November 17, 2018

জঙ্গিবাদের ‘ক্যান্সার’কে ছেঁটে ফেলার ঘোষণা নর্থ সাউথের ভিসির

ঢাকাঃ  শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে ‘ক্যান্সার’ আখ্যায়িত করে সবাইকে সঙ্গে নিয়েই তা ছেঁটে ফেলার ঘোষণা দিয়েছেন সমালোচনার মুখে থাকা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আতিকুল ইসলাম।

‘জঙ্গি’ শিক্ষার্থীদের মদদ দেওয়ার অভিযোগে উপ-উপাচার্য গ্রেপ্তার হওয়ার পরদিন রোববার ঢাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে সরকার আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এই ঘোষণা দেন তিনি।

জঙ্গি কর্মকাণ্ডে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জড়িয়ে পড়ার নতুন নতুন তথ্য আসার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রথম দিককার এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টি ইমেজ সঙ্কটে পড়েছে বলে স্বীকার করে নেন অধ্যাপক আতিকুল।

গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর নিহত দুই হামলাকারী নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন বলে পরিচয় প্রকাশের পর তুমুল আলোচনা শুরু হয়।

গুলশানে জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার এই বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক শিক্ষক হাসনাত রেজা করিমকে নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক ঘটার মধ্যেই শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত উপ-উপাচার্য গিয়াস উদ্দিন আহসানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

২০১৩ সালে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যাকাণ্ডে নর্থ সাউথের সাত ছাত্রের সাজা হয়েছিল। তখন একবার আলোচনা হলেও মাঝে তা স্তিমিত থাকার পর এখন নতুন করে আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়টি।

মতবিনিময় সভায় সবার আলোচনা শুনে অধ্যাপক আতিকুল বলেন, “সবার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করছি, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ক্যান্সার অপারেশন করে ফেলে দিতে হবে।

“কী কী করণীয় তা শুনেছি, এর অনেকগুলো পদক্ষেপই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়েছে।”

নর্থ সাউথ নিয়ে উদ্বেগ থেকে দুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একটি প্রতিনিধি দলও রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাসে গিয়ে কিছু পরামর্শ দিয়ে আসে।

নর্থ সাউথের মতোই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া উচ্চ ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের বাড়ি থেকে পালিয়ে জঙ্গিবাদী তৎপরতায় ঝুঁকে পড়ার ঘটনাগুলো প্রকাশ পাওয়ার পর সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার প্রেক্ষাপটে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ‘জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক’ এই মতবিনিময় সভা আয়োজন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান, পুলিশ প্রধান এ কে এম শহীদুল হক, র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া ছাড়াও শিক্ষাবিদ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই সভায় নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন।

সভার শুরুতে পুলিশের কাউন্টার টেরিরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, যাতে বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সহযোগিতা করছে জানিয়ে অধ্যাপক আতিকুল বলেন, “নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় একটা ইমেজ প্রবলেমে ভুগছে।… পত্রপত্রিকায় আমাদের প্রাক্তন ছাত্র-শিক্ষকদের নাম আসছে। আমি অস্বীকার করতে রাজি নাই। আমরা সমস্যা সমাধানে সবার সঙ্গে কাজ করতে চাই।

“এই যে মারাত্মক জীবাণু, সেটা যেখান থেকেই এসে থাকুক- মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসে থাকুক, ইউরোপ থেকে এসে থাকুক, কম্পিউটারের মাধ্যমে এসে থাকুক, প্রচারপত্রের মাধ্যমে এসে থাকুক, এদেশে এসেছে এবং কিছু কিছু মানুষকে কলুষিত করেছে, বিষাক্ত করেছে, এদেরকে প্রতিরোধ করতে হবে।”

এসব বিষয় প্রতিরোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রত্যেক মুহূর্তের খোঁজ-খবর রাখা হবে বলেও জানান নর্থ সাউথের উপাচার্য।

একটা মতাদর্শ অনুরসণ করে শিক্ষার্থীরা জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছে উল্লেখ করে অধ্যাপক আতিকুল বলেন, “কাউন্টার আইডিওলজি দিতে হবে।… সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস সবার মধ্যে আনতে হবে।

“আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুক, কম্পিউটার সায়েন্স পড়ুক তাকে বাংলাদেশের ইতিহাস পড়তে হবে। আমাদের ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হবে, ওই ধরনের পরিবেশ তৈরি হয় এ ধরনের পরিবেশ যেন নর্থ সাউথে না থাকে।”

শিক্ষার্থীদের ‘নষ্ট’ হওয়া রোধে সরকারি সংস্থার সমর্থন নিয়ে কাজ করবেন জানিয়ে অভিভাবকদেরও সন্তানদের বিষয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন এই শিক্ষক।

“ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরে নিজের রুমটা বন্ধ করে ওয়েবসাইটে কী কী করে তা খেয়াল রাখতে হবে। দরজা বন্ধ করতে দেবেন না, দরজা খোলা থাক।”

গত বছর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তদন্ত দল নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের বইপত্র পায়। জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারও করা হয় বলে গণমাধ্যমের খবর।

অধ্যাপক আতিকুল বলেন, “লাইব্রেরি পরিষ্কার করা হয়েছে, কম্পিউটার ল্যাবস জব্দ করা হয়েছে। মসজিদে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে, মনে হয় আমাদের থেকে বেশি সিসি ক্যামেরা অন্য কোথাও নেই।”

কোনো তরুণ বাড়ি পালিয়ে জঙ্গি দলে ভিড়েছে কি না- তা জানতে পরিবারের কাছে তথ্য চেয়েছে সরকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষার্থী টানা ১০ দিন অনুপস্থিত থাকলেই সে তথ্য সরকারকে জানাতে হবে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষার্থীই একজন শিক্ষকের অধীনে থাকবে জানিয়ে আতিকুল বলেন, একজন শিক্ষকের অধীনে ৩০ জন ছাত্র থাকবে। … শিক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কী কী খেয়াল রাখতে হবে।

“মনে রাখতে হবে আমরা যারা শিক্ষকতা করি বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালাই তারা এসব বিষয়ে এক্সপার্ট নই। সরকারের যেসব অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আছে তাদের সঙ্গে আমরা কাজ করব। সরকারের প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত আমরা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি।”

দ্যা গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডটকম/রিপন/ডেরি ১৭/০৭/২০১৬

Related posts