December 19, 2018

জাতীয় ঐক্য ও জামায়াত ইস্যুতে কঠিন ‘ভাবনার’ সম্মুখীন বেগম খালেদা

ঢাকাঃ একদিকে জাতীয় ঐক্য অন্যদিকে জামায়াত ইসলামী। এই দুই মিলিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কিছু ঘোলাটে অবস্থায় পড়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে থাকা বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী সর্ম্পকে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করতে পারছেন না জোটপ্রধান খালেদা জিয়া। পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের সকল অপচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে এখন কঠিন ‘ভাবনার’ সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

কারণ বিএনপির পক্ষ থেকে যে সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার বিষয়ে যতটুকু যোগাযোগ করা সম্ভবপর হয়েছে সেখানে ঘুরেফিরে একটি কথাই স্পষ্ট হয়ে উঠে এসেছে- আর তা হলো জাতীয় ঐক্য করতে হলে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির সর্ম্পকের বিচ্ছেদ ঘটাতে হবে। তাও আবার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে। যদিও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- জঙ্গিবাদ দমনে যাদের সঙ্গে ঐক্য হওয়া প্রয়োজন, তাদের সঙ্গে ইতোমধ্যে ঐক্য হয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই মুহূর্তে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সম্প্রতি দেয়া সাজার রায়কে একটি অশনিসংকেত হিসেবেই বিবেচনা করছেন দলটির নেতারা। কারণ তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। এছাড়া দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলা নিয়েও দলের ভেতরে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুই ডজনের বেশি মামলা থাকলেও দুটি মামলা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। চলতি বছরই এসব মামলার রায় ঘোষণা হওয়ার সম্ভাবনাও বাদ দেয়া যায় না।

বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, সরকারি দলের ভেতরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের আগাম প্রস্তুতিও বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়াকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। তিনি বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের মামলা এবং আগাম নির্বাচন প্রস্তুতির মধ্যে যোগসূত্র আবিষ্কারের চেষ্টাও করছেন।

এদিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মামলা নিয়ে খালেদা জিয়া নতুন করে চাপে পড়লেও গত কয়েক বছর ধরেই লক্ষ্যহীনভাবে বিএনপির রাজনীতি এগিয়ে চলছে। বিপর্যয় কাটাতে দলটির নেয়া কোনো পদক্ষেপই সফলতার মুখ দেখেনি। সর্বশেষ কাউন্সিলের পর চার মাস পেরিয়ে গেলেও কমিটির ঘোষণা এখনও মিলছে না।

সাধারণত কাউন্সিল হয়ে গেলে পূর্ববর্তী কমিটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। বিএনপির ক্ষেত্রে কী ঘটেছে তা পরিষ্কার নয়। যেমন পরিষ্কার নয়, বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কের বিষয়টিও। জোট থেকে জামায়াতকে বাদ দেয়ার জন্য বিএনপির ওপর ঘরে-বাইরে চাপ ক্রমশ বাড়ছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে জামায়াত ছাড়ছে বিএনপি বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী প্রফেসর এমাজউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য। যদি তার একদিন পর বুধবার(৩ আগস্ট) বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জামায়াত ইসলামী সর্ম্পকে প্রফেসর এমাজউদ্দিনের বক্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত মতামত, বিএনপি এটাকে সমর্থন করেনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চূড়ান্ত ঐক্যের আগেই বেশির ভাগ দল বিএনপির কাছ থেকে একসঙ্গে আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠনের সুস্পষ্ট ঘোষণা চায়। আর এটি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বে জোট গঠন করে সরকারের রোষানলে পড়তে রাজি নয় সরকারি জোটের বাইরে থাকা দলগুলো। তাই খালেদা জিয়ার চা খাওয়ার আমন্ত্রণে দু-একটি দলের সাড়া দেওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও খুব সহজে রূপ নিচ্ছে না বিএনপির প্রস্তাবিত জাতীয় ঐক্য। আদর্শিক কারণে এমন ঐক্য গড়তে রাজি নয় সিপিবি ও বাসদ। আর মূল বাধা বলে বিবেচিত জামায়াতকে পরিত্যাগ করলেও প্রগতিশীল দলগুলো সহজেই রাজি হয়ে যাবে, এমন সম্ভাবনাও কম। কারণ আদর্শিক ইস্যু ছাড়াও বিএনপির কাছে ওই দলগুলোর আরো অনেক দাবিদাওয়া আছে।

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর গত ৩ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার জন্য দল-মত-নির্বিশেষে সবার প্রতি আহ্বান জানান খালেদা জিয়া। তার এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে এরই মধ্যে দলটির নেতারা তৎপরতা শুরু করেছেন।

তাদের সিদ্ধান্ত হলো—প্রাথমিকভাবে চায়ের আমন্ত্রণ দিয়ে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত ওই ঐক্যকে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে রূপান্তরিত করা। ঐক্য গড়ে তোলতে আগ্রহী এমন দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বিএনপির নেতারা আলাপ-আলোচনাও শুরু করেছেন। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর এমাজউদ্দিন আহমেদ, গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রমুখ।

এদিকে বিকল্প ধারার সভাপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও তাঁর ছেলে মাহী বি চৌধুরী দুজনেই এখন যুক্তরাষ্ট্রে। ৯ আগস্ট তাদের দেশে ফেরার কথা রয়েছে। এ মুহূর্তে বিদেশে রয়েছেন গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনও।

তবে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী অবশ্য কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করে বলেন, ‘দেশে এখন ক্রান্তিকাল ও চরম অনিশ্চয়তা চলছে। আমরা এ অনিশ্চয়তা কাটাতে চাই। তাই তিনি ২০ দলীয় জোট প্রধান নয়, বিএনপি চেয়ারপারসন ও প্রকৃত বিরোধীদলীয় নেত্রী বিবেচনায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে আজ বৃহস্পতিবার সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে।’

খালেদা জিয়ার প্রস্তাবিত জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে নেপথ্যে ভূমিকা রাখা গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী স্বীকার করেন, বৃহত্তর ঐক্য করতে হলে কতগুলো কর্মসূচির ব্যাপারে একমত হতে হবে, এটি ঠিক এবং সেখানে রাজনীতিতে সমঝোতার ব্যাপারগুলোও আসতে পারে।কিন্তু প্রাথমিকভাবে এখন কেবল বিএনপি চেয়ারপারসন সবাইকে চা-চক্রের আমন্ত্রণ জানাবেন। সুতরাং সেখানে শর্ত আরোপ করা ঠিক হবে না।

১৯৯৯ সালের ৬ ডিসেম্বর চারদলীয় জোট গঠনের পর ঘোষিত যৌথ ইশতেহারে একসঙ্গে আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছিল; যার সূত্র ধরে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, অলি আহমদ ২০ দলীয় জোটে ফিরলেও বি চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্প ধারাকে বিএনপি এখন বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে সম্পৃক্ত করতে চায়। তবে সর্বশেষ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে ওই দুই নেতা বিএনপির হাতে অপদস্থ হয়েছেন বলে মনে করা হয়। ফলে বি চৌধুরীকে বিএনপির সঙ্গে আনতে হলে তার নিজের পদ বা অবস্থানের পাশাপাশি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বিষয়টি এখন সামনে চলে আসছে।

এ ছাড়া ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম, আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য, সিপিবি ও বাসদসহ সরকারের বাইরে থাকা দলগুলোকে নিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে চায় বিএনপি। যদিও ড.কামাল হোসেন গত মেয়াদে একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ চেয়েও পাননি।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হাইকোর্টের রায় স্থগিত না হলে তারেক রহমান আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়ার মামলার দিকেও দৃষ্টি রাখছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। জিয়া অরফানেজ এবং চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় দ্রুতই রায় ঘোষণা হতে পারে।

দুর্নীতির এসব মামলায় যদি খালেদা জিয়ার সাজা হয় তাহলে তার নির্বাচনে অংশ নেয়াও অনিশ্চিত হয়ে যাবে। তাছাড়া, তিনি যদি কারাগারে থাকেন সে অবস্থায় দল পরিচালনা নিয়েও সংকট তৈরি হবে। ওয়ান ইলেভেনের পর খালেদা জিয়া গ্রেফতার হলে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। এতোদিনেও সে ধকল কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। যদিও সে সময় খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন বিশ্বস্ততা ও সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু দলের একতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান রাজনীতির মাঠে না থাকলে বিএনপির নেতৃত্ব দেবেন কে?

Related posts