September 23, 2018

জামালপুরে দেড় যুগ ধরে শিকলবন্দী দুই বোন

hপ্রায় দেড় যুগ ধরে শিকলবন্দী অবস্থায় রয়েছেন পাপড়ি খাতুন (৩৩) ও অনন্যা খাতুন (৩০) নামে দুই সহোদর বোন। জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার আদারভিটা গ্রামে জরাজীর্ণ একচালা টিনের দুর্গন্ধময় এক ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। শিকলপরা অবস্থাতেই চলে তাদের খাওয়া-দাওয়া ও প্রাকৃতিক কাজকর্ম। চিকিৎসা ও যত্নের অভাব আর পুষ্টিহীনতায় তাদের শরীর কঙ্কালসার। খবর পেয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে তাদের বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা, পুনর্বাসনসহ সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক শাহাবুদ্দিন খান। এছাড়া শিকলবন্দী অবস্থা থেকে তাদের মুক্ত করেছেন তিনি।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার আদারভিটা উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ১৯৯৯ সালে পাপড়ি খাতুন ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্য হারাতে শুরু করে। ২০০১ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় অনন্যা খাতুনের একই রকমের মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। তাদের আচরণ দিনদিন অস্বাভাবিক হতে থাকে। একপর্যায়ে তারা দু’জনই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। বন্ধ হয়ে যায় তাদের স্কুলে যাওয়া। তাদের পিতা আব্দুল মান্নান দুই মেয়েকে নিয়ে বিপাকে পড়েন। দুই বোন প্রতিবেশীদের বাড়িতে গিয়ে নানা সমস্যা করতে থাকে। এতে প্রতিবেশীদের নানা কথাও শুনতে হয় আব্দুল মান্নান ও স্বজনদের। পাবনা মানসিক হাসপাতালে কয়েক মাস রেখে চিকিৎসাও করানো হয় তাদের। কিন্তু ভালো না হওয়ায় নিরুপায় হয়ে সামাজিকভাবে বিব্রত হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে ২০০৪ সাল থেকে তাদের পায়ে শিকল পরিয়ে রাখে স্বজনরা। এরপর থেকে শিকলবন্দী অবস্থায় দুই বোন একই বিছানায় থাকে।

পাপড়ি খাতুন কথা বলে। কাছে লোকজন গেলে গানও শোনায়। আর অনন্যা চুপচাপ থাকে। চিকিৎসা ও যত্নের অভাবে বর্তমানে তারা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

২০১০ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে তাদের বাবা আব্দুল মান্নান এবং ২০১৪ সালে তাদের মা শাহিনা পারভীন মারা যান। এরপর থেকে তাদের ছোট দুই ভাই সম্রাট ও মুশফিকুর রহমানের জীবনে শুরু হয় নতুন লড়াই। বন্ধ হয়ে গেছে সম্রাটের পড়ালেখা। আর মুশফিকুর রহমান (১৩) অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। সম্রাট এখন ওই পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম। তার সামান্য আয়ে দুই বোনের লালন-পালন ও ছোটভাইয়ের পড়ালেখার খরচ চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

সম্রাট জানান, তার বাবা উপজেলা পরিসংখ্যান বিভাগে ছোট চাকরি করতেন। নিজের বলতে দেড় বিঘা কৃষি জমি রেখে গেছেন। অভাবের কারণে তা অনেক আগেই বন্ধক রাখতে হয়েছে। পুরো সংসারের দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। অনেক সময় খাবারও সংগ্রহ করতে পারে না। তখন ঘরে বসে কাঁদে। বোনদের চিকিৎসা কিভাবে করাবে। চাচা আবদুল হাই ছাড়া কেউ দেখতেও আসে না তাদের।

সম্রাটের চাচা আবদুল হাই বলেন, ওদের কষ্ট দেখে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার চেষ্টা করি। ভাতিজা সম্রাট অন্য মানুষের গরু লালনপালন করে এবং মানুষের জমিতে কৃষিকাজ করে সংসার চালায়। সে রান্নাবান্নাসহ সংসারের সব কাজ করে। অনেক সময় না খেয়েও থাকে। টাকার অভাবে সম্রাটের দুই বোনের চিকিৎসা করানো যাচ্ছে না।

আদারভিটা উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শান্তেজা খাতুন বলেন, পাপড়ি মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। তার গান ভালো লাগত।

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক শাহ আলম বলেন, এ ধরনের রোগীকে হাসপাতালে চিকিৎসা করালে আমরা ওষুধ সরবরাহসহ সহযোগিতা করতে পারি। এছাড়া আমাদের কিছু করার নেই।

এব্যাপারে জেলা প্রশাসক শাহাবুদ্দিন খান জানান, তাদের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এজন্য একজন আগ্রহী চিকিৎসকের সাথেও কথা হয়েছে। পরিবারটিতে দায়িত্বশীল কেউ নেই। এ কারণে পরিবারটি যাতে সচ্ছলভাবে চলতে পারে, সে ব্যবস্থাও করা হবে।

Related posts