September 23, 2018

জামাত-শিবিরের পক্ষ নিলো নিউইয়র্ক টাইমস?

হাকিকুল ইসলাম খোকন, বিশেষ সংবাদদাতাঃ  সাম্প্রতিক সময়ে ২০ জনের অধিক ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, শিক্ষাবিদ এবং রাজনৈতিক কর্মী খুনের ঘটনা নিয়ে ৮ মে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। ‘বাংলাদেশ’স ডিসেন্ট ইনটু ল’লেসনেস’ অর্থাৎ ‘বাংলাদেশ নিপতিত হচ্ছে অরাজকতায়’ শীর্ষক ৩৯২ শব্দের এ সম্পাদকীয়তে শেখ হাসিনা সরকারকে ইসলামিক চরমপন্থি দমনে কঠোর হবার আহবান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, একাত্তরের ঘাতকদের বিচার নিয়ে জামাত-শিবির যে সব অভিযোগ করছে বা যে ভাষায় কথা বলছে, একই বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে সম্পাদকীয়তে। বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীন সরকার তার রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্যে জামাতে ইসলামের নেতৃবৃন্দকে টার্গেট করা হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের মত মর্যাদাশীল পত্রিকায় এ ধরনের সম্পাকীয় পাঠ করে প্রবাসী বাংলাদেশীরাও বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদ, ইউএস কমিটি ফর সেক্যুলার এন্ড ডেমক্র্যাটিক বাংলাদেশ, জেনোসাইড একাত্তর, যুক্তরাষ্ট্র মুক্তিযোদ্ধা যুবকমান্ডের নেতৃবৃন্দ এই সম্পাদকীয়ের সমালোচনা করে বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, প্রকাশক এবং মুক্তমনা ব্লগার হত্যাকান্ডের ঘটনাবলী একাত্তরের বর্বরতারই ধারাবাহিকতা মাত্র। একাত্তরেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারিদের ইসলামের শত্রু আখ্যা দিয়ে ওরা হত্যাযজ্ঞ, নারী ধর্ষণ এবং বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়। এখনও ওরা ধর্মের দোহাই দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে জনমত সোচ্চারের দায়িত্ব পালনকারিদের কুপিয়ে হত্যা করা হচ্ছে।

নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন, একাত্তরের ঘাতকদের বিচারের বিরোধিতা করতে যেয়ে নিউইয়র্ক টাইমস মূলত: জামাত-শিবিরের পক্ষাবলম্বন করার ধৃষ্ঠতা দেখিয়েছে। অথচ একাত্তরের মুক্তিপাগল বাঙালির পক্ষেই টাইমসের ভূমিকা সোচ্চার ছিল। সে সময়ে টাইমসেও বর্বরতার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সময়ের পালাক্রমে সেই বর্বরতাকে রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে কেন গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে সেটি ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। প্রবাসের নেতৃবৃন্দ নিউইয়র্ক টাইমসের এই সম্পাদকীয় প্রত্যাখান করেছেন এবং একইসাথে বাংলাদেশ সরকারকে চাপাতি দিয়ে আক্রমণকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

টাইমসের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, ‘২০১৩ সাল থেকে ২০ জনের অধিক বাংলাদেশী খুন হয়েছে ইসলামিক চরমপন্থিদের হাতে। কয়েকজনকে জবাই করে হত্যা করা হয়। এরমধ্যে সর্বপ্রথম খুন হয় একজন ব্লগার, যিনি ইসলামিক মৌলবাদিদের সমালোচনা করেছিলেন। এরপর দুই বিদেশীকে হত্যা করা হয়। এর একজন ছিলেন ইটালিয়ান এবং অপরজন জাপানিজ। এরপর গত মাসে ৯ দিনের ব্যবধানে ৫ জনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পার্টি এবং এর প্রধান বিরোধী বিএনপি ও জামাতে ইসলামিকে আংশিকভাবে দায়ী করা হচ্ছে এহেন হত্যাকান্ডের জন্যে।’

সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘২০১৪ সালে তুমুল সংঘাত এবং বিরোধী দল বর্জনের নির্বাচনে শেখ হাসিনা এবং তার দল জয়ী হয়েছে।’

সম্পাদীয়তে বলা হয়েছে, ‘একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থানকারি ঘাতকদের বিচারের জন্যে ২০১০ সালে গঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, এটি এখন ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, টার্গেট করা হচ্ছে জামাতে ইসলামী দলের নেতাদের। এর পাশাপাশি বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড, নির্যাতন, গুম হওয়ার ঘটনাবলি আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ধ্বংস হয়ে পড়েছে।’

সম্পাদকীয়তে আরো মন্তব্য করা হয়েছে, ‘এদিকে, শেখ হাসিনার সরকার গণমাধ্যম এবং কথা বলার স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছেন। গতমাসে শেখ হাসিনা ব্লগারদের নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, কেউ যদি আমাদের প্রিয়নবী কিংবা অন্য কোন ধর্মের বিরুদ্ধে লেখে তবে তা কোনভাবেই সহ্য করা হবে না।’ সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এসবই উগ্রপন্থাকে উস্কে দিচ্ছে। দাঙ্গা, সংঘাত প্রতিরোধে কর্মরত নিরপেক্ষ সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসি গ্রুপ’ ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে যে, এহেন হত্যাযজ্ঞ প্রতিরোধ এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও আইনে সোপর্দ করতে সরকারের আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এবং এরফলে দুর্বৃত্তরা আরো সাহস পাচ্ছে।

আল ক্বায়েদার সহযোগী আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ দায়িত্ব স্বীকার করেছে আইনের ছাত্র নাজিমুদ্দিন সামাদকে হত্যার। ৬ এপ্রিল তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। হিন্দু দর্জি নিখিল চন্দ্র জোয়ার্দারকে হত্যার দায়ও স্বীকার করেছে আইসিস। ৩০ এপ্রিল তাকে হত্যা করা হয়েছে। যদিও হাসিনা সরকার সবসময়ই অস্বীকার করছে যে বাংলাদেশে আইসিসের অস্তিত্ব নেই।’
সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরী বলেছেন, জুলহাজ মান্নান, একজন সমকামি কর্মী, যিনি কাজ করতেন ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসে এবং তাকে হত্যা করা হয়েছে ২৫ এপ্রিল। সাথে তার এক বন্ধুকেও কুপিয়ে হত্যা করা হয়, এমন নৃশংসতায় বাংলাদেশের মানুষকে হতবাক করেছে, বাংলাদেশের মানুষের ঐতিহ্য রয়েছে সংযম, শান্তি এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষে মিলেমিশে বসবাসের। এসব খুনের তদন্তে যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণ সহায়তা করতে চায় বলে কেরী বাংলাদেশকে প্রস্তাব দিয়েছেন।

শেখ হাসিনার সরকার এই সাপোর্টকে স্বাগত জানানো উচিত। মাত্র কয়েকজন সন্ত্রাসী বিচারের সম্মুখীন হয়েছে। এভাবে বিচারহীনতার পরিবেশ তৈরী করা হয়েছে। যারা এহেন হত্যাকান্ডের শিকার হবার আশংকা রয়েছে, তাদের নিরাপত্তায় সরকারকে অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে। গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা পুনপ্রতিষ্ঠা এবং আইনের শাসনের প্রতি অবশ্যই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে সরকারকে।’ ‘এসব করতে সরকার যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে দেশকে অরাজক পরিস্থিতির মুখেই ঠেলে দেয়া হবে’ বলে সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করা হয়েছে।

■ রিপোর্টির লিংকঃ http://www.nytimes.com/2016/05/09/opinion/bangladeshs-descent-into-lawlessness.html?partner=rssnyt&emc=rss

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন ডেরি/৯ মে ২০১৬

Related posts