September 20, 2018

জঙ্গিবাদকে জাতীয় দুর্যোগের মতোই মোকাবিলা করতে হবে

ড. মীজানুর রহমান

বর্তমানে আমরা জঙ্গিবাদের যে অবস্থা দেখতে পাচ্ছি, তা ১৫-২০ বছরের পুরনো। জঙ্গিরা বর্তমানে এমন কিছু টার্গেট নির্ধারণ করছে যেগুলোর সঙ্গে আগের টার্গেটগুলোর মিল নেই। আগে তারা প্রগতিশীল ধারার সংস্কৃতিকর্মী যেমন উদীচী, রাজনৈতিক দলের অফিস বা সমাবেশ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রমনার বটমূলে হামলা চালিয়েছে। এগুলো ছিল ভিন্ন ভিন্ন টার্গেট। সর্বশেষ জঙ্গিরা ব্লগার, মুক্তমনা লেখক, প্রকাশক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ওপর আক্রমণ করেছে। পরে তারা এই আক্রমণ থেকে বের হয়ে এসে বিদেশিদের টার্গেট করে। এর অংশ হিসেবে তারা গত বছর জাপান ও ইতালির দুই নাগরিককে হত্যা করে। কিন্তু এই হামলাগুলো একেবারেই নিরীহ টার্গেটে করা হয়েছে। এসব আক্রমণের সঙ্গে আগের আক্রমণের কোনো সম্পর্ক নেই। বিদেশিরা এমন কোনো কর্মকাণ্ড যেমন ধর্মাচার ও ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধে কিছু করেছে এমন নয়। অতীতে যাদের হত্যা করা হয়েছে, সেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এসব হত্যাকাণ্ডের কোনো মিল নেই। জঙ্গিদের লক্ষ্যই হলো বিদেশিদের মারতে হবে, সেটা যে দেশেরই হোক।

সর্বশেষ যে ঘটনা পুরো জাতিকে নাড়া দিল তা হলো ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানের ঘটনা। জঙ্গিরা নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে রেস্টুরেন্টে ঢুকেই জানতে চায় কারা কারা বিদেশি। পরে তারা ইতালি, জাপান, ভারত ও আমেরিকার ২০ নাগরিককে নির্দিষ্ট করে হত্যা করে। দেশের ইতিহাসে এত সংখ্যক বিদেশি হত্যার ঘটনা আগে ঘটেনি। এখন বেছে বেছে বিদেশিদের হত্যা করার মূল কারণ হচ্ছে বর্তমান সরকারকে অস্থিতিশীল, হেয় প্রতিপন্ন করা ও পারলে উত্খাত করা। বিদেশি সাহায্য-সহযোগিতা বন্ধ ও অন্যান্য দেশে এই সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করেও যদি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায় তাহলে জঙ্গিরা মনে করে তাদের জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে, যা তারা পেয়েছিল ২০০১ থেকে শুরু করে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। ওই সময়ে জামায়াত-বিএনপি জোট সরকার জঙ্গিবাদের উত্থানের জন্য যথেষ্ট অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। জঙ্গিবাদের উত্থানের যে পরিবেশ ও পৃষ্ঠপোষকতা দরকার, তা বর্তমান সরকারের আমলে সম্ভব নয়। কাজেই তাদের তাত্ক্ষণিক লক্ষ্য হলো, এই সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে অন্য যেকোনো সরকার এলে জঙ্গিরা উপযুক্ত পরিবেশ ভোগ করবে।

২.
গুলশানের ঘটনা আমাদের চিন্তাভাবনার জগতে পরিবর্তন এনেছে। প্রথমত, আমাদের ধারণা ছিল জঙ্গিত্ব বা জঙ্গিবাদের মূল কেন্দ্র হচ্ছে মাদ্রাসা, এতিমখানা, কওমি মাদ্রাসা ইত্যাদি। কিন্তু হলি আর্টিজানের ঘটনা আমাদের জানাল, জঙ্গিরা শুধু মাদ্রাসা ও এতিমখানা থেকে আসে না। অত্যন্ত উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, যাদের পড়াশোনা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, অনেক ব্যয়বহুল বিশ্ববিদ্যালয়ে, অনেকে সনদপ্রাপ্ত ও অনেকে আবার সনদের মোহ ত্যাগ করে জঙ্গিবাদে অংশগ্রহণ করছে। এর মধ্যেই আমাদের সমাজে অনেক পকেট তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী এই পকেটগুলো খুঁজে বেড়ায়। সেদিক থেকে একটি টার্গেট গ্রুপ হচ্ছে এতিমখানা, কওমি ও হাফিজিয়া মাদ্রাসা। আমরা যত কথাই বলি না কেন, মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিতরা আমাদের দেশেরই মানুষ। কিন্তু সেদিকে আমাদের তেমন নজর নেই। বিশেষ করে এতিম ও দরিদ্রদের জন্য শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ এখনো আমরা তৈরি করতে পারিনি। উপযুক্ত শিক্ষা ও পরিবেশ না দেওয়ার ফলে এতিম ও দরিদ্রদের একটি বড় অংশের স্থান হয় মাদ্রাসায়, বিশেষ করে কওমি ও হাফিজিয়া মাদ্রাসায়। এখান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের যথেষ্ট সুযোগও নেই। কারণ তাদের শিক্ষা ব্যবহারিক নয়। ফলে তারা সমাজে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। সাধারণত মসজিদ ও মাদ্রাসাকেন্দ্রিক চাকরি যেসব আছে, তার মধ্যেই তারা সীমাবদ্ধ থাকে এবং কিছুদিনের মধ্যেই তারা হতাশাগ্রস্ত হয়। এই হতাশাগ্রস্ত ও বিক্ষুব্ধ গ্রুপকে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী টার্গেট করে। আরো একটি গ্রুপ রয়েছে, তারা যে সমগ্র সমাজব্যবস্থার প্রতি বিক্ষুব্ধ, এমন নয়। যে জঙ্গিরা ধরা পড়েছে, তাদের রেকর্ড করা এমন কোনো বক্তব্য শুনিনি, প্রচলিত সমাজব্যবস্থার কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে বড় ধরনের বিক্ষোভ হচ্ছে। কল্যাণপুরের ঘটনায় যেসব রেকর্ড ও বক্তব্য পাওয়া গেছে, তাতে জানা গেল, বেশ কয়েকজন জঙ্গি তাদের পরিবারকেও আক্রমণ করেছে। পরিবারের একটি বিক্ষুব্ধ অবস্থা থেকে তারা এটা করছে বলে অনেকে মনে করে। আমাদের সমস্যা হচ্ছে, পরিবারের নবীন সদস্যদের সঙ্গে বয়স্ক সদস্য যেমন দাদা-দাদি, মা-বাবার সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে গেছে। মা-বাবার ব্যস্ততার কারণে এখন আর শিশুদের বিষয়ে সেইভাবে খোঁজখবর, তদারকি করা ও দেখভাল করার যে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এ বাংলায় ছিল, তা শিথিল হয়ে গেছে। ধনীদের সন্তান লালনপালন করার দায়িত্ব ন্যস্ত হচ্ছে গাড়ির চালক কিংবা কাজের লোকের ওপর। কারণ মা-বাবা ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত।

ধনীদের সন্তানরা এই অর্থেই ছিন্নমূলের তালিকায় পড়ে, কারণ দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের কোনো পরিচয় হয়নি। এই উপমহাদেশে ধর্মীয় ইতিহাস, কোন ধর্মের পর কোন ধর্ম এসেছে, ধর্মগুলোর অবস্থান, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ধর্মগুলোর মিল-অমিলসহ অনেক বিষয়ই তারা জানে না। এ ক্ষেত্রে কোনো পড়াশোনাও তাদের নেই। ধর্ম হচ্ছে পুরো সংস্কৃতির একটি বড় অংশ। সংস্কৃতি সম্পর্কে একজন তরুণের যে জ্ঞান, ধ্যানধারণা তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। তা না হওয়ার কারণে মূল সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে জঙ্গিরা এসব ছিন্নমূল ও এতিমকে টার্গেট করেছে। তবে আমি মনে করি, গুলশান, শোলাকিয়া ও সর্বশেষ কল্যাণপুরের ঘটনার মধ্য দিয়ে এক ধরনের জাতীয় জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ভারতীয় উপমহাদেশের যে ভূখণ্ডকে আমরা স্বাধীন করেছি, তা কখনোই জঙ্গিবাদের উর্বর ভূমিতে পরিণত হবে না, সেই প্রমাণ এর মধ্যেই মিলেছে। গুলশানের ঘটনায় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করেছে। তাতে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও অংশ নিয়েছে। তারা প্রতিবাদ করছে এই জঙ্গিবাদের সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। ধর্মভীরু, ধার্মিকসহ সমাজের সব স্তরের লোক একবাক্যে জঙ্গিবাদকে ‘না’ জানিয়ে দিয়েছে। এমন কেউ বলছে না যে তারা জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে। জঙ্গিবাদের কাজ ন্যায়সংগত, তা কিন্তু কোনো পক্ষই বলছে না। কাজেই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের মূল পৃষ্ঠপোষক, দেশি-বিদেশি অর্থসংস্থানকারী, যারা মনে করেছিল মগজ ধোলাই করে বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদের আখড়ায় পরিণত করবে, তাদের কাছেও আমরা একটি বার্তা দিতে পেরেছি। এই বাংলায় জঙ্গিদের স্থান নেই। গত এক-দেড় মাসে পুরো জাতি জঙ্গিবাদকে ‘না’ বলেছে। মানববন্ধন, সমাবেশ, টক শো, পত্রিকায় লেখালেখি ও গণমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে আমরা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলছি। এক ধরনের সচেতনতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমাদের শত্রুপক্ষ যোগাযোগ করছে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে। তারা নীরবে-নিভৃতে একটি টার্গেট গ্রুপ নির্ধারণ করেছে। ফলে তারা কোনো ব্যক্তির নিজস্ব ক্ষোভ, হতাশা ও লাঞ্ছনা-বঞ্চনা জেনে তাকে জঙ্গিবাদে লিপ্ত হতে উৎসাহ জোগাচ্ছে। সভা-সমাবেশের মাধ্যমে আমরা প্রদর্শনমূলক উপকার পাব। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ হলো শিক্ষাঙ্গনে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে মনিটরিং করা। কোনো শিক্ষার্থীর চালচলন, অবয়ব, কথাবার্তার মধ্যে কোনো পরিবর্তন, আগের আচরণের সঙ্গে পার্থক্য, হঠাৎ করেই কোনো কিছু বেশি করে চর্চা করা, চর্চা ছেড়ে দেওয়া, অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষণীয় হলে শিক্ষকের উচিত কাছে ডেকে নিয়ে সেই শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলা। তাকে কাউন্সেলিং করতে হবে। তার মনোভাব জঙ্গিবাদের দিকে হলে তার মা-বাবাকে জানাতে হবে। যদি সীমা অতিক্রম করে তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হবে।
৩.
তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবের ফলে আমাদের জীবনযাত্রায় যে ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, সেই রকম পরিবর্তন কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থিরতা কাজ করছে। পরিবারের বয়স্ক নাগরিকদের সঙ্গে তরুণদের সাংস্কৃতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। নাচ, গান, বাদ্যযন্ত্র, সুর, নাটক, সিনেমায় বয়স্ক ও তরুণদের অবস্থান ভিন্নতর। তারা একে অপরের বিপরীতে অবস্থান করছে।

সংস্কৃতির মধ্যে সংশ্লেষ না থাকলে একই পরিবারে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি বিরাজ করবে। বয়স্কদের নাটক-সিনেমা এক ধরনের ও তরুণদের এক ধরনের। তবে এক পরিবারের মধ্যে সংস্কৃতির বৈচিত্র্য থাকতেই পারে। কিন্তু সংস্কৃতির সাংঘর্ষিক অবস্থা বিরাজ করা ঠিক নয়। আমরা যদি তরুণদের সংস্কৃতিকে বলি এগুলো করা ঠিক নয়, অপসংস্কৃতি, অর্থাৎ শাসন ও অত্যধিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসি, তাহলে তা যুক্তিসংগত হবে না। গত শতাব্দীর ষাট, সত্তর ও আশির দশকের গানগুলোই ভালো সংস্কৃতির অংশ; সেসব গানই শুনতে হবে তাহলে একটি সাংঘর্ষিক অবস্থার তৈরি হবে। তবে পুরনো দিনের গান অনেক সুরালো। বাঙালির ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে এসব গান অবশ্যই অব্যাহত রাখতে হবে এবং চর্চাও করতে হবে। তবে এর সঙ্গে মনে রাখতে হবে সংস্কৃতি একটি আবদ্ধ কূপ নয় যে এর মধ্যে অন্য কিছু প্রবেশ করবে না। যা কিছু আধুনিক ও প্রযুক্তির অবদান এবং মানুষ পছন্দ করে তা গ্রহণ করাই ভালো। নতুন প্রজন্মের গান আমি নিজেও শুনেছি, সেগুলোর অনেক গানের কথা ও সুর ভালো। আগের দিনের সিনেমা, নাটক গানের মূল কথা ছিল প্রেম, প্রকৃতি ও প্রেম। এখন মানুষের জীবনসংগ্রাম, গার্মেন্ট শ্রমিক, রিকশাওয়ালাদের জীবন ও সামাজিক দ্বন্দ্ব, বঞ্চনা ও অধিকারের সবই কিন্তু নতুন প্রজন্মের গানের মধ্যে আছে। পুরনো প্রজন্ম এগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনে না বলে মনে করে এগুলোর কোনো অর্থ ও তাত্পর্য নেই। অভিভাবকরা যদি মনে করেন, তরুণরা শুধু ফেসবুক সামাজিক মাধ্যম নিয়ে ব্যস্ত, যা গ্রহণযোগ্য নয়। মা-বাবাকে দেখলেই ছেলে ভয়ে ফেসবুক বন্ধ করে দেয়—এমন অবস্থার সৃষ্টি হলে দূরত্ব বাড়বে। বরং মা-বাবা নিজেই ফেসবুকে ছেলের বন্ধু হয়ে যান। তার অ্যাপসগুলোর সঙ্গে আপনি যুক্ত থাকুন। তাদের পছন্দের জিনিসগুলো আপনার পছন্দের মধ্যে নিয়ে আসুন। এতে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে অভিভাবকদের সম্পর্ক আরো জোরদার হবে। তা না করে শুধু ধমকের ওপর রাখলে দূরত্ব কমবে না বরং বাড়বে। তরুণদের সঙ্গে ভালো আচরণ করে তাদের ইতিবাচক বিষয়গুলো আমাদের মনে ধারণ করতে হবে।

৪.
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল, মাদ্রাসাসহ পুরো শিক্ষাঙ্গনে যে কারিকুলাম আছে, সেখানে অবশ্যই অনেক কিছুর ঘাটতি আছে। পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার জন্য তা যথেষ্ট নয়। অনেক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় এমন সব বিষয় পড়ানো হচ্ছে, যা মানুষকে মূল ধর্ম থেকে সরিয়ে জঙ্গিবাদে লিপ্ত হতে শেখাচ্ছে। কাজেই আমাদের শিক্ষা কারিকুলামের মধ্যে কী কী ভুল আছে তা দ্রুত খুঁজে বের করে সমাধান করতে হবে। শুধু গতানুগতিক বইপত্রে লিপ্ত না থেকে সংস্কৃতিবান মানুষ, অন্যের মত ধারণ ও শ্রদ্ধা করার মনমানসিকতা, উদার মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে এবং সমাজের বিচ্ছিন্নতা মানুষ কাটিয়ে উঠতে পারে সে জন্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। তরুণদের মধ্যে যেন অন্ধকার প্রবেশ না করে সে জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক, বাঙালি ঐতিহ্য-ইতিহাসনির্ভর অনুষ্ঠানাদি শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপকভাবে তুলে ধরা দরকার। একমাত্র সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবেই এই জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ করা যাবে। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে এই জঙ্গিবাদ দমন করা যাবে না। যদিও অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক সফলতা দেখিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সফল। কোনো ঘটনা ঘটার আগেই তারা প্রতিরোধমূলক ভূমিকা পালন করতে পারছে। জঙ্গিরা যে মানের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে সেই মানের প্রযুক্তি আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে এখনো সীমিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। একসময় ধনাঢ্য ব্যক্তিরা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখতেন। কিন্তু এখন তা আর নেই বললেই চলে। এখন শুধু বহুজাতিক কম্পানিগুলো তাদের পণ্যের প্রসার ও প্রচারের জন্য এ ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। কিন্তু গ্রামপর্যায়ে তারা অবদান রাখছে না। সে ক্ষেত্রে সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে। সংস্কৃতি খাতে সরকারের যে বাজেট, গত বছর তার পরিমাণ ছিল ৩৬৫ কোটি টাকা। এ বছর বাড়িয়ে তা ৪৫০ কোটি টাকার মতো করা হয়েছে। জাতীয় দুর্যোগের সময় থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়। আমি মনে করি, বর্তমানে সংস্কৃতি খাতে এক হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেওয়া দরকার। যাতে আমাদের শিক্ষাঙ্গন, গ্রামপর্যায়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমি সক্রিয় হয়। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কার করে নানাভাবে তাদের জাগ্রত করে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। বর্তমানে জঙ্গিবাদ জাতীয় দুর্যোগের মতোই এবং মোকাবিলা করার জন্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেই কাজে লাগাতে হবে। সাংস্কৃতিক খাতে বরাদ্দ বাড়ালে আইনশৃঙ্খলা খাতে আমাদের বেশি বরাদ্দের প্রয়োজন কমে আসবে। হলি আর্টিজানের ঘটনায় বিদেশি অতিথিদের সম্মান জানানো ও নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাঙালির যে ঐতিহ্য তা কিছুটা হলেও ব্যাহত হয়েছে। একইভাবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি জাতীয় জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। এই জাগরণ জঙ্গিবাদকে রুখবে। সেই জন্য দরকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেওয়া।

লেখকঃ উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

Related posts