September 21, 2018

জেলও খাটলেন তবুও শেষ পর্যন্ত মালিকানা ধরে রাখতে পারলেন না

আব্দুস সালাম

অনড় ছিলেন কারাভোগ ও সব ধরনের অত্যাচার সহ্য করবেন। কিন্তু নিজের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল একুশে টিভির (ইটিভি) মালিকানা ছাড়বেন না। শেষ রক্ষা হয়নি। তিন আইনে দুই মামলায় কারাগারের বন্দী থাকা অবস্থায় ইটিভির মালিকানা হারালেন আলোচিত ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম। প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক স্বত্ব কিনে নিয়েছে এস আলম গ্রুপ।
ইটিভির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুস সালাম গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে কারান্তরীণ। বর্তমানে কারাবন্দী অবস্থায় বারডেমে চিকিৎসাধীন আছেন। লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য সরাসরি প্রচারের পর চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি মধ্যরাতের পর (৬ জানুয়ারি শুরু) ইটিভি কার্যালয়ের নিচ থেকে সালামকে আটক করে সাদা পোশাকের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
আটকের কথা প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) স্বীকার করে। রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় পর্নোগ্রাফি আইনে দায়ের করা একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে ৬ জানুয়ারি চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হয়। আদালত থেকে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর পর ৮ জানুয়ারি ওই মামলায় সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত নামঞ্জুর করেন।
নভেম্বরের ২৫ তারিখ ইটিভি নতুন মালিকানায় চলে যায়। সেদিনই অনুষ্ঠিত হয় বোর্ড সভা। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গঠিত নতুন পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন এস আলম গ্রুপের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ সাইফুল আলম। এ ছাড়া ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নিয়েছেন আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন আবদুস সামাদ।
বোর্ড সভার মাধ্যমে চ্যানেলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়া হয়। পরিচালক পদে কে এম শহীদ উল্লাহ, সুব্রত কুমার ভৌমিক, সাব্বির বিন শামসু ও রবিউল হাসান। সমাজকল্যাণ পরিচালক হিসেবে ফারজানা পারভীন এবং চট্টগ্রাম ও মার্কেটিং অ্যাসোসিয়েট সমন্বয়কারী হিসেবে মোহাম্মদ মোর্শেদ দায়িত্ব পালন করছেন।
সালাম যেভাবে আউট: মালিকানা পরিবর্তনের পর একুশে টেলিভিশনের নতুন কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমকে বিস্তারিত জানিয়েছিলেন। তাদের কথা, অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১২ ধারা অনুযায়ী আদালতের নির্দেশক্রমে ২০১৫ সালের ৮ অক্টোবর ইটিভির নিলাম হয়। নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে এস আলম গ্রুপ কর্তৃপক্ষ একুশে টেলিভিশন লিমিটেডের শেয়ার, ট্রেডমার্ক, সার্ভিস মার্ক, লোগো ইত্যাদিসহ সব কিছু কিনে নিয়েছে।
নতুন মালিকানায় ইটিভি: মালিকানা পরিবর্তনের পরপরই নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সকল কর্মরতদের ১০ শতাংশ বেতন বাড়ানোর ঘোষণা দেন। বেতন বাড়ানো হলেও বিরাজ করছে অনিশ্চয়তা। ছাঁটাই আতঙ্কে দিন কাটছে অনেকের। ইটিভির একাধিক সংবাদকর্মী পূর্বপশ্চিমকে জানিয়েছেন, কোনো কারণ ছাড়াই সংবাদকর্মীসহ অন্যদের এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে বদলি করা হয়েছে। অনেককেই অন্য কোথাও চাকরি খুঁজতে মৌখিকভাবে বলা হয়েছে।
ফ্ল্যাশব্যাক: ইটিভির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুস সালাম ৬ জানুয়ারি থেকে কারাগারে রয়েছেন। জানুয়ারির ৪ তারিখ রাতে লন্ডনে অনুষ্ঠিত একটি সভায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৫০ মিনিটের একটি বক্তব্য ইটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এরপর ৫ জানুয়ারি মধ্যরাতের পর ইটিভি কার্যালয়ের নিচ থেকে গোয়েন্দা পুলিশ আবদুস সালামকে আটক করে।
বিদ্রোহ ও রাষ্ট্রদ্রোহ: ‘উসকানি দিয়ে পুলিশে বিদ্রোহের চেষ্টা’ ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে আবদুস সালাম ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ৮ জানুয়ারি পুলিশ বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় মামলা দায়ের করে। ইটিভিতে তারেক রহমানের ভাষণ সরাসরি প্রচারের পর পুলিশ ৭ জানুয়ারি তেজগাঁও থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। এর ভিত্তিতে পুলিশ রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে। মন্ত্রণালয় একদিনের মাথায় ৮ জানুয়ারি মামলার অনুমোদন দেয়। এসআই বোরহান উদ্দিন বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় তারেক ও সালাম ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, তারেক রহমানের সঙ্গে পারস্পরিক যোগসাজশে আব্দুস সালাম পরিকল্পিতভাবে তারেক রহমানের মিথ্যা বানোয়াট ভিত্তিহীন উস্কানিমূলক ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য সরাসরি তার টেলিভিশন চ্যানেল একুশে টিভিতে প্রচার করেন। ওই বক্তব্য প্রচারের উদ্দেশ্য ছিল দেশের সার্বভৌমত্ব এবং দেশের সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ বাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ ও বিদ্বেষ ছড়ানো।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টা ২৮ মিনিটে (লন্ডন সময় ০৪/০১/২০১৫ সন্ধ্যা ১৯টা ২৮ মিনিট) যুক্তরাজ্য বিএনপি আয়োজিত ‘৫ জানুয়ারি গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ ব্যানারে এক প্রতিবাদ সভায় বিভিন্ন বিচারাধীন মামলার পলাতক আসামি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় ৫০ মিনিট বক্তব্য প্রদান করেন। তার দীর্ঘ বক্তব্য একুশে টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করে।
তারেক রহমান বক্তব্যে বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি একজন রাজনৈতিক নেতার কবর জিয়ারত করে এবং রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে নিরপেক্ষ ও ন্যায় বিচার করতে পারবেন না।’ তার এমন মন্তব্য, যা স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের শামিল। সে সঙ্গে রাষ্ট্রের অন্যতম অঙ্গ বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টির ইন্ধন যোগায়।
বিডিআর সদর দফতর পিলখানায় আওয়ামী লীগের মুখোশপরা লোকেরা ৭৫ জন সেনা অফিসারকে হত্যা করে বলেও তারেক রহমান মিথ্যা বক্তব্য দেন। তার এ ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে সরকারের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে উসকে দেয়া তথা সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে।
তারেক রহমান ‘একটি বিশেষ এলাকার পুলিশ দিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে’ বক্তব্যের মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ ও বিভক্তি সৃষ্টি এবং
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভঙ্গ করতে প্ররোচিত করার মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রয়াস চালান।
প্রশাসনে বিভাজন সৃষ্টির লক্ষ্যে গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলতে তারেক বক্তব্যে উল্লেখ করেন। তিনি ঢাকা শহরকে অন্য জেলা শহর থেকে এবং ঢাকার এক এলাকাকে অন্য এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার জন্য দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন। এর ফলে বিএনপি-জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের সমর্থকরা ৫ জানুয়ারি দেশের বিভিন্ন স্থানে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের মাধ্যমে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করার উস্কানি পায়। তারেক ওই বক্তব্যে দেশের অখণ্ডতা ও পরোক্ষভাবে সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি প্রদর্শন করেছেন।
তারেকের এমন বক্তব্য আব্দুস সালাম এবং অন্যদের সহযোগিতায় ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের প্রতিষ্ঠিত, গণতান্ত্রিক ও আইনানুগ সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন, উস্কানিমূলক বিভ্রান্তিকর তথ্যাদি একুশে টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রচার করে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ করেছেন।

Related posts