November 17, 2018

জঙ্গিরাও স্পুফিং কল শিখছে!

মন্ত্রী, সচিব, পুলিশের মহাপরির্দশক (আইজিপি) এবং উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের নম্বর থেকে হুটহাট অধীনস্ত কর্মকর্তা ও কর্মাচারীদের মোবাইল ফোনে কল আসে। যা আগে কখনও ঘটেনি। বসদের ফোন পেয়ে হতভম্ভ হয়ে যায় কর্মচারীরা। কর্তার ছোটখাটো নির্দেশে অবাক হন। এত তুচ্ছ বিষয়ে তারা ফোন করবেন কেন? পরে যাচাই করে দেখা যায় আসল কর্তারা তাদের ফোন দেননি। সফটওয়্যারের মাধ্যমে মোবাইল নম্বর একই রেখে ফোন করে প্রতারক চক্র। প্রযুক্তি দুনিয়ায় এই প্রতারণার নাম ‘স্ফুফিং কল (Spoofing)’। বাংলাদেশে গত দুই বছর ধরে এ প্রতারণা বেড়েছে। এমনকি এখন জঙ্গিরাও এই সফটওয়্যারের আশ্রয় নিয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যার হুমকি দিচ্ছে। এদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করতে পুলিশকেও খেতে হয় নাকানি চুবানি।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। ডিবি পুলিশ জানায়, গত মাসে নভেম্বরে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে হুমকির ঘটনায় একজনকে গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসে মোবাইল ফোনে প্রতারণার প্রযুক্তির সেই রহস্য। ওটা ছিল ‘স্ফুফিং কল’। আইজিপির ফোন নম্বর ‘স্ফুফিং’ করে বিভিন্ন পুলিশ সুপার (এসপি) এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) কল দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আসামি ছাড়িয়ে নিতে এবং বদলির বিষয়ে এসব কল করা হয়েছিল। এ ছাড়াও স্পুফিং করে হুমকি, চাঁদাবাজি, চাকরির ও বদলির তদবির, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি করা হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের নম্বর ‘স্পুফিং’ করে কয়েকদিন আগে এক জায়গায় কল করে তদবির করা হয়। শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু ও তার এপিএস এর মোবাইল নম্বর ‘স্পুফিং’ করে করিমগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে কল করে বিভিন্ন তদবির করে একটি চক্র। রেল সচিব ফিরোজ সালাউদ্দিনের নম্বর স্পুফিং করে চট্টগ্রামের একজন রেল কর্মকর্তার কাছে তদবির করা হয়।

আইটি জগতে স্পুফিং মানে কোন সিস্টেম বা ইউজারকে ধোঁকা দেওয়া। সাধারনত কোন ইউজারের আইডি গোপন করে অথবা নকল করে স্পুফিং করা হয়। বিভিন্ন পদ্ধতিতে এটি করা যায়। সফটওয়্যারের মাধ্যমে যে কোনও ব্যক্তির মোবাইল নম্বর হুবহু নকল করে কাউকে ফোন করা যায়। আর যার নম্বর ব্যবহার করা হচ্ছে-তিনি বুঝতেই পারছেন না যে তার নম্বরটি ব্যবহার করেই প্রতারণা করা হচ্ছে।

এবিষয়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ‘সাধারণত একজন ব্যক্তির প্রাথমিক কিছু তথ্য জেনে তার নম্বরটি স্পুফিং করা হয়। এক্ষেত্রে মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানিগুলোরও কিছুটা দায়বদ্ধতা আছে। কোম্পানিগুলোকে আরও সচেতন হতে হবে, যাতে কোনও সেবাগ্রহিতা প্রতারণার শিকার না হন।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি- স্পুফিং কল প্রতিরোধে ডিবির সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধ টিম কাজ করে যাচ্ছে। যখনই এ ধরনের প্রতারক চক্রের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে তখনই তাদের গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে এই চক্রটিকে গ্রেফতার করা ‘একটু টাফ’ বলে জানিয়েছে পুলিশ। কারণ যে সফটওয়্যার ব্যবহার করে স্পুফিং কল করা হয়, তার নিয়ন্ত্রিত সার্ভার বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে। তবে অপরাধীদের দ্রুত খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে রাজধানীসহ সারাদেশে প্রত্যেকটি ব্যাটালিয়নের জন্য একটি করে ১৪টি ট্র্যাকার মেশিন কেনার আবেদন করেছে র‌্যাব। ১৩ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠিয়েছে র‌্যাব। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। যেকোনও অপরাধের ঘটনা তদন্ত করে অপরাধীদের শনাক্ত করতে নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হচ্ছে। প্রযুক্তিগতভাবে আরও শক্তিশালী হতে মোবাইল ট্র্যাকার মেশিন কিনতে চাচ্ছে র‌্যাব।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্গানাইজ ক্রাইম) আব্দুল্লাহেল বাকি জানান, বিষয়টি আমাদেরও নজরে রয়েছে।

কিভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে যে স্পুফিং হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনার মোবাইল ফোন বন্ধ করে অন্য একটি নম্বর থেকে আপনার নম্বরে কল দিন। দেখুন রিং হয় কিনা। রিং হলে বুঝতে হবে সিমটি কেউ স্পুফিং করেছে।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts