September 20, 2018

ঝিনাইদহে প্রকাশ্যে সংঘর্ষ আর গোপনে নৌকায় সিল !

জাহিদুর রহমান তারিক,ঝিনাইদহঃ  ঝিনাইদহের চারটি পৌরসভার নির্বাচনে কিছু বিচ্ছন্ন ঘটনা ছাড়া শান্তিপুর্ন ভাবে ভোট গ্রহন শেষ হয়। প্রতিটি কেন্দ্রে ব্যাপক নিরাপত্তা নেওয়া হয়। কেন্দ্রে কেন্দ্রে র‌্যাব পুলিশ, বিজিবি টহল দেয়। এছাড়াও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালিত হয়। তবে ঝিনাইদহের শৈলকুপা, হিরণাকুন্ডু ও কোটচাঁদপুরের কয়েকটি সেন্টারে প্রকাশ্যে নৌকার ভোট আর গোপনে কাউন্সিলর প্রার্থীর ভোট দিতে দেখা যায় ভোটারদের। সরেজমিন ঝিনাইদহের শৈলকুপা, হিরণাকুন্ডু ও কোটচাঁদপুরের কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন করে এ দৃশ্য দেখা গেছে।

আর এভাবেই ঝিনাইদহে পোলিং এজেন্ট শুন্য, প্রকাশ্যে ব্যালট পেপারে সিল মারা ও সরকারীদলের প্রভাব বিস্তারের মধ্য দিয়ে ঝিনাইদহে নির্বাচন সম্পন্ন হয়। বেলা ৩টার দিকে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় বিএনপির প্রার্থী খলিলুর রহমান ১৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩টি কেন্দ্রে ভোট স্থগিত করে পুন:রায় ভোট গ্রহনরে দাবী জানান। ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু পৌরসভায় বিএনপির মেয়র প্রার্থী জিন্নাতুল হক কেন্দ্র দখল করে নৌকায় সিল মারার অভিযোগ তুলে বিকাল সাড়ে তিনটায় ভোট বর্জনের ঘোষনা দেন। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে দুধসর কেন্দ্র দখল করে সকাল থেকেই নৌকায় সিল মারতে থাকেন সরকারী দলের লোকজন। পরে ওই কেন্দ্রের ৩০০ ও আখসেন্টার কেন্দ্রের ৫০টি ব্যালট বাতিল করা হয়।

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে নৌকায় সিল মারা ব্যালট পেপার রাস্তাঘাটে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ঝিনাইদহের শৈলকুপায় সকাল থেকেই ধানের শীষ প্রার্থী মোঃ খলিলুর রহমানের পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে আসতে দেওয়া হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। সরেজমিন দেখা গেছে শৈলকুপার সাতগাছি, ঝাওদিয়া, শাহী মসজিদ ও রিসোর্ট সেন্টার কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট পাওয়া যায় নি। এ সব কেন্দ্রে সুকৌশলে নৌকার পক্ষে পোলিং এজেন্টরা কাজ করতে দেখো গেছে। ললিত মোহন স্কুল কেন্দ্রে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কাউন্সিলর প্রার্থী নাজিম উদ্দীন ও আব্দুস সবুরের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। বেলা সোয়া ১১টার দিকে কবীরপুর মডেল স্কুলের কেন্দ্রে সংঘর্ষ বেধে যায়। শৈলকুপার রিসোর্ট সেন্টারের প্রিজাইডিং অফিসার ফিরোজা পারভিন জানান, ধানের শীষের পোলিং এজেন্ট ছিল, কিন্তু তারা হয়তো অন্য কাজে ব্যস্ত আছে।

শৈলকুপা শাহী মসজিদ কেন্দ্রেটি আওয়ামীলীগ প্রার্থী কাজী আশরাফুল আজমের। ওই কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে একই ব্যক্তি বারবার ভোট দিচ্ছে। সকালে এই কেন্দ্রে মহিলাদের উপর হামলার ঘটনাও ঘটে। তবে শাহী মসজিদ কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার আরিফুল হাসান জানান, ভোট সুষ্ঠ হচ্ছে। কোন ঝামেলা নেই। তিনি সাংবাদিকদের কেন্দ্রের মধ্যে ঢুকতে নিষেধ করেন। বেলা ১১টার দিকে শৈলকুপার সিটি কলেজ কেন্দ্রে আসেন নৌকার প্রার্থী কাজী আশরাফুল আজমের ছেলে রাজিব। তিনি কেন্দ্রের মধ্যে ঢুকে একটি বুথের সব ব্যলেট প্রকাশ্যে নৌকায় সিল মেরে নেন বলে বিএনপির প্রার্থী খলিলুর রহমান অভিযোগ করেন। এই কেন্দ্রে মোট ১৫০০ ভোটারের মধ্যে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ৯০০ ভোট পোল হয়েছে।

তবে এ সম্পর্কে সিটি কলেজ কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার ওবাইদুর রহমান কোন মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, ভোট সুষ্ঠ হচ্ছে। শৈলকুপার রিটানির্ং অফিসার দিদারুল আলম বলেন, ভোট সুষ্ঠ হচ্ছে। অভিযোগ পেলেই কেন্দ্রে গিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। র‌্যব, পুলিশ ও বিজিবি টহল দিচ্ছে। কোন ঝামেলা নেই। এদিকে নৌকার প্রার্থী কাজী আশরাফুল আজম ভোট কাটা বা কেন্দ্র দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বিএনপি প্রার্থীর অভিযোগ অবান্তর, কোন ভিত্তি নেই। বিকালে খলিলুর রহমান ১৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩টি কেন্দ্রে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে পুনঃনির্বাচন দাবী করেন।

তিনি লিখিত ভাবে জানান, ক্ষমতাসীন দলের আওয়ামীলীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী কাজী আশরাফুল আজম তার সন্ত্রাসী গুন্ডা বাহিনী দিয়ে খুলনা বাজার বে-সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, শাহী মসজিদ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৯নং লোলিত মোহন ভূইয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাতগাছী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, শৈলকুপা পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, শৈলকুপা সরকারী ডিগ্রি কলেজ, খালকুলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কবিরপুর মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কবিরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ঝাঁউদিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, শৈলকুপা সিটি কলেজ, ১৮নং শৈলকুপা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উপজেলা রিসোর্স সেন্টার মহিলা কেন্দ্র দখল করে নৌকায় সিল মারে। কোটচাঁদপুরে দুটি ভোট কেন্দ্র আওয়ামী লীগ সমর্থক লোকজন জোর পূর্বক দখল ও ব্যালট পেপার কেড়ে নিয়ে সিল মারে।

এ ঘটনায় ঐ দু কেন্দ্রের প্রায় সাড়ে ৩শ ব্যালট পেপার বাতিল করেন প্রিজাইডিং অফিসার। কেন্দ্রদুটি হলো পৌরসভার দুধসরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আখসেন্টার কেন্দ্র। সেখানে রাস্তায় ও ঝোপঝাড়ে সিলমারা ব্যালট পাওয়া গেছে। বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের দুধসরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বহিরাগতরা প্রবেশ করে ৩টি ব্যালট বই নিয়ে সিল মারা শুরু করে। খবর পেয়ে প্রশাসনের লোকজন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। এ সময় ঐ কেন্দ্রের প্রিজাইজিং অফিসার শেখ সাজ্জাদ হোসেন ৩টি ব্যালট বই এর ৩০০ ব্যালট বাতিল করেন। এছাড়াও কোটচাঁদপুরের আখ সেন্টার কেন্দ্রে ৫০টি ব্যালোটে নৌকা প্রতিকের ছিল মারে দখলকারীরা।

পরে র‌্যাব-পুলিশ ঘটনাস্থলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঐ কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার শরিফুল ইসলাম ৫০টি ব্যালট বাতিল করেন বলে স্বীকার করেন। কে্দ্রর আশপাশে ব্যালটে সিলমারা কাগজ উদ্ধার করে পুলিশ। এদিকে ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু বিএনপির মেয়র প্রার্থী জিন্নাতুল হক বিকালে লিখিত ভাবে ভোট বর্জনের ঘোষনা দেন। তিনি অভিযোগ করেন হরিণাকুন্ডু পৌরসভার মান্দারতলাসহ প্রায় সব ভোট কেন্দ্রে ধানের শীষের কোন পোলিং এজেন্ট ঢুকতে দেয়নি নৌকার সমর্থকরা। সকাল থেকে কোন পোলিং এজেন্টকে দেখা মেলেনি। হরিণাকুন্ডুর চটকাবাড়িয়া ভোট কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করে নৌকার সমর্থকরা। খবর পেয়ে র‌্যাব পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে।

জিন্নাতুল হক অভিযোগ করেন, শহরের বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে ঝিনাইদহ থেকে যাওয়া যুবলীগ ছাত্রলীগের কর্মীদের ভোট দিতে দেখা গেছে। প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রই প্রশাসনের সহায়তায় দখল করে নিয়ে সরকার সমর্থকরা ভোট ডাকাতির উৎসবে মেতে ওঠে বলে জিন্নাতুল অভিযোগ করেন। তবে হরিণাকুন্ডু রিটার্নিং অফিসার মনিরা পারভিন জানান, সব কেন্দ্রের পরিবেশ শান্ত ছিল। কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এদিকে আওয়ামীলীগের নৌকার প্রার্থী শাহিনুর রহমান রিন্টু বিএনপির অভিযোগ প্রত্যাখান করে জানান, জনগনের প্রতি তাদের কোন আস্থা নেই। তিনি জানান হরিণাকুন্ডুতে কোন ভোট কারচুপি হয়নি। ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর পৌরসভায় বিএনপি প্রার্থী নজীবুদৌলা নাসের অভিযোগ করেন, ভোট কেন্দ্রে সরকারী দলের লোকজন প্রভাব বিস্তার করেছে।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts