November 15, 2018

জঙ্গি হামলা মোকাবেলায় সর্বদলীয় বৈঠক চান রাজনীতিবিদরা!

ঢাকাঃ  বাংলাদেশে একের পর এক জঙ্গি হামলা ঘটছে। আর সরকার কোন ভাবেই এদের দমন করতে পরছে না। গতমাসে ৭ দিনের বিশেষ অভিযানে ১৪ হাজার লোক ও ১৯৪ জন জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর ১ জুলাই গুলশানে ঘটে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। নিহত হন ২৮ জন। এ ঘটনায় জনমনে আতঙ্কের সৃস্টি হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ সমাজের বিশিষ্টজনরা জঙ্গি সঙ্কট মোকাবেলায় সর্বদলীয় বৈঠকে বসার আহবান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান।

এদিকে আজ রোববার স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক ডেকেছেন বেগম খারেদা জিয়া। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলন করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বিকেল ৩টায় গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সংবাদ সম্মেলনে গুলশানে সন্ত্রাসী হামলা, পুরোহিত হত্যা, গুম-খুনসহ চলমান পরিস্থিতি তুল ধরবেন বলে জানা গেছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বন্দুকধারী সন্ত্রাসীদের কয়েকজন বিদেশী নাগরিকসহ অন্ততঃ ২০ জনকে জিম্মি করে দেশের ইতিহাসে রক্তাক্ত পরিস্থিতি তৈরি করার নজীরবিহীন ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, দুষ্কৃতকারীদের কর্তৃক সংঘটিত প্রাণবিনাশী ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানাচ্ছি। অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ফলে সৃষ্ট অগণতান্ত্রিক সংস্কৃতি মিলে মিশে দেশে এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে যা পৈশাচিক স্বৈরতন্ত্রে অধ:পতিত হয়েছে। যার বিকৃত প্রতিক্রিয়া সারাদেশে ফুটে উঠতে শুরু করেছে।

সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় সর্বদলীয় বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সংবাদ মাধ্যমে প্রেস সচিব সুনীল শুভ রায় কর্তৃক প্রেরিত এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান এরশাদ। তিনি বলেন এ ধরণের উগ্র সন্ত্রাসবাদ একটি জটিল সমস্যা। সমাধানে দেশবাসীর ঐক্য জরুরি। ঐকান্তিকভাবে সম্মিলিত প্রয়াস ছাড়া লক্ষ্য অর্জন শুধু কষ্টসাধ্য নয় প্রায় অসম্ভব বলা যায়। তিনি আরো বলেন সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় একটি সর্বদলীয় বৈঠকের আয়োজন করার জন্য কয়েকদিন আগে আমি সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলাম। এই পরিস্থিতিতে আবারও সেই আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করছি।

গুলশানের হোটেলের বর্বরোচিত হামলা জাতীয় ঐক্য, সংলাপ ও একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনকে অনিবার্য করে তুলেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও সাধারন সম্পাদক আবদুল মালেক রতন। শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তারা এ মন্তব্য করেন। তারা আরও বলেন, দেশে জঙ্গিবাদ নেই, আইএস নেই- এ ধরনের বক্তব্য থেকে বিরত হয়ে জঙ্গিবাদ বিরোধী জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠান ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।

সন্ত্রাসী ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ.কিউ.এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। নেতৃবৃন্দ এক বিবৃতিতে বলেন, এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার নিন্দা জাননোর ভাষা আমাদের নেই। তারা এই ঘটনার সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। নেতারা নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করে তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

বিশিষ্ট আইনবিদ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে, এটা কেউ কখনও আশা করেনি। এখন কেউই নিরাপদ নয়। সকলেরই নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হবে। এটি এখন আর কোনো ব্যক্তি বা দলের চিন্তা নয়। সামগ্রিক চিন্তা। দেশের চিন্তা। দেশ নিয়ে, দেশের মানুষ নিয়ে, আমাদের প্রত্যেককেই ভাবতে হবে। নিরাপত্তা এখন জাতীয় ইস্যু। জাতীয় ইস্যুতে সবার এক হওয়া উচিত। নানান মতাদর্শ নিয়ে বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থ নিয়ে কোনো বিরোধের সুযোগ নেই। এই সংকট, এখন জাতীয় সংকট। আমাদের জাতীয়ভাবে সবাইকে একসুরে এর প্রতিবাদ করতে হবে। জঙ্গিবাদ নিরসনে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বসে আলাপ করা জরুরি, কিভাবে জঙ্গিবাদকে দমন করা যায়। তবে, সরকারের আন্তরিকতার পাশাপাশি সকলের সমন্বিত চেষ্টা জঙ্গিবাদ দমনে জরুরি বলে মনে করছি। সেই সঙ্গে সামাজিক আন্দোলন জঙ্গিবাদ নির্মূলে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি।

এ ঘটনায় দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. আনিসুজ্জামান বলেছেন,এমন ঘটনা বাংলাদেশ কখনও দেখেনি, আশাও করেনি। কিন্তু দুর্ভাগ্য এমন ঘটনা আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হলো। এই ঘটনা প্রত্যাশিত নয়। আবার একেবারেই অপ্রত্যাশিত তাও বলব না। কেননা, অনেকদিন ধরেই এখানে বেশকিছু জঙ্গিবাদী বিচ্ছিন্ন ঘটনা একের পর এক ঘটাচ্ছিল। এরপর এই ঘটনাকে আর বিচ্ছিন্ন বলা যায় না। আইএসের যে দাবি তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। তারা তাদের শক্তি প্রদর্শন করতে চেয়েছে।

বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও লেখক হায়দার আকবর খান রনো বলেছেন, একটা দুঃসময়ের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি আমরা। কিছুদিন ধরে যেভাবে মানুষ হত্যায় সন্ত্রাসীরা তৎপরতা দেখাচ্ছে তা আমাদের প্রচন্ড চিন্তিত করছে। চিন্তা করতে আমাদের বাধ্য করছে। জঙ্গিদের হাত থেকে কেউ রেহাই পাচ্ছে না। সরকার ও পুলিশের পক্ষ থেকে কত আশ্বাস পেলাম, কোথায় সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন? পরশু রাতে গুলশানে রেস্টুরেন্টে যে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হলো, নিরীহ মানুষকে জিম্মি করে হত্যা করা হলো তা দেশে এই প্রথম। এই ঘটনা ভয়াবহ ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত করছে। তাদের ক্রমাগত হামলায় মানুষ আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে।

বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকের বলেছেন, সবার আগে দেশ ও দেশের মানুষ। সবার আগে দেশপ্রেম। মানবিকতা। গণমাধ্যমের আচরণ কখনও কখনও এর বিপরীতে গিয়ে দাঁড়ায় বলে মনে হয়। সর্বাগ্রে সাংবাদিকদের বলতে চাই, দর্শক বাড়াতে, পাঠক বাড়াতে আমরা কি দেশের কথা একবারও ভাববো না? শুধু বাণিজ্য স্বার্থ চিন্তা করব? গুলশান হামলা যে কতবড় বিপর্যয় তা আমাদের অনেক গণমাধ্যম হয়তো বুঝতেও পারেনি। বোঝার যোগ্যতাও অনেকের নেই। তা না হলে, কী করে এই ধরনের ঘটনা ও অপারেশন সরাসরি সম্প্রচার করতে চায় তারা?

রাজনীতিবীদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মে. জে. (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় একটি রেস্টুরেন্ট যে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা সংঘটিত হয়েছে তা আগে থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল, আশঙ্কা ছিল দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা পক্ষ থেকে। সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পূর্ণাঙ্গভাবে না হলেও আংশিকভাবে প্রস্তুত ছিল। তবে তারা পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতিতে যেতে পারত। সেটা আর হয়নি। যারা নির্মম এ ঘটনায় নিহত হয়েছে, আহতদের প্রতি সমবেদনা। তারপরও ঘটনার সফল সমাপ্তি টানতে পেরেছে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী, এটা তাদের সফলতা। তাদের অভিনন্দন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি দাবি মেটাতে, রাজনৈতিক ঐক্যেও বিকল্প নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা বৃহৎ ঐক্য জরুরি। রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়াস চালাতে হবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মে. জে. (অব.) আব্দুর রশিদ বলেন, যে সন্ত্রাসী হামলা ঘটে গেল দেশে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এই হামলাটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সংঘটিত করা হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার ফাকফোকর দেখে, নিশ্চিত হয়েই জঙ্গিরা এই নৃশংস হামলা চালিয়েছে। এই হামলা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে নতুন মাত্রা, নতুন শঙ্কা যোগ করল। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস মোকাবিলা করতে হলে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক, ইসফাক ইলাহি চৌধুরী বলেছেন, জঙ্গি হামলায় কাঁপল গুলশান। এটাও কী বলা যায় না, এই ঘটনা কাপিয়ে দিল আসলে গোটা বাংলাদেশকেই? সন্ত্রাসী হামলা, জঙ্গি তৎপরতা এর আগে এদেশে ঘটলেও মানুষ জিম্মি কওে সন্ত্রাসী তৎপরতার ঘটনা এই প্রথম। এ ঘটনা নতুন মোড় নিল। এখন আমাদেও অনেক সতর্ক হতে হবে, সাবধান থাকতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আসিফ নজরুল বলেন, বাংলাদেশের ইতিাসে সংঘটিত সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী ঘটনা এটি। আমাদের সময় এসেছে তা রিয়েলাইজড করা যে, এটা আইএস করেছে। আমরা সবাই যদি এটা রিয়েলাইজ করি, বাংলাদেশে আইএসের একটা স্ট্রং ঘাঁটি গড়ে উঠেছে, অবিলম্বে সরকারকে সমস্ত প্রধান প্রধান বিরোধী দলসমূহকে নিয়ে একটা জাতীয় ঐক্যমত গড়ে তুলতে হবে, জাতীয় স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করতে, কিভাবে আমরা এই সংকট মোকাবিলা করব। এই সংকটে পুলিশ, গোয়েন্দা, র‌্যাব, সেনাবাহিনী, বিজিবি দিয়ে তাৎক্ষনিকভাবে মোকাবিলা করা হয়তো সম্ভব, কিন্তু সূদুর প্রসারী মোকাবিলা করতে হলে অবশ্যই আমাদেরকে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতায় আসতে হবে।

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি ৩জুন ২০১৬

Related posts