November 16, 2018

জীবন পাল্টে দেওয়া ২০ টি বই

বই

জীবন পাল্টে দেয়া বা দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেয়া বইয়ের তালিকা করতে বললে এখন আমি যেটা করবো আগামী একছর বা দশবছর পর অনেকটাই পরিবর্তিত হয়ে যাবে, অনেক যোগ-বিয়োগ হবে। তেমনি আজ থেকে বছর দুয়েক আগে বললেও যে তালিকা হতো সেটা এখনকার সাথে পুরোপুরি মিলবে না। তবে কিছু কিছু বই সারাজীবন তালিকাতে থাকারই সম্ভাবনা বেশি।

আমার তালিকা করার ক্ষেত্রে ধর্মীয় মহাগ্রন্থগুলোর রাখিনি।তবে ভূমিকাতে তাদের নাম নিয়ে রাখলাম। পবিত্র কুরআন, পবিত্র বাইবেল, পবিত্র গীতা আমার পড়া তিনটি অসাধারণ গ্রন্থ। প্রত্যেকটিই বহুবার পড়া। শত শত বছর ধরে মানুষের জীবন পাল্টে দেওয়া থেকে শুরু করে জীবনের নতুন অর্থ নির্মাণের ক্ষেত্রে এগুলোর ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই।অন্যান্য ধর্মগ্রন্থগুলোও ঠিক এমন প্রভাবশালী হবে বলেই মনে করি। প্রত্যেকটি ধর্মের প্রধান গ্রন্থগুলো একে একে পড়ে শেষ করার আশা রাখি।

নিচে বিশটি বইয়ের তালিকা করার ক্ষেত্রে প্রধান ধর্মগ্রন্থগুলো নিয়ে আসা হয়নি। তবে অনেকেই লাও জু’র ‘তাও তে চিং’কে ধর্ম ও দর্শনের মাঝামাঝিই রাখে। আর মহাভারতেরই একটি অংশ যে গীতা। আগেভাগে একটু ফুটনোট দিয়ে রাখলাম!

সে যাই হউক এখন আমাকে কেউ প্রশ্ন করলে যে বিশটি বইয়ের নাম মাথায় আসবে সেগুলোর নাম নেওয়ার চেষ্টা করি:

১. এপলজি অব সক্রেতিস বা সক্রেতিসের জবানবন্দি-প্লাতো
সক্রেতিসের বাবা ভাস্কর আর মা ধাত্রী। সক্রেতিস পরবর্তী জীবনে মা-বাবার পেশাকে ধরে রেখেছেন বলে মনে করতেন। ধাত্রী যেমন কোন মানবশিশুকে পৃথিবীতে আসতে, জন্ম নিতে সহায়তা করতেন সক্রেতিসও তেমনি একজন জ্ঞানপিপাসুর জন্মের ক্ষেত্রে ধাত্রীর মতো ভূমিকা পালন করতেন। আবার একজন ভাস্কর যেমন কঠিন পাথরকে কেটেকুটে সুন্দর মূর্তির রূপ দেন তেমনি দার্শনিক ও মানবতার শিক্ষক সক্রেতিস ও একজন মানবশিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের ক্ষেত্রে নিপুণ ভাস্করের ভূমিকা পালন করেছেন। বৃক্ষ তোমার নাম কি? ফলে তার পরিচয়। এখন সক্রেতিস কেমন শিক্ষক ছিলেন তার প্রমাণ প্লাতো, অ্যারিস্তোতলদের মতো ওস্তাদদের পরম্পরা তৈরি করার মধ্যেই রয়েছে। তার প্রিয় এবং যোগ্যতম শিষ্য প্লাতোকে নিয়ে বলা হয়-‘পুরো পাশ্চাত্য দর্শন প্লাতোর ফুটনোট মাত্র’। প্লাতোর প্রত্যেকটি লেখাতে প্রধান চরিত্র হিসেবে থেকেছেন সক্রেতিস। মনে হচ্ছে যেন সক্রেতিস কথা বলছেন আর প্লাতো নোট লিখছেন। ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। বয়স ত্রিশের দিকে গুরু সক্রেতিসের করুণ বিয়োগের ঘটনাটি এমনভাবেই তাড়িত করেছিল তরুণ প্লাতোকে যে সে তার পুরো জ্ঞানচর্চাকেই সক্রেতিসের পদতলে বিছিয়ে দিয়েছেন। ব্যাপারটা অনেক পরিষ্কার প্লাতো প্রথমদিকে হয়তো সক্রেতিসের দর্শনই সক্রেতিসের মুখ দিয়ে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু তার সেরা লেখাগুলোতে বা শেষদিকের লেখাগুলোতে নিজের দর্শন সক্রেতিসের মুখ দিয়ে বলিয়ে নিয়েছেন। সক্রেতিসের প্রতি তার একাত্ম আনুগত্য ও ভালোবাসার ব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহের লেষমাত্র নেই।

সক্রেতিসকে খুব কাছ থেকে বুজতে হলে তার জবানবন্দি পড়তে পারেন। এর একাধিক বাংলা তর্জমা আছে। ইংরেজিতেও অনেকগুলো সংস্করণ আছে। যেকোন একটা পড়ে ফেলতে পারেন।

২. অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ- সেনেকা
আমরা পৃথিবীতে এমনভাবে জীবনধারণ করি যেন আমরা অমর, মৃত্যু মনে হয় আসবেই না। অথচ যে মুহূর্তটা একবার চলে গেল সেটা আর ফিরিয়ে আনা কখনোই সম্ভব না। এবং মৃত্যু ও চলে যাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ট্রাজিক সত্য। এটা ট্রাজিক সত্য কারণ এই সত্যটা সবাই জানলেও ভুলে থাকে বা ভুলে যায়।

সেনেকার মতে-‘তুমি এমনভাবে সময় অপচয় করো যেনো তোমার অফুরান যোগান আছে। কিন্তু ব্যাপারটা হলো কোনদিন কাউকে যে সময়টা দিলে বা যে জন্য দিলে সেটা হয়তো তোমার শেষ সময়। মরণশীল প্রাণীর সব ভয় তোমাদের মধ্যে কিন্তু তোমাদের আকাঙ্খা এত যেন তোমরা মরবে না।’

যারা বিভিন্ন আকামে ব্যস্ত থাকে অথচ ভবিষ্যতে কোন একসময় ভালো কাজ করবে বা ৫০/৬০ বছরের পর অবসরে গিয়ে সকল ভালো কাজ করার পরিকল্পনা করে রাখে তাদেরকে ব্যাপক সমালোচনা করেছেন। তিনি প্রশ্ন করেন কিভাবে তারা নিশ্চিত যে ৫০ বছর বা ৬০ বছর বেঁচে থাকবে? সেনেকার মতে এমন মানুষদের লজ্জা পাওয়া উচিত। যে তার জীবনের সেরা সময়টাতে ভালো কাজ করতে পারে নাই সে শেষ জীবনে গিয়ে করে ফেলবে এটা ভাবা অহেতুক কল্পনাবিলাস নয় কি? সেনেকার কথা হচ্ছে যা কিছু করার আজই শুরু করতে হবে। ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখার দরকার নেই।

জীবনের অর্থ খুজে পাওয়া বা কিভাবে বাঁচতে হয় এটা শিখতে অনেক কষ্ট হয়, এমনকি জীবন ফুরিয়ে যাওয়ার আগে অনুধাবন হয় যে আসলে সেরকম বাঁচতেই পারলাম না। অনেকে বেশি মানুষের উপর ক্ষমতাবান হওয়াকে জীবনের সফলতা মনে করে। এর একটা বড় গোলকধাঁধা হচ্ছে এই যে অনেকের কাছে পরিচিত হলেও দেখা যায় সে নিজের কাছে সবচেয়ে অপরিচিত। এজন্য অনেক খ্যাতিমান লোক দিন শেষে দেখে তার নিজের জন্য সময় বরাদ্ধ কত কম!

অন্যকে সুখি করতে, অন্যের সামনে সুখি হিসেবে নিজেকে সবসময় তুলে ধরে রাখতে কত মানুষের জীবনের বড় অংশ চলে যায়। জীবনের যোগ বিয়োগ শেষে দেখা যায় আর সবাইকে সুখি করতে পারলেও যাকে সুখি করা হয়নি সেটা হলো নিজেকে! পাবলিক লাইফের প্যাড়া এমনই! এজন্যই আমরা কত রাজা-বাদশা, ধনরাজ, জ্ঞানী-মুনী-ঋষীকে দেখি অর্থ, সম্পদ, প্রাসাদ ছেড়ে জীবনের অর্থ খুঁজতে বের হয়ে পড়েন। তাদের মধ্য থেকেই বের হয়ে আসে গৌতম বুদ্ধ, মহাবীর, সক্রেতিস, রাহুল সাংকৃত্যায়ন, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দেকার্ত বা লুডবিগ ভিৎগেনস্টেইন প্রমুখ মহামানব।

বেশিরভাগ মানুষের দিন কাটে অতীতের অনুশোচনা আর ভবিষ্যতের দুর্ভাবনা নিয়ে। কয়জন পারে আজকের দিনটাকেই শেষদিন মনে করে পূর্ণ করে বাঁচতে? আর অনেকের দিন কাটে ভবিষ্যতের ভালো সময়ের অপেক্ষা করে। সেনেকার প্রশ্ন ভবিষ্যতের কাছে দাবি-দাওয়া বা ভবিষ্যতের ভয় ছাড়া বর্তমানে বাঁচতে পারে কয়জন?

সময়ের অপচয় সেনেকা মেনে নিতে পারেন না। অন্য তুচ্ছ জিনিস নিয়ে বেশ সতর্ক হলেও এ ব্যাপারটাতে বেহিসাবী। সময়কে তুচ্ছ করে যারা অপচয় করে, অহেতুক কাজ করে বেড়ায় তারাই আবার যখন গভীর অসুস্থতায় পড়ে বা মৃত্যুমুখে পতিত হয় তারা ডাক্তার কবিরাজদের হাঁটুর নিচে পড়ে থাকে যেন আর কয়টা দিন বাঁচা যায়। বা কাউকে যখন মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয় তখন উকিল-মোক্তারদের পেছনে ভাই-বন্ধু, আত্মীয়-স্বজনদের দৌড়ানো দেখলেই বুঝা যায় একটি দিন বেঁচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ, একটি দিন কত বড়! আবার এ লোকটিই হয়তো দিনের পর দিন দিন ক্ষয় করে গেছে, অন্যের জীবন যাপন করে গেছে আর নিজের কাছে অচেনা থেকে কাটিয়েছে।

অনেক বছর বাঁচলেই কেবল বড় মানুষ হওয়া যায় না। সেনেকা বলেন- কারো ধূসর চুল আর কুচকে যাওয়া চামড়া দেখে ভেবো না সে অনেকদিন বেঁচেছে। সে আসলে অনেকদিন অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

আমার কাছে একটি ভালো বই একটি ভালো সফটওয়ার। সফটওয়ার যেমন কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা স্মার্ট ফোনের কাজের প্রকৃতি পাল্টে দেয় তেমনি একটা ভালো বইও মানুষের দেখার দৃষ্টি, ভাবনার পদ্ধতি পাল্টে দেয়। তাই আমার মতে বই মানুষের জন্য সেরা সফটওয়ার। আর একেকটা সেরা বই পড়া হচ্ছে একেকটা সফটওয়ার ইন্সটল করা; তার মানে জগতকে একেকবার একেকটি দৃষ্টিতে দেখার সক্ষমতা অর্জন করা। সেনেকার ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’ আমার কাছে তেমন একটি বই। যখন মনে হয় আমি অহেতুক সময় অপচয় করছি, যখন মনে হয় আমি আমার নিজের কাছে কমিটমেন্টের সাথে প্রতারণা করছি, আমার মনের গহীন কোণে হতাশার চাষবাস করছি তখনই এমন কিছু সফটওয়ারের সাহায্য নেই। এগুলো ইনস্টল করার মাধ্যমে আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করি।

Related posts