November 17, 2018

জাবি ছাত্রদলের কমিটিতে কারা আসছেন?

1000

জাবি থেকেঃ  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা ছাত্রদলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক কে হচ্ছেন- এমন প্রশ্ন এখন ক্যাম্পাসের সর্বত্র। টানা পাঁচ বছর পর জাবি শাখা ছাত্রদলের কমিটি গঠনের কথা শুনে ত্যাগী নেতাদের সঙ্গে অনুপ্রবেশকারী ও বিতর্কিত নেতাকর্মীদেরও জোর লবিং শুরু হয়েছে। ছাত্রদলের বিভিন্ন সূত্রে এসব খবর পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, ‘ছাত্রলীগ মুক্ত জাবি ছাত্রদল চাই’-এমন দাবিতে প্রচারণা চালাচ্ছেন ত্যাগী কর্মীরা। ছাত্রদলের জুনিয়র কর্মীদের দাবি অনুপ্রবেশকারীদের বাদ দিয়ে যারা দলীয় কার্যক্রমে সক্রিয় অংশ নিয়ে হামলা-মামলায় জর্জরিত তাদেরকে পদ দেয়া উচিত।

জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের শিক্ষকরা দাবি করেছেন, ছাত্রলীগ থেকে অনুপ্রবেশকারীদের বাদ দিয়ে নিয়মিত ছাত্রদের দিয়ে কমিটি গঠন করা হলে সুযোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসবে। এমনটাই কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে প্রত্যাশা তাদের।

ত্যাগী নেতাদের দৌড়ঝাঁপ: ত্যাগী নেতাদের মধ্যে সভাপতি পদে এগিয়ে আছেন আ ফ ম কামাল উদ্দিন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক আব্দুর রহিম সৈকত। যাকে ছাত্রদল করার অপরাধে ২০১৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে লোহার রড ও পাইপ দিয়ে মারধর করে বাম হাত ও বাম পা ভেঙে দেয় ছাত্রলীগ নেতারা।

হাসপাতালে একমাস চিকিৎসা নেয়ার পর প্রায় ৬ মাস হুইল চেয়ার ব্যবহার করেন তিনি। সুস্থ হয়ে তিনি বর্তমান সরকার বিরোধী কালো পতাকা মিছিলসহ সব কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে চার মামলার আসামিও হয়েছেন।

জানা গেছে, বর্তমানে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি জিয়াউর রহমান জিয়ার মাধ্যমে সভাপতি হওয়ার জন্য জোর লবিং চলাচ্ছেন তিনি।

অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে পেতে কন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসানের মাধ্যমে জোর লবিং চালাচ্ছেন শহীদ সালাম-বরকত হলের যুগ্ম আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর। যাকে ছাত্রদল করার অপরাধে ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রড, লাঠি ও কাঠ দিয়ে মারধর করে ছাত্রলীগ কর্মীরা। এছাড়া আওয়ামী সরকার বিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে
দেখা গেছে তাকে।

সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য লবিং এ ব্যাস্ত আরেক ছাত্রদল নেতা আশরাফুল ইসলাম, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ রফিক-জব্বার হলের আহ্বায়ক। তিনি বর্তমান ছাত্র হিসেবে সভাপতি পদের জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে দৌঁড় ঝাপ চালাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানায়। ত্যাগী নেতা আশরাফুল ইসলামও বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতিত ও মারধরের শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ ১৬ই এপ্রিল ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ছাত্রলীগের হাতে ব্যাপক মারধরের শিকার হন আশরাফুল ইসলাম। তার হাত পা ভেঙ্গে দেয় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা।

আশরাফুল ইসলামের নেতেৃত্বে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সময় বিক্ষোভ মিছিল ও স্মারক লিপি প্রদান করে ছাত্রদল।

এছাড়া সভাপতি পদ পেতে কেন্দ্রীয় বিভিন্ন পর্যায়ে নেতাদের মাধ্যমে লবিং চালাচ্ছেন আল বেরুনী হলের আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম দুর্জয়, শহীদ সালাম-বরকত হলের যুগ্ম আহ্বায়ক শহীদুল ইসলাম তুষার, আল বেরুনী হলের আহসান হাবিব ও আ ফ ম কামাল উদ্দিন হলের যুগ্ম আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম শামীম।

অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে মওলানা ভাসানী হলের যুগ্ম আহবায়ক শাহরিয়ার মজুমদার শিমুল, শিমুল ক্যাম্পাসে ক্লীন ইমেজের অধিকারী বলে সর্বমহলে পরিচিত। তিনি বিভিন্ন সময়ে ছাত্রদলের বিভিন্ন মিছিল মিটিং এ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সদস্য সচিব ইব্রাহীম খলিল বিপ্লব,তিনি বিএনপির বিভিন্ন মিছিল মিটিংয়ে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। বিপ্লব সাহসী ছাত্রনেতা হিসেবে ক্যাম্পাসে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে ক্যাম্পসে ছাত্রদলের বিভিন্ন মিছিল মিটিংয়ে নেতৃত্ব প্রদান করেন।

আ ফ ম কামাল উদ্দিন হলের সদস্য সচিব নবীনুল ইসলাম নবীন, আল বেরুনী হলের যুগ্ম আহবায়ক মিজানুর রহমান বাবুর নাম শোনা যাচ্ছে।

এছাড়া সাংগঠনিক সম্পাদক পদের জন্য লবিং এ ব্যস্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের যুগ্ম আহ্বায়ক কামাল হোসেন সৈকত, শহীদ রফিক-জব্বার হলের যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল কাদের মার্জুক, একই হলের ছাত্রদল কর্মী শামীম হোসেন, ওয়াসিম আহমেদ অনিক, আল বেরুনী হলের যুগ্ম আহ্বায়ক শফীকুল ইসলামসহ আরো অনেকেরই নাম শোনা যাচ্ছে।

এদিকে সভাপতি-সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে শাখা ছাত্রলীগ থেকে অনুপ্রবেশকারী ছাত্রদল কর্মীরাও। এমন অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে ক্যাম্পাসে ব্যাপক গুঞ্জন শুরু হয়েছে। ছাত্রদল কর্মীদের মারধর, ছাত্রলীগের ব্যানারে হামলা-ভাংচুর, ছিনতাই-চুরি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মে নেতৃত্বে ছিল বলে তাদের নামে অভিযোগ পাওয়া যায়। সেই বিতর্কিত ছাত্রলীগ কর্মীরা এখন বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিতে সক্রিয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানাসহ ৮ থেকে ১০ জন ছাত্রলীগ কর্মী ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তারাও বর্তমানে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।

এদের মধ্যে অন্যতম সোহেল রানা। শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নির্ঝর আলমের হাতে রাজনীতি শুরু করেন শহীদ সালাম-বরকত হলের এই ছাত্র। পরে ওই হলে মোবাইল ফোন চুরির অপরাধে তাকে হল থেকে বের করে দিলে তিনি আল বেরুনী হলের ছাত্রলীগ নেতা এমিলের কাছে আশ্রয় নেন এবং নির্ঝর-এমিলের সঙ্গে ছাত্রলীগের রাজনীতি শুরু করেন।

পরবর্তীতে ২০১০ সালের ৫ জুলাই ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের ভয়াবহ সংঘর্ষে সম্পাদক গ্রুপের অনুসারী সোহেল হামলায় অংশ নেন। ওই ঘটনায় ছাত্রলীগ সভাপতি গ্রুপের পক্ষে আব্দুল মালেক বাদি হয়ে সোহেলসহ সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের ১২জনকে আসামি করে মামলা করেন। সে মামলায় ছাত্রলীগ কর্মী সোহেল সাত নম্বর আসামী ছিলেন। তবুও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর এলাকায় বাড়ি হওয়ার সুবাদে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কমিটিতে যুগ্ম সম্পাদক পদ পান।

সেই ১২জনের মধ্যে ৬জন শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি-যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে রয়েছেন। প্রকৃত ছাত্রদল নেতাকর্মীরা জাবি ক্যাম্পাসে না আসতে পারলেও ছাত্রলীগের সঙ্গে আতাঁত করে সোহেল ক্যাম্পাসে মাঝে মধ্যে বিক্ষোভ মিছিল করেন। পরবর্তীতে সেই বিক্ষোভ মিছিলের ছবি কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নেতাদের কাছে পৌঁছে দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এ নেতা।

তবে এসব অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছেন সোহেল। এ বিষয়ে জানতে বৃহস্পতিবার তাকে একাধিকবার ফোন দিলেও পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে সোহেল গ্রুপের একাধিক কর্মীর সঙ্গে কথা বলেও তার সঙ্গে যোগযোগ করা সম্ভব হয়নি।

আরেক ছাত্রলীগ কর্মী মুরাদ হোসেন হীরা। প্রথম বর্ষে ছাত্রলীগের রাজনীতি শুরু করেন। সূত্র জানিয়েছে, ছাত্রলীগের মিছিল-সমাবেশসহ নানা কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায় তাকে। পরবর্তীতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা দেখে শুরু করেন ছাত্রদলের রাজনীতি। অনুপ্রেবেশকারী হওয়ায় ছাত্রদলের কোনো কমিটিতেই পদ পাননি তিনি। তবুও হাল ছাড়েননি তিনি।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে অবশ্য হীরা বলেছেন, ‘এটা ভুল তথ্য। আমি কখনো ছাত্রলীগের রাজনীতি করিনি।’

আরেক ছাত্রদল কর্মী ইসরাফীল চৌধুরী সোহেল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের যুগ্ম আহ্বায়ক। তার বিরুদ্ধে ডাকতিসহ মোবাইল ছিনতাইয়ের মামলা রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে ইসরাফীল বলেন, ‘এসব মামালা মিথ্যা ও বানোয়াট। এ সংক্রান্ত তথ্যদি থাকলে নিউজ করতে পারেন। না থাকলে দরকার নেই।’

কি ভাবছেন বিএনপিপন্থী শিক্ষকরা: বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. খন্দকার মুস্তাহিদুর রহমান বলেন, ‘সোহেলকে আমি ভালো করে চিনি। ও তো ছাত্রলীগের সঙ্গে ক্যাম্পাসে ঘোরাফেরা করে। সে ছাত্রদলের জন্য ডিজাস্টার (হুমকি)। ওকে সভাপতি করা হলে ত্যাগী ছাত্রদল নেতাদের বঞ্চিত করা হবে।’

নিয়মিত ছাত্রদের দিয়ে কমিটি গঠনের গুরুত্ব দিয়ে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের এই নেতা আরো বলেন, ‘জাতীয়তাবাদী শিক্ষকদের পরামর্শ নিয়ে কমিটি গঠন করা হলে ছাত্রদলের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে সুযোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসবে। তাতে জিয়ার আদর্শ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।’

জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. শামছুল আলম সেলিম বলেন, ‘যেসব ছাত্রদের ছাত্রত্ব নেই তাদেরকে দিয়ে যখন কমিটি হওয়ার আভাস শুনতে পাই, তখন আমাদের খুব খারাপ লাগে। আমরা চাই নিয়মিত ছাত্রদের দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কমিটি গঠন করা হোক।’

কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, সাধারণ ছাত্র ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা যাকে পছন্দ করে এমন ব্যক্তিকে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক করা হবে। যারা দলের জন্য কমিটেড (অনুগত) তাদেরকে গুরুত্ব দেয়া হবে।’ তবে কমিটি দিতে আরও কিছু সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।

এছাড়া ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান বলেন, ‘এদের অভিযোগগুলো আমাদের হাতে রয়েছে। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে কমিটি দেয়া হবে।’

উল্লেখ্য, এর আগে ২০১১ সালের ২৭ এপ্রিল জাকিরুল ইসলামকে সভাপতি ও আবু সাঈদ ভূইয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে জাবি শাখা ছাত্রদলের ১০ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করা হয়।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts