September 25, 2018

জঙ্গীবাদ রাষ্ট্র জাতিস্বত্বা ও একটি পর্যালোচনা

এ্যাডঃ তৈমূর আলম

প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বর্তমান সেরা সংবাদ রাষ্ট্রীয় সরকারী/বেসরকারী ব্যাংক লোপাট, গুম, খুন, আর ক্রয় ফায়ার, নতুন করে সাথে যোগ হয়েছে জঙ্গীবাদ, ইতোপূর্বে এ দেশে যা সংগঠিত হয় নাই। সরকারের ভাষ্য বিএনপি ও খালেদা জিয়ার মদদে দেশব্যাপী এ হত্যাজজ্ঞ চলছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের গৌরবে গৌরব্বান্বিত এ জাতির নিকট তদন্ত আর দৃশ্যমান হচ্ছে না। মিডিয়ার মাধ্যমে প্রকাশ, ফেইস বুকে পোষ্টিং এর মাধ্যমে আই.এস. সকল খুনের দায়িত্ব স্বীকার করছে। সরকার বলছে দেশে আই.এস নাই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে আই.এস সৃষ্টি হয়েছে আমেরিকার অর্থায়নে। আর্ন্তজাতিক ক্ষ্যতিসম্পন্ন কুটনৈতিক হেনরী কিমিঞ্জারও একই মত পোষন করেন। মুসলিম বিশ্বকে অস্থিতিশীল করার পিছনে আমেরিকা অর্থ যোগান দিবে-একথা বিশ্বাস করার যথেষ্ট যুক্তি আছে। কিন্তু এই আই.এস একদিন আমেরিকার বিষফোড়া হবে বা হচ্ছে এটুকু উপলব্দি করার জ্ঞান বুদ্ধি কি আমেরিকার নাই? যে আমেরিকা গোটা বিশ্বের রাজনীতি, অর্থনীতি, কুটনীতি সহ সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করার জোতদারী নিয়েছে! অন্যদিকে বৃটেন/আমেরিকা থেকে শত শত শিক্ষিত যুবক/যুবতী আই.এস এ যোগদেয়ার কথাও মিডিয়াতে ভেসে আসছে প্রতি নিয়ত। এটা প্রতি হিংসার জিংঙ্গাসা না আদর্শিক কোন চেতনা? এটা ভাবার সময় কি এখনো হয় নি? এক সময় বৃটিশরা গোটা বিশ্ব জয় করেছিল। প্রবাদ ছিল “বৃটিশ রাজ্যে সূর্য অস্তমিত হয় না।” এখন গোটা সাদা চামড়াভুক্ত বিশ্ব থেকে তারা আলাদা হওয়ার পায়তারা করছে; না কি পৃথিবী তাদের থেকে মূখ ফিরিয়ে নিচ্ছে?

আর্ন্তজাতিক প্রেক্ষাপট ছেড়ে দেশের আভ্যন্তরিন বিষয় যদি পর্যালোচনা করি তবেও চিন্তা শক্তির মাপকাঠিতে (রাডার) দেশ কোন দিকে এগুচ্ছে তার প্রতিচ্ছবি ভেসে আসে না। তবে সরকারের রাডারে (জঅউঊজ) কি ধরা পড়ে তা সরকারই জানে। গোয়েন্দারা এখন দেশের নিরাপত্তার জন্য গোয়েন্দা গীরিতে ব্যস্ত না থেকে রাজনীতি নিয়ন্ত্রনে বেশী ব্যস্ত। এস.পি বাবুল আক্তারের স্ত্রী খুন হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল বলেছেন যে, এ খুনের পিছনে আর্ন্তজাতিক গোয়েন্দারা জড়িত। ডি.এম.পি (মনিরুল) বলেছিলেন, এস.পি বাবুল আখতারের স্ত্রী হত্যা বিদেশীদের ষড়যন্ত্র (উল্লেখ্য, ১৯৫৪ ইং সনের ১৭ই মে এক ভাষণে পাকিস্তানের তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলন’কে “বিদেশী ষড়যন্ত্র” বলে অভিহিত করেছিলেন)। তবে কি আমাদের দেশীয় গোয়েন্দারা আর্ন্তজাতিক গোয়েন্দাদের নিকট বিক্রয় বা নিয়ন্ত্রনে চলে গেছে? “বিদেশী ষড়যন্ত্র” কথাটি শুধুই লিপ সার্ভিস? না বাস্তবতার প্রতিদ্বন্নি?

প্রধানমন্ত্রী সৌদী আরব থেকে ফিরেই বলেছেন যে, সম্প্রতিকালে দেশব্যাপী ঘটে যাওয়া এ হত্যাকান্ডগুলি কারা করে তা তিনি জানেন। ইতোপূর্বে এ ধরনের সকল কর্মকান্ডের জন্য খালেদা জিয়া ও বিএনপি’কে দায়ী করেই তিনি বক্তৃতা বিবৃতি দিয়েছেন এবং সেনুপাতে অনেক মামলায় খালেদা জিয়া ও তার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে সরকার চার্জশীট দিয়েছে। দেশব্যাপী তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও এ চার্জশীট নামক আঘাত থেকে রেহায় পায় নি। বাজেট অধিবেশনে সংসদে প্রধানমন্ত্রী অনুরূপ বক্তব্যই দিয়েছেন।

পুলিশের স্ত্রী খুন হওয়ার কারণে ১৫ হাজার লোককে কারাবন্দী করা হয়েছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশ কারাগারে ধারণ ক্ষমতার চেয়েও তিনগুন বেশী কারাবন্দী রয়েছে। পত্রিকা বলছে কোন কোন জেলখানার বাথরুমে বন্দীদের রাত্রি যাপন হচ্ছে। গোয়েন্দাদের রিপোটের উপর ভিত্তিকরে নিরাপত্তা জনিত কারণে কারাগারগুলিতে রেড এলার্ট জারী করা হয়েছে। কারাগারে “রেড এলার্ট” মানে কি, তা বুঝার জন্য কিছু দিন কারাবন্দী না থাকলে তা বুঝা যাবে না। কারাগার এমনিতেই জেল কর্মকতাদের অধিনে একটি আলাদা “জমিদারী পরগনা” যার একমাত্র কর্নধার তারা। সেখানে চলে না কোন আপত্তি, চলে না কোন প্রতিবাদ; তবে ঘুষ চলে। যারা (রাজনৈতিক নেতা) একবার জেল খাটেন তারা সকলেই জেলের
অসুবিধার কথা বলে এর উন্নতি ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন সত্য, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে প্রতি পক্ষকে নির্যাতনের উদ্দেশ্যে বন্দীদের অধিকার নিশ্চিত করার পরিবর্তে অধিকার খর্ব করার প্রচেষ্ঠায় লিপ্ত থাকেন যেমনটি করছে এ সরকার (উল্লেখ্য, একটি কাচের ঘরে রিমান্ডের জন্য জিজ্ঞাসাবাদের বিধি বিধান সুপ্রীম কোর্ট থেকে করে দেয়া হলেও এর কোন বাস্তবায়ন হয় নাই) মিতু হত্যার তদন্তও রহস্য জনক হয়েছে স্বামী এস.পি’কে ১৫ ঘন্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর। পুলিশ স্ত্রী হত্যার ২ আসামী (ভোলা ও মনির) ক্রস ফায়ারে নিহত হওয়ায় হত্যাকান্ডে এস.পি বাবুলের জড়িত থাকার বিষয়টি আরো ঘনীভূত হলো।

বাবুলকে পদত্যাগে বাধ্য করার খবর পত্রিকায় এসেছে। বাবুল যদি দোষী হয় তবে তাকে বিচারের আওতায় আনার পরিবর্তে পদত্যাগের বাধ্য করার কথা উঠছে কেন? সব কিছু পর্যালোচনা করলে সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। ভোলা ও মনিরের ক্রস ফায়ারের পর এস.পি বাবুল যে ক্রস ফায়ারের আওতায় আসবে না তারও নিশ্চয়তা কি? অথবা বলা হবে না যে, জঙ্গী দমনে তিনি নিহত হয়েছেন। ফলে জনতার নিকট সব কিছুই অন্ধকারাচ্ছন্ন রয়ে গেল। বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা জাফর উল্ল্যাহ চৌধুরী (গণস্বাস্থ) ১৫ ঘন্টা জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়াদি ইউটিউবে ছেড়ে দেয়ার দাবী জানিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধার এ দাবীটি অবশ্যই যুক্তিযুক্ত।
জঙ্গীবাদের প্রসার নিয়ে কথা উঠেছে; সম্প্রতিকালে “মাদ্রাসায় জঙ্গী প্রশিক্ষণ দেয়া হয়” এ দাবী জোরে সোরে করে আসাছে একদল বুদ্দিজীবি যাদের অনেকেই মুসলমানের সন্তান। মাদ্রাসা শিক্ষা একটি বুনিয়াদী শিক্ষা ব্যবস্থা। ইংলেন্ডের লিংকন্স্ ইন এর প্রতিষ্ঠার পূর্বে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে “আসহাবে সুফফাদের” শিক্ষা দানের মাধ্যমে মদীনায় মসজীদে নববীতে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়। ভিন্নমতে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর হাতে ৬১০ খ্রিস্টাব্দে  কোরআন নাজিল হওয়ার শুরুতেই মক্কাতে প্রতিষ্ঠিত“দারুল আরকানই” পৃথিবীর সর্বপ্রথম মাদ্রাসা।

লিংকন্স্ ইন এ পৃথিবীর সকল দেশের মানুষ আইন পেশায় উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য ভিড় জমায়। অথচ সেই শিক্ষা ব্যবস্থার পূর্বেই মাদ্রাসা শিক্ষা পদ্ধতি চালু ছিল। ইসলাম যেখানে সম্প্রসারিত হয়েছে সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাদ্রাসা। ভারত বর্ষে গর্ভনর লর্ড ওয়ারেন হেষ্টিংস ১৭৮০ ইং সালে কলিকাতা আলীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করেন। ইউরোপেও মাদ্ররাসা আছে। সেখানের ইউনিভারসিটি অব গ্রানাডা এক সময় “কর্ডোভা মাদ্রাসা” নামে পরিচিত ছিল। গুলশান ট্রাজিডিতে প্রমাণ হয়েছে যে, মাদ্রাসার নয় ইংরেজী শিক্ষিত আধুনিক অভিজাত পরিবারের সন্তানরাই জঙ্গী যাদের পরিবারে আওয়ামী নেতৃত্বের রেফারেন্স রহিয়াছে। অতএব, মাদ্রাসার মাধ্যমে জঙ্গীবাদ বা উগ্রবাদ সৃষ্টি হচ্ছে এ কথা বলা ও বিশ্বাস করার কোন যুক্তি নাই। ফলে নাস্তিক তথাকথিত মুক্তমনাদের মাদ্রাসা জনিত মিথ্যাচার জনগনের নিকট দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে গেল।

প্রচার প্রবাকান্ডার মাধ্যমে গোটা বিশ্বে মুসলমানদের জঙ্গী ও উগ্রবাদী বানানো হচ্ছে। অথচ উগ্রবাদের জম্ম দিয়েছে পশ্চিমা সাদা চামড়া। যুদ্ধকালিন বা যুদ্ধ জয়ের পর কোন নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও নিরস্ত্র ব্যক্তির উপর আঘাত হানতে নবী করিম (সাঃ) সরাসরি নিষেধ করেছেন। পরাজিতদের জিজিয়া কর প্রদানের মাধ্যমে মক্কাতেই বসবাসের অনুমতি দিয়েছেন। অথচ সাদাদের ষড়যন্ত্রে  মুসলমানরাই আজ জঙ্গীবাদ বা উগ্রবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত। মদীনা শরীফে যে বিষ্ফোরন হয়েছে সেটাও কি কোন মুসলমান করেছে? একজন মুসলিম কি কাবা বা রওজা শরীফে বিষ্ফোরন ঘটাতে পারে? যে আমেরিকা মানবতার কথা বলে সে আমেরিকাই মুসলিম বিশ্বে দখলদ্বারিত্বের মাধ্যমে খুনখারাবী শুরু করেছে। সাদ্দামের নিকট অস্ত্র ভান্ডার আছে এই মিথ্যা অজুহাতে ইরাক’কে ধ্বংস করেছে। সম্প্রতিকালের তদন্ত রিপোর্টে সাদ্দামের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু এ জন্য যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিচারের দাবীতে কোন দিন বিশ্বস্বোচ্চার হবে কি?

বাংলাদেশে কোন নাশকতা ঘটলেই সরকার বলে বিএনপি ঘটিয়েছে। অন্যদিকে ওয়েবসাইটে আই.এস. এ সব ঘটনার দ্বায় স্বীকার করে। পুলিশ প্রধান এ.কে.এম. শহীদুল হকের মতে ইসরাইলের এক নারী ইন্টারনেটে এসব বিবৃতি দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন উঠে ইসরাইলী সেই নারী কি ঐ দেশের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের গোয়েন্দা? ১৪/৫/২০১৬ ইং তারিখে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত সংবাদ মতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে আই.এস কোন কথা বলে না। তবে কি বিশ্বে মুসলমানদের বির্তর্কিত করার জন্যই এই আর্ন্তজাতিক ষড়যন্ত্র?

সম্প্রতিকালের হত্যাকান্ডের টার্গেট করা তা বিশ্লেষন করা দরকার। দেখা যাচ্ছে তথাকথিত মুক্তমনা, একই ধর্মের অথচ ভিন্নমত পোষনকারী ইমাম, পীর মোসায়েক, গীর্জা/মন্দিরের সাথে সম্পৃক্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন, বিদেশী নাগরিক, অতি সম্প্রতি নারী হত্যা, যেমন-কুমিল্লা তনু, চট্টগ্রামে মিতু ইত্যাদি ইত্যাদি। সাগর-রুনি থেকে শুরু করে তনু হত্যা পর্যন্ত কোন হত্যার কুল কিনারা সরকার করতে পারে নাই। যেমনটি তৎপরতা দেখাচ্ছে পুলিশ স্ত্রী মিতুর বেলায়। আওয়ামীলীগে বেয়াদব নামে ক্ষ্যত সাবেক মন্ত্রী হাসান মাহমুদ এম.পি বলেছেন যে, মিতু হত্যায় যারা ধরা পড়েছে তারা সকলেই বিএনপি’র লোক। এটা নতুন কথা নয় বরং সরকার প্রধানের বক্তব্যেই প্রতিচ্ছবি। তনু হত্যার তদন্ত দেখলে গা শিউরিয়ে উঠে। কারণ সেনানিবাস এলাকায় এমন একটি হত্যা কান্ডের তদন্ত নিয়ে যে ধ্রমজাল সৃষ্টি হয়েছে সাগর-রুনির মত তা একদিন এমনিতেই হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। তবে দেশের মানুষ এ সকল হত্যা কান্ডের তদন্ত রিপোর্ট জানতে চায়।

বার বার প্রশ্ন আসে জঙ্গী দমন নিয়ে সরকার কতটুকু সফল? এর বিচার বিশ্লেষণ পাঠক সমাজই করবে। কিন্তু প্রতিটি বিষয়ে বিএনপি’কে টার্গেট করতে গিয়ে প্রকৃত জঙ্গী সম্পর্কে সরকার কি খেই হারিয়ে ফেলেছে? একটি সত্যসিদ্ধ প্রবাদ রয়েছে যে, “রাজা যা বলে সভাসদ বলে এর বহুগুন।” সরকার ও দলীয় প্রধান যখন জঙ্গীবাদ দমনের জন্য বিএনপি’কে কোনঠাসা করার উদ্দ্যেগ গ্রহণ করে; অন্যদিকে নাস্তিক বুদ্দিজীবিরা যথন জঙ্গী মাদ্রাসা থেকেই উৎপত্তি হচ্ছে বলে জনগনকে বদ্দমূল ধারনা দিচ্ছে; সেখানে আর্ন্তজাতিক গোয়েন্দা সংস্থারা ঘটনা প্রবাহের মোড় কোন দিকে ঘুড়াচ্ছে, তা একমাত্র তারাই ভাল বলতে পারবে।

জঙ্গী ও আই.এস আছে কি নাই তা এখন পর্যন্ত তথ্য ভিত্তিক কোন সংবাদ সরকার জনগণকে দিতে পারে নাই বরং এক এক সময় ভিন্নতর কথা বলায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় কিছু কিছু বিষয়ে রাষ্ট্রীয় ঐক্যমত দরকার জাতির অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে। কিন্তু বর্তমান সরকার জাতীয় ঐক্যের কথা কোন কোন ক্ষেত্রে বলে, কিন্তু (তাদের মতে) তা হতে হবে বিএনপি’কে বাদ দিয়ে যারা তিন বার এ দেশে সরকার গঠন করেছে। ফলে এ সরকারের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যের কোন সম্ভবনাতো নাই বরং বিএনপি’কে নিঃশেষ করার জন্য যা যা করা দরকার সরকার তাই করছে। মূলত অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, জঙ্গী দমন নয় বিএনপি দমনই সরকারের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, জাতীয় ঐক্যমত দরকার। জাতীয় ঐক্যমত ব্যতিত এ সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে কি?

বাম রাজনীতিরা মুসলমানের সন্তান হয়ে ইসলামিক সেন্টিমেন্টকে সহ্য করতে পারে না। নাস্তিক বুদ্দিজীবিরা কোলকাতাকে অনুশরণ করেন। ভারত মাতাকেই তারা “মা” মনে করেন। জাতিস্বত্তা তাদের মধ্যে থেকে বিলীন হয়ে গেছে বলেই তারা মাদ্রাসা শিক্ষার জোড়ে শোরে বিরোধীতাও করলেও বর্ডার এলাকায় ভারতীয় সেনা (বি.এস.এফ) কর্তৃক প্রতিনিয়ত বাংলাদেশী খুনের প্রতিবাদতো দূরের কথা, দুঃক্ষও প্রকাশ করে না। পাছে যদি বন্ধুরা অসন্তোষ্ট হয়ে যায়। জাকের নায়েকের বিরুদ্ধে জঙ্গী তৎপরতা অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় পূর্বেই সরকার পীস টি.ভি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারতের ষ্টার প্লাস, ষ্টার জলসা, ষ্টার মুভিজ, জি বাংলা প্রভৃতি ভারতীয় টি.ভি সিরিয়েলগুলি বাংলাদেশের পরিবারগুলিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জাল বিস্তারে প্রভান্বিত করছে। এ ধরনের সিরিয়েল প্রচার বাংলাদেশে বন্ধ রাখা দরকার। এ চ্যানেলগুলি ভালো জিনিস উপহার দেয় না বরং ঘর সংসার কি ভাবে নষ্ট হবে তা শিক্ষা দেয়। জঙ্গী দমনের পাশাপাশি অপসংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে জাতি মুক্ত হওয়া দরকার। এ সম্পর্কে তথাকথিত বুদ্দিজীবিদের কোন বক্তব্য নাই।

০১/৭/২০১৬ ইং তারিখে ইফতারের পর গুলশান এলাকায় অবস্থিত একটি স্পেনিস হোটেলে জঙ্গী হামলায় বাংলাদেশে জঙ্গী হামলার বা জঙ্গী অবস্থানের একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে যা ঘটেছে বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রে। পূর্বেই বলেছি যে, জঙ্গীর শিকড় কতটুকু গভীরে তা এ সরকারের রাডারে বা চিন্তা/দৃর্ষ্টিশক্তির ভিতরে নাই। যদি থাকতো সরকার তবে ইতোপূর্বে সংগঠিত জঙ্গী হামলার জন্য খালেদা জিয়া বা বিএনপি’কে দায়ী করেই তার দায়িত্ব শেষ করতেন না।

আই এস পি আর বক্তব্য মতে গুলশানের এই জঙ্গী দমন অপারেশনের পর দিন অর্থাৎ ০২/৭/২০১৬ ইং সকাল ৭-৪০ মিঃ এ শুরু হয়ে প্রায় আধ ঘন্টা সময়ের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ১ জন জঙ্গীকে জীবিত সহ ১৩ জন (নারী পুরুষসহ) জীবিত উদ্দার করে। হামলায় ১ম পর্যায়ে গোলাগুলিতে ২ জন পুলিশ অফিসার জঙ্গীদের গুলিতে মৃত্যুবরণ করে এবং ২৬ জন পুলিশ গুলি বিদ্ধ অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে, কেহ অসংখ্যাজনক এবং কেহ আসংখ্যামুক্ত। আই এস  পি আর এর মতে হোটেলের ভিতরে ২০ জনের লাস পাওয়া গেছে যাদের নির্মম ভাবে জবাই করা হয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু এ মর্মে কোন সন্দেহ নাই। আযান হলেই মসজীদগুলি কানায় কানায় ভরে যায়। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক সম্পৃতির একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত যে দেশে রয়েছে সে দেশের জনগনের জন্য এমন একটি পরিস্থিতি হজম করাও দুষ্কর ব্যাপার।

ইতোমধ্যে প্রমান হয়েছে যে, সরকার স্ববিরোধী কথা বলছে যাতে জনগণ প্রতিনিয়তই বিভ্রান্ত হচ্ছে। এমতাবস্থায়, রাষ্ট্র যন্ত্রকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে জনগণকে সঠিক ম্যাসেস দেয়া দরকার। জঙ্গী দমনে বা জঙ্গী উত্থান রোধের বিষয়টি সরকার সঠিকভাবে অফফৎবংং করতে পারছে না বলেই প্রতিয়মান হচ্ছে। সে পুরানো কথায়ই ফিরে আসতে হয়, তা হলো যে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র থাকে না সে দেশে জঙ্গী উত্থান হয়। জঙ্গী বা মতান্তরে আই.এস.এর তৎপরতার মাত্রা যদি একটু বৃদ্ধি পায় তবে রাষ্ট্র যন্ত্রের কি হবে জানি না তবে শান্তি নামক পায়রাটির অপমৃত্যু হবে। তাই সকল স্বার্থে ত্যাগে এর সমাধান খুজে বের করা দরকার।

খালেদা জিয়া জঙ্গী দমনে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। অতীতের সব ভূল ভ্রান্তি ও গ্লানি ভুলে গিয়ে জাতির স্বার্থ রক্ষার দাবী জানিয়েছেন যা সরকার ইতোমধ্যে প্রত্যাক্ষান করেছে। সরকার বিদেশীদের সাথে আলোচনা করে, জঙ্গী দমন বিষয়ে ভাবের আদান প্রদান করে, এমন কি পারস্পরিক সহযোগীতাসহ বিশেষজ্ঞ আদান প্রদানের কথাও বলে। কিন্তু দেশীয় প্রতিপক্ষের সাথে সরকারের বসতে অনীহা এবং নানা প্রকার শর্তের ঝনঝনানি।

নিশা দেশাই প্রতি নিয়তই সাহায্যের ডালা নিয়ে বাংলাদেশে আসেন এবং ফিরে যাওয়ার সময় এমন কথা বলেন যার মমার্থ বুঝা যায় অনেক পরে তাদের কার্যক্রম দ্বারা। নিজের দেশের জঙ্গীবাদ দমনে দেশাইরা কতটুকু সফল হয়েছে? মনে রাখা দরকার সাহায্যের পিছনে থাকে আগ্রাসন। যেমনটি ঘটেছে সিকিম, কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ, আফগানিস্তান, ইরাক প্রভৃতি রাষ্ট্রের বেলায়। আমরা যেন সে বেড়াজ্জালে আটকা না পড়ি।

সরকার পক্ষ থেকে এতো দিন বলা হয়েছে যে, “ স্বাধীনতা বিরোধী জামাতকে সাথে নিয়ে ঐক্য হবে না।” সর্বশেষ সরকার পক্ষে (ওবায়েদুল কাদের) বলা হয়েছে যে, “সরকার’কে উৎক্ষাত করার জন্য বিএনপি ঐক্য চায়”। খালেদা জিয়া আহুত ঐক্য সভায় জাফরউল্ল্যাহ চৌধুরী বলেছেন “জামাতকে জাতির নিকট ক্ষমা চাইতে হবে।” খালেদা জিয়া ও ইসলাম ধর্ম বিদ্বেষী মন্ত্রী ইনু বলছেন যে, “খালেদা জিয়া চাইলে পূর্বেই জঙ্গী ধ্বংস হয়ে যেতো।” ইনু একজন খালেদা জিয়া বিশেষজ্ঞ। তার বতৃতা ও কথা সব খালেদা জিয়াকে ঘিরে; যার কথার বাস্তব সম্মত কোন প্রমাণ আদৌ পাওয়া যায় নাই। প্রবীণ আইনজীবি ও সংবিধান প্রনেতা ড: কামাল হোসেন বলেছেন যে, “জঙ্গীবাদ’কে নিঃশেষ করতে হলে ঐক্যের কোন বিকল্প নাই।” এখন প্রধানমন্ত্রীকে সুষ্ঠ বক্তব্য দিতে হবে তিনি কোন পথে জঙ্গীবাদ নির্মূল করতে চান? তবে তিনি এ মর্মে জাতীয় ঐক্য চান কি না এটা তার পরবর্তী কার্যক্রমেই পরিষ্ফুটিত হবে।

আওয়ামীলীগ ও বিএনপিই দেশীয় রাজনীতিতে মূল শ্রোতধারা, বাকী সব শরিকদল হিসাবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। ঐক্যজোটের নামে দুই নেত্রীর পাশে যাদের আসন তারা নিজেরাও জানে তাদের পায়ের তলায় মাটী কতটুকু? আওয়ামীলীগকে যতই আইসোলেটেড রাখা যায় তাতে বামদের লাভ। কারণ বামরা জানে যে, নৌকায় না চড়লে জাতীয় সংসদ তো দুরের কথা তারা ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচনে জয় লাভ করতে পারবে না। বামদের নিয়ে বিএনপি’কে ঠেকাতে গিয়ে নৌকা বালু চড়ে আটকা পড়ার সম্ভবনা ক্ষীন নহে; বরং জোড়ালো। বাম নেতা মহিউদ্দিন খাঁন বাদল বলেছেন, “নৌকার পালে হাওয়া লাগলেও তা ফুটো হয়েগেছে।” ফুটো পাল নিয়ে “জাতিস্বত্তায়” প্রশ্নে অর্থাৎ জাতিকে মজবুদ, টেকসই ও বুনিয়াদী করার জন্য সরকার কতটুকু এগুবেন বা এগুতে পারবেন তাহাই এখন দেখার বিষয়।
রাজনীতি, ক্ষমতা, ভিন্ন চিন্তা প্রভৃতির উর্দ্ধে “জাতিস্বত্তা”র প্রতি আমাদের যত্নবান হওয়া দরকার নয় কি? আমাদের স্বত্তার রূপ কি? এবং আমরা কোন কোন বিষয়ে নিজ স্বার্থের উর্দ্ধে উঠে জাতির প্রয়োজনে ঐক্য মতে আসতে পারি তার বিচার বিশ্লেষণ করার সময় কি হয় নাই?

লেখকঃ কলামইষ্ট ও রাজনৈতিক কর্মী
(ইহা লেখকের একান্ত ব্যক্তি গতমত, প্রকাশক বা সম্পাদক দায়ী নহে)

Related posts