November 18, 2018

জুয়েলারী ব্যবসার আড়ালে চলছে লাইসেন্স বিহীন অবৈধ স্বর্ণ বন্ধক ॥ প্রতারিত হচ্ছে গ্রাহকরা

77এ কে আজাদ, চাঁদপুর : ডিলিং লাইসেন্স ও স্বর্ণ যাচাইয়ের হলমার্ক মেশিন ছাড়াই চাঁদপুরে চলছে জুয়েলারী ব্যবসা। মাত্র ২১টি জুয়েলারী প্রতিষ্ঠানের ডিলিং লাইসেন্স থাকলেও জেলার সহ¯্রাধিক জুয়েলারী প্রতিষ্ঠানের কোন লাইসেন্স নেই। সম্পন্ন অবৈধভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া জেলায় স্বর্ণের ক্যারেট যাচাইয়ের কোন মেশিন নেই। এ কারনে সাধারণ ক্রেতারা স্বর্ণ ক্রয়ে ক্যারেট বুঝতে না পেরে মারাত্মকভাবে প্রতারিত হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্রেতাদের সাথেই ২২ ক্যারেট বলে ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণ দিয়ে এসব অবৈধ স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া সরকারের অনুমতি ছাড়াই সম্পূর্ণ অবৈধভাবে স্বর্ণ বন্ধক রেখে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করছে। ২০১৭ ২৩ নভেম্বর চাঁদপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে চাঁদপুর জেলার গ্রাহক সেবার নিশ্চিতকরণ ও অলঙ্কারের মানন্নোয়নে টাস্কফোর্স কমিটির সভায় চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য বের হয়ে আসে। সভায় সভার সভাপতি জানান, এ জেলায় ২শ’ ৫০টি স্বর্ণ/রৌপ্য ও জুয়েলারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে মাত্র ১৭টি প্রতিষ্ঠান ডিলিং লাইন্সেস করেছে। অনেক ব্যবসায়ী ডিলিং লাইন্সেস ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। অনেকে আবার ডিলিং লাইন্সেস নবায়ন ছাড়াই ব্যবসা করছেন। তিনি ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে বলেন, লাইন্সেসবিহীন ব্যবসা করে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ডিলিং লাইন্সেস না থাকলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হবে। একই সভায় চাঁদপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা প্রশ্ন তোলেন ১৮ হতে ২২ ক্যারেট স্বর্ণ চেনার উপায় কি? এর জবাবে চাঁদপুর স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি খোকন কর্মকার জানান, হলমার্ক মেশিন দিয়ে তা যাচাই করা যায়। কিন্তু চাঁদপুরে এ ধরনের কোন মেশিন নেই। সমিতির মাধ্যমে সহসাই হলমার্ক মেশিন আনার প্রক্রিয়া চলছে। সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, ১৮ ক্যারেট এবং ২২ ক্যারেটের পার্থক্য না বুঝার কারনে সাধারণ ক্রেতারা হয়রানীর স্বীকার হচ্ছে। এ অবস্থায় গ্রাহকসেবা নিশ্চিতকরণে অতি দ্রুত হলমার্ক মেশিন ক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে, তা না হলে গ্রাহকরা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হবে। মেশিন ছাড়া ব্যবসা করা যাবে না। সভায় সিদ্ধান্ত হয় ডিলিং লাইন্সেস ও হল মার্ক মেশিন ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করলে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে ঐসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদিকে বাংলাদেশ জুয়েলারী ব্যবসায়ী সমিতি চাঁদপুর জেলা শাখা ইতিমধ্যে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের হুশিয়ার করে দিয়েছেন, কোন স্বর্ণ ব্যবসায়ী ডিলিং লাইন্সেস না থাকার কারনে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সমিতি দায়ভার গ্রহণ করবে না।
এদিকে জেলায় লাইসেন্সবিহীন রমরমা জুয়েলারী ব্যবসার কারনে সরকার হারাচ্ছে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব। জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার বড় বড় বাজারগুলো ছাড়াও ছোট-ছোট বাজারগুলোতে প্রচুর পরিমান জুয়েলারী দোকান রয়েছে। জেলায় মোট প্রায় ১ হাজারেরও বেশি জুয়েলারী দোকান রয়েছে। এদের অধিকাংশ দোকানে নেই কোন বৈধ লাইসেন্স। এ ব্যাপারে প্রশাসনের নজরদারি থাকলেও তাদেরকে তোয়াক্কা না করে লাইসেন্সবিহিন অবৈধভাবে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের ব্যবসা। বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটিরও নেই কোন মনিটরিং। জেলা প্রশাসনের ব্যবসা শাখা থেকে জানা যায়, স্বর্ণের দোকানগুলোতে দু’ভাগে লাইসেন্স দেয়া হয়ে থাকে। প্রথমত স্বর্ণ-রূপা দিয়ে বিভিন্ন অলঙ্কার তৈরী করা কারিগরী লাইসেন্স, দ্বিতীয়ত যারা শুধু অলঙ্কার বিক্রি করেন তাদের জন্য জুয়েলারী লাইসেন্স। চাঁদপুরে অলঙ্কার তৈরীর কারিগর লাইসেন্স গত বছর ছিল ২শ’ ৬৩টি, চলতি বছর আরো ২টি লাইসেন্স নতুন করে করা হয়েছে। বর্তমানে এই লাইসেন্সের সংখ্যা ২শ’ ৬৫টি। আর জুয়েলারী লাইসেন্স পূর্বের মত এবারো নবায়ন করা হয়েছে ২১টি। ২ ক্যাটাগরীতে জেলায় লাইসেন্সের সংখ্যা ২শ’ ৮৬টি। অথচ জেলায় জুয়েলারীসহ অলঙ্কার তৈরী করা কারিগরী দোকানের সংখ্যা হাজারেরও বেশি রয়েছে। জেলা প্রশাসনের ব্যবসা শাখা জানান, প্রতি বছরই আমরা লাইসেন্স করার জন্য দোকান মালিকদের নোটিশ করে থাকি। এ বছরও কয়েকটি উপজেলাতে নোটিশ করেছি। বিশেষ করে, মতলব উপজেলার কালীপুরে বেশ কয়েকটি নতুন স্বর্ণের দোকান গড়ে উঠেছে। তাদেরকে নোটিশ করা সত্ত্বেও তারা লাইসেন্স করে নাই। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। শুধু সেখানেই নয় জেলা প্রশাসকের নির্দেশ মোতাবেক আমরা অচীরেই মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। অন্যদিকে এসব জুয়েলার্স দোকানিরা যত্রতত্র নাইট্রিক এসিড পোড়ানোর কারনে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। জেলা শহরের প্রধান প্রধান সড়কসহ উপজেলার বাজারগুলোর রাস্তার পাশে গড়ে উঠা এসব জুয়েলার্স দোকানে দিনে রাতে অহরহ পুড়িয়ে যাচ্ছে নাইট্রিক এসিড। ফলে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষক শিক্ষার্থী ও পথচারীরা চলাচলে দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। এসিডের কালো ধোঁয়া ও দূর্গন্ধে নাকে-মুখে কাপড় দিয়ে তাদের চলতে হয় পথ।
অথচ জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ের হাট-বাজারগুলোর স্বর্ণের দোকানে যত্রতত্র নাইট্রিক এসিড ব্যবহার করে যাচ্ছে তারা। আর এসিড ছাড়া স্বর্ণ যাচাই করা যায় না। একটি নাকফুলও যদি পরিষ্কার করা হয়, তার জন্য এসিড প্রয়োজন হয়, দোকানে ও কারখানায় নাইট্রিক এসিড রাখতে হয়। এসব এসিড রাখা ও ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ জুয়েলারী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলাম জানান, জেলা প্রশাসন চাঁদপুরের জুয়েলারী মালিক সমিতিসহ বিভিন্ন স্বর্ণের দোকান মালিকদের নিয়ে গত বছরের ২৩ নভেম্বর একটি সভা করে। সেই সভাতে যে সকল স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা এখনো লাইসেন্স করেন নাই তাদেরকে দু’মাসের সময় দিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দু’মাসের অধিক সময় পার হয়ে গেলেও এখনো তারা লাইসেন্স করেন নাই। তিনি আরো বলেন, সেই সভায় গ্রাহক সেবা নিশ্চিত, অলংকারের মানন্নোয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১০ সদস্য বিশিষ্ট একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চাঁদপুরের সহকারী পরিচালক, জেলা মার্কেটিং অফিসার, জেলা জুয়েলারী মালিক সমিতির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক)। যে কোন সময় তারা পরিদর্শনসহ অনিয়মের কারনে যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তিনি বলেন, বর্তমানে বেশির ভাগ জুয়েলারী ব্যবসা চলছে বন্ধকী নিয়ে যা আইন বিরোধী। কারন বন্ধকী ব্যবসা করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ছাড়পত্র নিয়ে ডিলিং লাইসেন্স করে তারপর এই বন্ধকী ব্যবসা করতে হবে। যা চাঁদপুরে কোন স্বর্ণ ব্যবসায়ীর এই লাইসেন্স নাই। সকলেই অবৈধভাবে বন্ধকী ব্যবসা চালিয়ে সরকারের লক্ষ-লক্ষ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। দেখবেন অনেকের দোকানে নামমাত্র অলংকার শো করে রেখেছে। তারপরও তারা কিভাবে চলছে। শুধুমাত্র মানুষের স্বর্ণ রেখে বন্ধকী ব্যবসা করে লাখ লাখ টাকা আয় করছে। আশা করবো স্থানীয় প্রশাসন এ ব্যাপারে অতি দ্রুত এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

Related posts