশি খরচ করেছেন। ৬ হাজার স্কয়ার ফুট চারতলা বিল্ডিংয়ের কাজ চলছে। জালাল জানান, বিএফডিসি মাছ বাজারের পাশে রফিকুল ইসলাম নামের এক প্রবাসীর জায়গা দখল করে সোহেল তার আস্তানা তৈরি করেছেন। সেখানে বসে তার সব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালান। পুলিশ তার আস্তানা থেকে কয়েকবার অপহৃত নারীদের উদ্ধার করেছে। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর পাথরঘাটা পৌরসভার প্রথম ধাপের নির্বাচনে সোহেল পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এরপরই প্যানেল মেয়র হিসেবে তাকে সম্মানিত করা হয়।

উপজেলার কালমেঘা ইউনিয়নের লাকুরতলা গ্রামের মেয়ে পাথরঘাটা আদর্শ বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর এক ছাত্রী গত বৃহস্পতিবার পাথরঘাটা প্রেস ক্লাবে সোহেলের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে। এ সময় সে বলে, ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর সে স্কুল থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে থানা থেকে ২শ’ গজ দূরে ডিগ্রাজ ব্রিজের কাছ থেকে তাকে ধরে নিয়ে সোহেলের ভাই বেল্লালসহ কয়েকজন তিন দিন আটকে রেখে ধর্ষণ করে। তিন দিন পর পাথরঘাটা থানার ওসি ওই ছাত্রীকে সোহেলের আস্তানা থেকে উদ্ধার করেন। এ ব্যাপারে থানায় মামলা হলে ওই মামলা উঠিয়ে নেওয়ার জন্য তার মাকে মেরে ফেলার জন্য বারবার হুমকি দেয়। পরে মামলাটি বাদী না উঠালে ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর ওই ছাত্রীকে দ্বিতীয়বার তুলে এনে ধর্ষণ করে। প্রথম মামলায় থানায় টাকা দিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা চাপিয়ে রাখলেও পরের ঘটনার মামলায় সোহেলের বিরুদ্ধে বরগুনার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাকে সশরীরে কোর্টে হাজির করার নির্দেশ দেন। বৃহস্পতিবার ওই মামলায় কোর্টে আত্মসমর্পণ করলে সোহেলকে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

উপজেলা চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রিপন জানান, সোহেল কোনো দলের নয়। তবে প্রয়াত এমপি গোলাম সবুর টুলুর সরলতার সুযোগ নিয়ে সোহেল বেপরোয়াভাবে জলদস্যুদের দালালি করে বেশ টাকার মালিক হয়েছেন। ওসি এসএম জিয়াউল হক জানান, কয়েকদিন ধরে সোহেলকে ধরার জন্য অনেক জায়গায় অভিযান চালানো হয়। এ কারণে তিনি কোর্টে আত্মসমর্পণ করেছেন। সোহেলের বাবা মৎস্য আড়তদার নুরুল আমিন বলেন, সোহেল তার কথা শোনে না। এ ব্যাপারে তার কাছে কোনো কিছু জানতে না চাওয়াই ভালো।

উৎসঃ সমকাল

Related posts