November 16, 2018

জঙ্গিদের শক্ত ঘাঁটি উত্তরাঞ্চল

৫০ ভাগ এলাকা নজরদারির বাইরে। কার্যক্রম চলছে ছোট দলে ভাগ হয়ে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে। জঙ্গিদের হামলা থেকে রক্ষা পেলেন আওয়ামীলীগ নেতা

দিনাজপুরের কান্তজিউর মন্দিরে গত ৫ ডিসেম্বর হাতবোমা হামলায় নয়জন আহত হয়। মন্দির প্রাঙ্গণে রাসমেলার একটি যাত্রা প্যান্ডেলে এই হামলার ঘটনা ঘটে। ২৬ নভেম্বর বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার হরিপুর গ্রামে শিয়া সমপ্রদায়ের মসজিদে ঢুকে মুসল্লিদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মুয়াজ্জিন মোয়াজ্জেম হোসেন নিহত হন।

১৮ নভেম্বর দিনাজপুর সদরে স্থানীয় গির্জার যাজক ইতালির নাগরিক পিয়েরো পারোলারিকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা হয়। ৫ অক্টোবর পাবনার ঈশ্বরদীতে ফেইথ বাইবেল চার্চের যাজক লিউক সরকারকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা চলে। ৩ অক্টোবর রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় জাপানের নাগরিক কুনিও হোশিকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

সামপ্রতিক সময়ে উত্তরাঞ্চলজুড়ে ধারাবাহিকভাবে এ রকম হত্যা এবং হত্যা চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি হামলার ধরন প্রায় এক। জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলে জঙ্গিরা শক্ত ঘাঁটি গেড়েছে। ৫০ ভাগ এলাকায় জঙ্গি তত্পরতা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির বাইরে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলে জঙ্গি তত্পরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে রাজধানীসহ সারাদেশে জঙ্গি তত্পরতার বিষয়ে কঠোর নজরদারি রয়েছে।

জঙ্গি হামলার ঘটনার নেপথ্যের কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, মাঝে কিছুদিন চুপচাপ থাকলেও উত্তরাঞ্চল ঘিরে আবারও সংগঠিত হয়েছে জঙ্গিরা। তারাই একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, সামপ্রতিক বেশির ভাগ ঘটনাতেই নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাদের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের যোগসূত্র রয়েছে।

জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন মাদ্রাসা ঘিরেই জঙ্গি কার্যক্রম চলছে। অতীতেও বিভিন্ন সময় এ অঞ্চলে জঙ্গিরা মাদ্রাসাকে ব্যবহার করে নাশকতা চালিয়েছে। উত্তরাঞ্চলের লোকজন তুলনামূলক সহজ-সরল, দরিদ্র ও ধর্মভীরু হওয়ায় জঙ্গিরা এসব এলাকায় নাশকতা চালিয়ে আত্মগোপন করে থাকার সুযোগ পাচ্ছে। জঙ্গিরা বর্তমানে বয়সে তরুণদের দলে ভেড়াচ্ছে।

গোয়েন্দারাও মনে করছেন, উত্তরাঞ্চলে পুনরায় সংগঠিত হয়েছে জেএমবি। এ ব্যাপারে তথ্য প্রমাণও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা পেয়েছেন। এখানকার বিভিন্ন দুর্গম এলাকা ঘিরে তাদের সদস্য সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণ চলছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলে তত্পর হয়ে ওঠা জঙ্গি সংগঠনের শতাধিক আত্মঘাতী সদস্য পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি এড়াতে সাধারণ মানুষের মাঝে মিশে আছে। বয়সে তরুণ হওয়ায় তাদের শনাক্ত করা গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষে দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেখা গেছে বিভিন্ন স্থানে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গি সদস্যদের বাড়িও উত্তরাঞ্চলে। পুরান ঢাকার হোসেনী দালানে হামলা, গাবতলীতে চেকপোস্টে হামলাকারীরাও এই অঞ্চলের। ইতোমধ্যে বগুড়া, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় অভিযান চালানো হয়েছে।

২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে গাজীপুর এসপির কার্যালয়ে গ্রেনেড বিস্ফোরণের পর গ্রেপ্তার জেএমবি সদস্য নাসরিন আক্তার, মাসুদ রানা, আতিকুর রহমান ও জাহিদ হাসান উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দা। তাদের বাড়ি গাইবান্ধা, বগুড়া ও দিনাজপুরে। এছাড়া ২০০৫ সালে গাজীপুর বার কাউন্সিলে আত্মঘাতী হামলার পর পাশের এলাকা থেকে তিন জঙ্গি গ্রেফতার হয়। তাদের বাড়িও ছিল উত্তরাঞ্চলে। এই ঘটনায় আত্মঘাতী এক যুবক ঘটনাস্থলেই নিহত হয়।

তবে এখন আঞ্চলিক নেতাদের কমান্ডেই জেএমবি চলে বলে জানা গেছে। সমপ্রতি জেএমবির এক আঞ্চলিক নেতা ১০ জনের একটি দলকে নির্দেশ দেয় উত্তরাঞ্চলে আওয়ামী লীগের স্থানীয় এক জনপ্রিয় নেতাকে হত্যা করতে। ওই মিশনে গিয়ে একজন সদস্য জানান, তার পক্ষে ওই নেতাকে হত্যা করা সম্ভব নয়। কেননা তাকে হত্যা করার মধ্যে কোন লাভ খুঁজে পায়নি দলটি। পরে দলের সবাই মিলে হত্যা না করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরিকল্পনা হয়, সবাই মিলে নেতাকে বলবে র‍্যাব-পুলিশের তত্পরতার কারণে মিশন সফল হয়নি। ওই দলের ৫ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এসে জেএমবির কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে। হামলার পর দায় স্বীকার করে আইএস-এর নামে যে টুইট বার্তা প্রকাশ করা হয় তা জেএমবি করে থাকে বলে তারা জানায়।

তারা জানায়, জেএমবি ৫ থেকে ১০ জনের একটি দলকে শুধুমাত্র একটি মিশনে পাঠায়। মিশন শেষ হলে তারা সাধারণ মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করে। আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। এছাড়া আঞ্চলিক নেতারা তাদের জানিয়েছে, যতো বেশি হামলা করতে পারবে ততো বেশি মিডিয়া কাভারেজ আসবে। এতে করে বিদেশি ফান্ড বেড়ে যাবে। বেহেশতের টিকেট পাবে, তোমাদের ভাগ্য খুলে যাবে। আর সরকার পড়বে বেকায়দায়।

এই পাঁচজন ইতোমধ্যে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। জেএমবি থেকে ফিরে আসা লোকদের কাউন্সিলিং করা দরকার বলে মনে করেন তারা। জানা গেছে, জেএমবির আঞ্চলিক নেতারা গরিব লোকদের ইজি বাইক কিনে দেয়। তবে শর্ত থাকে চালাতে হবে অন্য এলাকায়। আয় করা টাকার অর্ধেক দিতে হবে জেএমবি ফান্ডে। পরে এরাই সুযোগ বুঝে হামলা করে নিজ এলাকায় ফিরে যায়। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে উত্তরাঞ্চলে পাঁচ শতাধিক জঙ্গি সদস্য রয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক আত্মঘাতী নারী সদস্যও রয়েছে। ইতোমধ্যে আটক জঙ্গি সদস্যরা বিভিন্ন সময় জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চলের মধ্যে বগুড়া, দিনাজপুর ও গাইবান্ধা জঙ্গিদের অন্যতম ঘাঁটি। তারা দুর্গম গ্রামসহ চরাঞ্চলে অবস্থান নিয়ে সংগঠনের তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছে এবং সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

র্যাব সদর দপ্তরের ইন্টিলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, উত্তরাঞ্চলে জঙ্গিদের আনাগোনা বেড়েছে। আমরা জঙ্গিদের বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখছি। সন্ত্রাসীদের ধরার পাশাপাশি জঙ্গিদের ধরার অভিযান আরো জোরালো করা হয়েছে।

পুলিশের অতিরিক্ত আইজি মোখলেসুর রহমান বলেন, জঙ্গিদের কোন ছাড় দেয়া হবে না। এদের নির্মূলে কঠিন অ্যাকশন নেয়া হবে।

দি গ্লোবাল নিউজ ২৪ ডট কম/রিপন/ডেরি

Related posts