September 20, 2018

জঙ্গলমন্ত্রীর কষ্টাকষ্টির কাশি এবং রাজনীতির হাঁফানি বিমার


আবু জাফর মাহমুদ

সরকারের জঙ্গলও পশুমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু।যেকোন ভাবে মন্ত্রী অথবা ক্ষমতাবাজির বলয়ে থাকতে আগ্রহী শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে দৈনিক ইত্তেফাকের বর্তমান সম্পাদক ও জাতীয় পার্টির ক্ষুদ্র অংশের চেয়ারম্যান এই চতুর মানুষটি।জাতীয়  পার্টির প্রতিষ্ঠাতা লেঃ জেঃ হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সামরিক শাসক থাকাকালে তার ঘনিষ্ট শিক্ষিত গোষ্ঠীর অন্যতম এই সদস্য তার নেতার ক্ষমতার পতনের আগে ছিলেন প্রতাপের অংশীদার।

নেতা এরশাদের দুর্দিনে নিজের কয়েকজন সমমনাদের নিয়ে ক্ষমতার বলয়ে থাকার লক্ষ্যে জাতীয় পার্টি নামে কার্ড বানান।কূটনীতিক এবং গোয়েন্দাদের মহলে বেশ সমাদর আছে।বুদ্ধিজীবী মহলে যথেষ্ট গুরুত্বও আছে দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মানিক মিয়ার পুত্র এবং ব্যরিষ্টার মইনুল হোসেনের এই কৃতি ভায়ের।  আমার কাছেও তিনি সম্মানীয়।বয়সেও আমাদের সিনিয়ার।

কিছুদিন আগে তিনি পারিবারিকভাবেও আলোচনায় ও বিতর্কে এসেছিলেন স্ত্রীর এক বক্তব্যের রেশ ধরে।বক্তব্যটিতে মুসলমান-প্রধান বাংলাদেশী সমাজ কাঠামো ভেঙ্গে বাংলাদেশে নতুন ধরণের কাঠামো সাজানোর ধারাকে উৎসাহিত করার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ছিলো।ধর্মীয় ঐতিহ্যগত বাস্তবতাকে উপহাস করার সাহসিকতা দেখিয়ে নতুন পথনির্দ্দেশনা দেয়ার ইঙ্গিত ছিলো তার বক্তব্যে।বক্তব্যটি পত্রিকায় প্রকাশের পর তাদের গ্রুপ থেকে আশা করা হয়েছিলো ে নিয়ে মাতামাতি হবে বেশ।

তবে যতটুকু হবার আশা ছিলো,তা না হলেও কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা পাড়ায় নিজসব আড্ডায় খবরটা ঠিক মতই পোঁছানো হয়েছিলো।আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর কাছে এই পাড়াগুলোর খবরাখবর থাকেই।যথেষ্ট জ্ঞানী মানুষ তিনি।তবে রাজনৈতিক দলের শক্তির বিবেচনায় তিনি কেউটের চেয়েও সামান্য।হিসেবের তালিকায় পড়ার মতো নন।তাই যতটুকুন তিনি,তা তার অন্যান্য পরিচিতি ও ঐতিহ্যগতভাবে পাওয়া সুবিধার উছিলায় হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনষ্টিটিউশন মিলনায়তনে তার দলের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন করেছেন শনিবার ৯ই এপ্রিল। তার দলের সভাপতি তিনি নিজেই।ঘুরে ফিরে তিনি তার দলের সভাপতি থাকেন। সভাপতির ভাষণে তিনি দাবি করেছেন,‘তার সরকারের আমলে দেশে গণতন্ত্র নেই।গণতন্ত্র বিপজ্জনক পথে এগিয়ে যাচ্ছে।এ অবস্থায় গণতন্ত্রকে   প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারলে ভয়াবহ নৈরাজ্যের পরিস্থিতি তৈরী হতে পারে’।

গণতন্ত্র নেই বলেই তিনি জনগণকে উপদেশ দিয়েছেন,যদি এখনই এই বিষয়টি ভাবা না হয়,তবে ভবিষ্যতে ইতিহাস এর প্রতিশোধ খুবই নিষ্ঠুরভাবে নেবে’।তিনি অসহায় কন্ঠে উচ্চারণ করেন,‘গণতন্ত্রের পথ আজ বাধাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে।তবে বিশাল জনগোষ্ঠী ও বুদ্ধিজীবীদের কাছে যখন এটা অসহ্নীয় হয়ে ঊঠবে তখন এটা বিপজ্জনক হয়ে পড়বে’।তার সভায় ছিলেন দীলিপ বড়ুয়া,শিরিণ আখতার সহ আরো কয়েকজন বক্তা।বেহাল এই সম্মেলনে আর কে কি বলেছেন,তা নিয়ে মিডিয়াও মাথা ঘামায়নি।তাদের অবস্থান,কথাবার্তা ও আচার আচরণে মানুষ ইদানিং আর সঙ্গতি দেখেনা।

বাংলাদেশের সংবাদ মিডিয়াই ইত্তেফাক সম্পাদক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকারের পশু বিষয়ক মন্ত্রীর সম্মেলনে চার পাওয়ালা কোন পশু দেখা যায়নি।পশু বিষয়ে তার কোন বক্তৃতা ছিলো বলে উল্লেখও করা হয়নি সংবাদে।বলেছেন রাজনীতিও সরকারের বিষয়ে।যে বিষয়ে তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন,এই বিষয়ে বক্তৃতা করার নৈতিক অধিকার তার আছে কিনা তার মনে থাকলে শোভন আলোচনা করা যেতো ইত্তেফাক সম্পাদকের কথা নিয়ে।তার আর সম্ভব হলোনা।

উপরেরটা খাবো,ভেতরেরটা খাবো,তলেরটাও খাবো এমন লোভী ইচ্ছার মানুষ অনেকেই আছে সমাজে।এধরণের মানুষের উপস্থিতি সমাজে নতুন নয়।খাই খাই স্বভাব মানব জাতির এক অদ্ভূত প্রবণতা।এই প্রবণতাকে এড়িয়ে চলা কঠিন।তবে নিজের চেহারা গোপ্ন করে যারা নির্লোভের ভান করে তাদের সংখ্যাও সমাজে কম নয়।আদম আলী যা করলে দোষ হয়,নীচতা হয়,তা কোন প্রতিষ্ঠিত লোকে করলে শব্দের অর্থ বদলে যাবে,তাতো বিশ্বাস করানো ডিজিটাল যোগে মুষ্কিল।

যা হোক আসল কথায় আসা যাক, মঞ্জু-ইনু জুটি বহুদিনের দোস্ত।বিশেষ করে রাতে বের হওয়া লোকদের নজরে তাদের দেখা গেছে বহু বপছপ্র ধরে।ইদানিং সরকারের এমপি হয়ে এক লাফে প্রভাবশালী মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু খালেদা-নিজামী বলয় দমনে কৃতিত্ব রেখেছেন রাজনৈতিক অশ্লীল শব্দ প্রয়োগে। মেধাবি সাহসী ও চতুর এই রাজনীতিকের হাত অনেক লম্বা। অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত।সরকারের নিয়োগ দাতাদের সাথেই তার দহরম মহরম।ভারতের প্রসিডেন্ট তাকে পারিবারিক ব্যক্তিগতভাবেই ঘনিষ্ট বলে জানেন।

তিনি সুযোগের সময়োযোগী ব্যবহারের দৌঁড়ে দেশের অনেক রাজনীতিককে পেছনে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই।ইদানিং সরকার প্রধানের উপর তার বিরক্তির লক্ষণ নিয়ে কথা চালু আছে তার ঘনিষ্ট মহলে।সরকার প্রধানকে বেকায়দায় ফেলতে যেকোন সুযোগ নিতে পারেন বলে অনেকের ধারণা।এজন্যে তাকে নিয়ে কিছুটা অস্থির আছে সরকারের নীতিনির্ধারকরাও।সম্প্রতি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ বিভক্ত হয়েছে তার সাংগঠনিক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে।বলাবলি হচ্ছে,সরকারের পার্টনার জাসদ ভেঙ্গে গেছে,আর সরকারের গোয়েন্দারা চুপচাপ আছে,তাতো বলা যায়না।

আরো একধাপ এগিয়ে অনেকে ভাবে বুঝান,জাসদের বর্তমান কাঠামো আরো শক্তিশালী হলে সরকারের লাভ নেই।শুধু ইনু সাহেবের লাভ।এমন কি জাসদেরও লাভ নেই।সরকারের গোয়েন্দারা সম্ভবতঃ শেখ হাসিনার সাথে নীতিগত ঘনিষ্টদেরকে প্রমোট করতে চলেছেন,কার্যকরী সভাপতি মঈন উদ্দীন খান বাদল গ্রুপকেই সরকারের বেশী পছন্দ।

যাদের সাথে রয়েছে জাসদের স্থায়ী কমিটির সংখ্যাগুরু অংশ এবং নির্বাচিত সাংসদদের বেশীর ভাগ।আনোয়ার হোসেন মঞ্জু প্রকাশ্যে হাসানুল হক ইনুর পক্ষে পৃষ্ঠপোষকতা করছেন।ইনুর সম্পাদক শিরীনকে মজুর সম্মেলনে দেখা গেলো।আওয়ামীলীগের কেউ নেই,জাসদের বাদল-আম্বিয়া-প্রধানদের কেউ ছিলোনা। অবস্থা দেখে কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন,মঞ্জু-ইনুরা কি সরকারের বিদ্রোহী হয়ে উঠছেন?সরকারকি এদেরকে সন্দেহের চোখে দেখছেন?

তবে সরকারপন্থীরা বলছেন,রাজনীতির কোন কিছুই বর্তমানের নয়,রাজনৈতিক বর্তমান হচ্ছে ভবিষ্যতের পথধারার বাস্তব অধ্যায়।এই অধ্যায়ে যা কিছু দেখা যাচ্ছে,তাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিণ।তাকাতে হবে ভবিষয়তের দিকে।ভবিষ্যত অনিবার্যতার প্রেক্ষাপটেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।সরকার ইনু মেননদেরকে কাজে লাগিয়েছে,ভাল করেছে।বাদলদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা,সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সরকার পরিচালনায় যুক্ত করতে পারেন।বাদল পার্লামেন্টে বক্তৃতা করতে যথেষ্ট হোম ওয়ার্ক করেন।

কথাতো অন্যখানে মঞ্জু ইনুরা ভাবছেন,হিলারী ক্লিন্টন হোয়াইট হাউসে আসবেন, প্রায়ই নিশ্চিত।আমেরিকান নির্বাচনের পর ভারতবর্ষের দিকে আমেরিকা এবং তার ইওরোপীয়ান জোট মনোযোগ আরো বাড়াবে নিজদের অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থে।এসময় আমেরিকান প্রশাসনের সাথে ইন্দো-মার্কিন লবির লোক হবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।প্রয়োজন হলে হাসিনাকে নীচে ফেলে তার বুকে পা ফেলে দুই দোস্ত দেবেন লাফ।এতে প্রতিশোধও হবে,রোজগারও বড় হবে।

নভেম্বরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে দুই ধরনের নিঃশ্বাস উঠা নামা করছে বাংলাদেশে।একটা হছে,গুছাও বাক্স পেট্রা,তৈরী থেকো উড়োজাহাজে উঠার,আর অন্যটা হচ্ছে,যদি এবার আমাদের জন্যে সুযোগ আসে।অনেক দিন ধরে মারপিঠ খেয়ে পর্যুদস্ত হয়ে গেছি।যদি এবার পুষিয়ে নিতে পারি।আওয়ামী বেঈমান্দেরকে ভাগ দেবোনা, একাই সব খাই ফেলামু।অবশ্য ভেতরের স্রোত ভিন্ন বলে অনেকে জোরের সাথে বলছেন।লুটেরারা সব খালাতোভাই একে অপরের।ভাগাভাগি করেই তারা সিন্ডীক্যাট সাজায়। নইলে কি আর বেগম জিয়ার অবস্থা এতো কাহিল হয়?

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় সরকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে বলে মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর বক্তব্যে বেরিয়ে আসছে।এরকম আরো অনেক উদাহরণ ইতিপূর্বেও দেখা গেছে।সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমে গেলে অন্য কেউ সরকার চালাবে,বর্তমান শক্তিকে মেরামত করা হবে।কিন্তু সরকারের সরকারতো ঠিকই আছে।থাকবে।

আমাদের ধারণা ইওরোপ এবং আমেরিকায় উন্নয়নের গতিতে স্থবিরতা দেখা দেবার বর্তমানকালে এশিয়ার দিকে তাদের মনোযোগ হবে কেন্দ্রীভূত।

আমেরিকা সরাসরি বড় ছোট সবখানে তদারকি করবে নিজেদের স্বার্থ নিরাপদ করার লক্ষ্যে।তেমন পরিস্থিতিতে নরেন্দ্র মোদীকে তার বাংলাদেশ নীতিকে কংগ্রেসীয় নীতি থেকে আলাদা করার চাপ দিতেই পারে।তখন ভারতীয় গোয়েন্দাদের উপদেশ অতিক্রম করার সম্ভাবনা বেশী ভারত সরকারের।মঞ্জু-ইনুরা সেই সময় পোষাক বদলের কথা কি ভাবছেন?পোষাক বদল করেও কি নিজেকে বদল করা সম্ভব হবে?

(লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও চেয়ারম্যান,বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল)।

Related posts