September 19, 2018

জাগপা’র ৩৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যা বললেন খালেদা জিয়া!

ঢাকাঃ   জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা’র ৩৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় কনভেনশনে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া। শনিবার বিকেলে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে এ অনুষ্ঠান হয়।

খালেদা জিয়ার পুরো বক্তব্য

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

জনাব সভাপতি,

জাগপা নেতৃবৃন্দ,

২০ দলীয় জোট ও বিএনপি’র নেতৃবৃন্দ,

উপস্থিত ভাই ও বোনেরা,

আস্সলামু আলাইকুম।

জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা’র ৩৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এই দলের সঙ্গে জড়িত সকলকে আমি শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

এ উপলক্ষে আয়োজিত আপনাদের জাতীয় কনভেনশনে আমাকে প্রধান অতিথি হিসাবে সম্মানিত করায় ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

আমাদের সঙ্গে ২০ দলীয় জোটে থেকে জাগপা দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অধিকার কায়েমের সংগ্রামে সাধ্যমতো ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

আপনাদের দলের নেতা-কর্মীরাও কারা নির্যাতন ও জুলুম-অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন।

দল হিসাবে জাগপা ছোট হতে পারে। কিন্তু দেশজাতির সংকটের সময়ে আপনারা যে দেশপ্রেম ও সাহসের পরিচয় দিচ্ছেন তা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

জাগপা’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় কনভেনশনে আমাকে প্রধান অতিথি হিসাবে সম্মানিত করায় আমি আনন্দিত।

প্রিয় ভাই-বোনেরা,

দেশজাতির এক গভীর সংকটকাল চলছে। দেশে গণতন্ত্র নেই। জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার নেই। বৈধ সংসদ নেই। তথাকথিত সংসদে কোনো কার্যকর বিরোধী দল নেই। নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে।

আজ বাংলাদেশে সুশাসন নেই। সুবিচার নেই। রাষ্ট্রীয় প্রথা ও প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। আইনের শাসন নেই। নেই কোনো মানুষের নিরাপত্তা। সরকার কাউকে কোথাও কোনো নিরাপত্তা দিতে পারছে না। তবুও দাবি করছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক। যা কিছু ঘটছে তা সব বিচ্ছিন্ন ঘটনা।

অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীগুলো স্বাভাবিকভাবে আইন অনুযায়ী তাদের কর্তব্য পালন করতে পারছে না। তাদেরকে রাখা হয়েছে শুধু গণবিচ্ছিন্ন ও অবৈধ সরকারকে জনগণের ক্ষোভ থেকে রক্ষা করার জন্য। তারা সাধারণ মানুষের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে। বিচার বহির্ভূতভাবে যাকে খুশি তাকে হত্যা করছে। জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে গুম ও খুন করে ফেলছে। যেখানে সেখানে খুনের শিকারদের লাশ পাওয়া যাচ্ছে। অনেকের লাশের সন্ধানও মিলছে না। জুলুম, নির্যাতন, গ্রেফতার, হামলা, মামলা চলছে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের উপর। অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বাড়ি ছাড়া। গ্রেফতার ও নির্যাতনের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে সম্মানিত নাগরিকদেরকেও নির্যাতন করা হচ্ছে।

দেশে কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থা নেই। প্রতিদিন গড়ে ১৪ জন মানুষ খুন হচ্ছে। নারী ও শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না।

গত তিন মাসে পত্রিকার হিসাবে দেড় হাজার লোক খুন হয়ে গেছে। দুর্নীতি ও লুটপাট করে দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। শেয়ার বাজার থেকে লক্ষ কোটি টাকা লুটে নেয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদেরকে নিঃস্ব করে ফেলা হয়েছে। ব্যাংকগুলো থেকে লুটপাট হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভের আটশো কোটি টাকা ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে পাচার করা হয়েছে। দফায় দফায় অবিশ্বাস্য রকমের ব্যয় বাড়িয়ে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো থেকে কোটি কোটি টাকা লুণ্ঠন করা হচ্ছে।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,

গুপ্তহত্যা এবং অতর্কিতে হামলা চালিয়ে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ব্লগার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, লেখক, প্রকাশক, বিদেশী নাগরিক, দূতাবাস কর্মী এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোকেরাও এ ধরণের হামলা ও হত্যার শিকার হচ্ছে।

আতংকের ব্যাপার হচ্ছে, বিভিন্ন জঙ্গীগোষ্ঠির নামে এই সব হত্যার দায় স্বীকার করা হচ্ছে। এইসব ঘটনায় প্রতিটি নাগরিক আজ নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত ও উদ্বিগ্ন। সরকার এসব হামলা ও হত্যার ঘটনা বন্ধ করতে পারছে না। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের উপস্থিতির কথা তারা অস্বীকার করছে। কিন্তু প্রকৃত অপরাধীদের সনাক্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না। বরং তারা এর দায়-দায়িত্ব চাপাচ্ছে বিরোধী দলের উপর। এতে তদন্ত প্রভাবিত হচ্ছে এবং প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

প্রিয় ভাই-বোনেরা,

আপনারা জানেন, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসন আমলে এদেশে প্রথম জঙ্গীবাদের বিস্তার ঘটেছিলো।

সে সময়, রমনার বটমূলে বর্ষবরণ উৎসব, যশোরে উদীচীর সাংস্কৃতিক আয়োজন, ঢাকার পল্টনে সিপিবি’র জনসভায়, বানিয়াচংয়ের গির্জায়, খুলনায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে বোমা হামলার ঘটনায় অনেক মানুষ হতাহত হয়েছিলো। তখনও প্রকৃত সন্ত্রাসী ও জঙ্গীদের আড়াল করে আওয়ামী লীগ দায় চাপিয়েছে বিএনপি ও বিরোধী দলের উপর।

আমরা নির্বাচিত হয়ে সরকারে আসার পর, জঙ্গীবাদী তৎপরতাকে কঠোর হাতে দমন করেছিলাম। জঙ্গী নেতাদের গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় আনা হয়েছিলো। তাদের নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ অকার্যকর করে ফেলা সম্ভব হয়েছিলো। আজ আবার সেই জঙ্গীবাদের উত্থানের আলামত দেখে আমরা দেশবাসীর সঙ্গে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বর্তমান সরকার এর দায় এড়াতে পারে না। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি ও আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে রুদ্ধ করে দিয়ে তারাই জঙ্গীবাদের উত্থানের পথ করে দিচ্ছে বলে আমরা মনে করি। আমরা মানুষের নিরাপত্তা চাই। আমরা সকলের জন্য নির্বিঘ্নে জীবন চাই। আমরা মনে করি সেই নিরাপত্তা সরকারকেই দিতে হবে। বর্তমান সরকার বৈধ নয়। কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতা তো তারা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। কাজেই নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব তাদেরকেই পালন করতে হবে। তারা সেই দায়িত্ব এড়িয়ে চলছে। তারা বলছে, সকলকে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। এই কথা বলে, এইভাবে দায়িত্ব এড়িয়ে কারো ক্ষমতায় থাকার অধিকার থাকে না।

প্রিয় ভাই-বোনেরা,

কোনো শ্রেণী-পেশার মানুষ আজ ভালো নেই। কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। অথচ তাদের উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। কোথাও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সীমিত আয়ের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎখাতে দুর্নীতি ও লুটপাটের অবাধ লাইসেন্স দেওয়া হলো। তারপরেও ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে জনজীবন আজ অতিষ্ঠ। আজ যে সীমাহীন নির্যাতন ও লুটপাট চলছে বাংলাদেশের মানুষ এর আগে তা কখনো দেখেনি।যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতে একটি মামলার রায় নিয়ে এখন আমাদের দেশে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কি সে মামলা? এফবিআইয়ের একজন এজেন্টকে ঘুষ দিয়ে এক প্রবাসী বাংলাদেশী তরুণ বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের ব্যাপারে কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিলো। সেই মামলার নথিতেই আছে প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের একটি একাউন্টেই আড়াই হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ তিনশো মিলিয়ন ডলার জমা আছে।

এই টাকা কোথা থেকে গেছে? এই টাকার উৎস কী? এভাবে তাদের আরো কতো টাকা আছে, বাংলাদেশের মানুষ তা জানতে চায়? বাংলাদেশের মানুষ মনে করে এই টাকা বাংলাদেশের জনগণের টাকা। এভাবে দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে অর্জিত বিপুল টাকা বিদেশে পাচার করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা হয়েছে। এ নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। এ টাকা ফিরিয়ে আনা দরকার। কিন্তু এ টাকার ব্যাপারে সরকার নীরব।

তারা এই টাকার কথা ধামাচাপা দিতে প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমানকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করেছে।

কারারুদ্ধ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকেও এই মামলায় জড়িয়ে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে, তারা না-কি প্রধানমন্ত্রীর পুত্রকে অপহরণ ও হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের রায়েই এধরণের অভিযোগকে নাকচ করে দেয়া হয়েছে। এভাবে মিথ্যা প্রচারণা, অত্যাচার, নানা ইস্যু সৃষ্টি করে তারা তাদের অপরাধগুলো ঢেকে রাখতে চায়। জনগণের দৃষ্টিকে অন্যদিকে সরিয়ে দিতে চায়।

প্রিয় ভাই-বোনেরা,

এভাবে দেশ চলতে পারে না। দেশে গণতন্ত্র আনতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সুবিচার ফিরিয়ে আনতে হবে। জুলুম-নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। শান্তি ও নাগরিকদের নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে হবে। সেজন্য যে সেখানে আছেন সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম করতে হবে।

রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই স্বাধীনতাকে সব মানুষের জীবনে অর্থবহ করে তুলতে হবে। আমরা একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসাবে প্রতিবেশীসহ সকল দেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও মৈত্রীর সম্পর্ক চাই। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব দেশের সঙ্গে সকল সমস্যা নিরসনের নীতিতে আমরা বিশ্বাসী। তবে একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে আমরা সবকিছুই করবো সমমর্যাদার ভিত্তিতে। আমরা কারো কাছে মাথা নত করবো না।

বর্তমান ক্ষমতাসীনদের কোনো গণভিত্তি নেই। জনগণের মধ্যে তাদের কোনো সমর্থন নেই। তাই তারা অন্যের শক্তির উপর ভর করে দেশের মানুষকে পদানত করে রাখতে চায়। এভাবে বেশিদিন চলা যায় না।

আমি মনে করি বর্তমান শাসকেরাও এইভাবে বেশিদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। তাই তাদেরকে বলবো, দেশের মানুষের উপর নির্ভর করুন। দেশের অভ্যন্তরে যে সংকট সৃষ্টি করেছেন তা দেশের ভেতরেই আলাপ-আলোচনার পথে নিরসন করুন। সময় দ্রুত বয়ে যাচ্ছে। আর সময় ক্ষেপনের চেষ্টা করবেন না।

এই কথাটুকু বলে সকলকে ধন্যবাদ দিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি।আল্লাহ হাফেজ, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন ডেরি/৩০ এপ্রিল ২০১৬

Related posts