December 19, 2018

জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে আলেমসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে

Global Pic

আহসান হাবিব: আজ সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের কারণে অশান্ত বিশ্ব। শান্তিপ্রিয় মুসলমানদের আবাসস্থল বাংলাদেশেও সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদীরা আস্তানা গাড়তে শুরু করেছে। এ অবস্থায় দেশের প্রতিটি শান্তিপ্রিয় নাগরিকের দায়িত্ব যার যার অবস্থান থেকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, বিশেষ করে দেশের হক্কানি আলেম-ওলামাদের কর্তব্য হলো—এ কথা সবার কাছে স্পষ্ট করে দেওয়া যে ইসলামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের কোনো স্থান নেই। ইসলামের নামে যারা এ অপকর্ম করে, তারা দেশ-জাতি ও ইসলামের শত্রু। দেশ ও ইসলামের শত্রুদের সম্পর্কে গোটা জাতিকে সচেতন ও সতর্ক করে তুলতে দেশের আলেমসমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলার দেড় হাজারের অধিক কওমি মাদ্রাসা নিয়ে গঠিত ‘তানযীমুল মাদারিস’ নামক কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। ফকিহুল মিল্লাত মুফতি আব্দুর রহমান (রহ.)-এর হাতে গড়া এ বোর্ডের উদ্যোগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি বোর্ড চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় বোর্ডের সাধারণ সভা। দেড় হাজারের বেশি কওমি মাদ্রাসার প্রায় ১৫ হাজার আলেম-ওলামার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতির ভাষণে উপরোক্ত কথা বলেন বোর্ডের চেয়ারম্যান মুফতি আরশাদ রহমানী। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে এ বোর্ডের অতীত অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে আজ গোটা উত্তরাঞ্চলের সব দ্বীনি মাদ্রাসার ভরসাস্থলে পরিণত হয়েছে এই তানযীম। তানযীমের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হজরত ফকিহুল মিল্লাত (রহ.)-এর সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনা, নির্বাহী পরিষদের সদস্যদের নিষ্ঠা ও ইখলাসের বরকতে দেশের জাতীয় যেকোনো ইস্যুতে তানযীমের প্রশংসনীয় ও কার্যকর ভূমিকা সবার কাছে স্পষ্ট। ২০০৫ সালে সারা দেশ কেঁপে ওঠে জঙ্গিদের পাঁচ শতাধিক বোমা বিস্ফোরণে। ক্ষতবিক্ষত হয় অসংখ্য মানুষ। উত্তরাঞ্চলের দুর্গম এলাকায় গড়ে ওঠা একটি জঙ্গি সংগঠন এর দায় স্বীকার করে পুরো উত্তরাঞ্চলের মানুষকে আতঙ্কে ফেলে দেয়। তত্কালীন সরকারের শরিক তথাকথিত একটি ইসলামী দল এর দায়ভার কওমি মাদ্রাসার ওপর চাপানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। এমন বিভীষিকাময় কঠিন মুহূর্তে দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর সুযোগ্য অভিভাবক হজরত ফকিহুল মিল্লাত (রহ.) তানযীমের ব্যানারে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কাছে স্পষ্ট করে দেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের সঙ্গে কওমি মাদ্রাসার ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক নেই। ছিল না কোনো কালেও। একই সঙ্গে গোটা বিশ্বের সামনে এ বার্তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে হাজারো কওমি মাদ্রাসার পাঁচ হাজারের মতো প্রতিনিধির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী ওলামা সমাবেশ। ২০০৫ সালের ২৫ আগস্ট হজরত ফকিহুল মিল্লাত (রহ.)-এর আহ্বানে তানযীমের উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন সরকারের বিভিন্ন সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মিডিয়ার শতাধিক প্রতিনিধিও সমাবেশের শোভা বৃদ্ধি করেছেন। সেই সমাবেশের পর আতঙ্ক দূর হয় কওমি অঙ্গনের। সবার কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়, এসব বোমাবাজির সঙ্গে কওমি আলেম-ওলামা ও ছাত্রদের কোনো সম্পর্ক ছিল না, থাকার প্রশ্নই আসে না। এই তানযীমের প্রয়াত চেয়ারম্যান ফকিহুল মিল্লাত মুফতি আব্দুর রহমান (রহ.)-এর সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী কর্মতত্পরতার কথা তুলে ধরতে গিয়ে বর্তমান চেয়ারম্যান বলেন, সেদিনের জঙ্গিবাদবিরোধী সমাবেশই শুধু নয়, হজরত ফকিহুল মিল্লাত (রহ.)-এর সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত, হিকমত, প্রজ্ঞাপূর্ণ পরামর্শ ও দৃঢ় কঠিন নিয়ন্ত্রণের ফলে আজ গোটা উত্তরাঞ্চলের মাদারিসে কাওমিয়্যা তুলনামূলক নিরাপদে ইসলামী শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে। বলতে গেলে, তানযীমের এই চেয়ারম্যান হজরত ফকিহুল মিল্লাতই প্রথম ব্যক্তি, যিনি ইসলামের নামে সন্ত্রাস ও বোমাবাজির বিরুদ্ধে সবার আগে বজ্রকঠিন আওয়াজ তুলেছিলেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কিছু বিপথগামী মানুষ এ দেশে জিহাদের নামে যুবকদের ট্রেনিং করানোর জন্য একত্র করতে শুরু করে। সরকার, প্রশাসনসহ খোদ আলেমসমাজেরও এ নিয়ে তখন কোনো মাথাব্যথা ছিল না। এর তীব্রতা, ভয়াবহতা ও সম্ভাব্য পরিণতি তখনো কেউ আঁচ করতে পারেনি। কারণ এগুলো সবেমাত্র শুরু হয়েছে। কারো বুঝে আসছিল না, কী ঘটতে যাচ্ছে। ঠিক তখনই হজরত (রহ.) খোদা প্রদত্ত দূরদর্শিতা ও অভিজ্ঞতার দ্বারা বুঝতে পেরেছিলেন এগুলোর ভবিষ্যৎ কী? তাই তিনি ময়দানে নেমে পড়েন। উদ্দেশ্য—বাঁচাতে হবে কওমি মাদ্রাসাগুলোকে এদের খপ্পর থেকে। তাই তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সফর করেন। বিভিন্ন মাদ্রাসায় গিয়ে বোঝালেন আলেম-ওলামা ও ছাত্রদের। সতর্ক করলেন সবাইকে। উগ্র, উচ্ছৃঙ্খল এই দল ভিড়তে পারল না কওমি অঙ্গনে। তারা ক্ষেপে গেল হজরত ফকিহুল মিল্লাত (রহ.)-এর ওপর। আসে হত্যার হুমকি। কিন্তু আল্লাহর বান্দা ঘাবড়ালেন না। থামলেন না। তিনি ভীত হননি। শঙ্কিতও হননি। ছুটে চললেন রাত-দিন। পরবর্তী সময় তারা যখন দেশব্যাপী জঙ্গিতত্পরতা শুরু করে, তখন হুঁশ ফেরে প্রশাসনের। হাড়ে হাড়ে টের পায় সবাই। একপর্যায়ে প্রশাসন শক্ত হাতে এগুলো দমন করে। গ্রেপ্তার করে শত শত জঙ্গিকে। হজরত ফকিহুল মিল্লাত (রহ.)-এর সেদিনের মেহনতের সুস্পষ্ট ফল জাতি প্রত্যক্ষ করে। এ পর্যন্ত যত জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়েছে, ৯৯ শতাংশ কওমি অঙ্গনের বাইরের। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, বাংলাদেশ পুলিশের আইজি মহোদয় বলেছেন, ‘কওমি মাদ্রাসায় জঙ্গি তৈরি হয় না। জঙ্গিবাদের সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’ (১৮-১২-২০১৫ তারিখের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত) আমরা তাঁর বাস্তবধর্মী সাহসী এই বক্তব্যকে স্বাগত এবং তাঁকে এর জন্য ধন্যবাদ জানাই। বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি অত্যন্ত দায়িত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন, বোর্ডভুক্ত কোনো মাদ্রাসা জঙ্গিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার প্রশ্নই ওঠে না। এরই সঙ্গে প্রতিটি মাদ্রাসার আলেম-ওলামা, ছাত্র-শিক্ষকরা অতীতেও সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন; ভবিষ্যতেও তাঁরা এর বিরুদ্ধে কাজ করে যাবেন, ইনশাআল্লাহ। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে প্রশাসনের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তবে এ বিষয়ে আলেমসমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : দপ্তর সম্পাদক উত্তরবঙ্গ তানযীম

Related posts