November 16, 2018

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আগ্রহ কম মেয়েদের


মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর উচ্চ শিক্ষায় ভর্তির জন্য লড়াইয়ে ছিলেন সাদিয়া আফরোজ। তার পছন্দ মেডিকেল কলেজ। কিন্তু ভর্তির সুযোগ মিলবে কি না-এই দুশ্চিন্তা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ভর্তিও জন্য ফরম তুলেছিলেন তিনি। মেডিকেল ভর্তিও ফরম ছাড়াও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীনগর, ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম তুলেছিলেন। কিন্তু রাজধানীতে অবস্থিত হলেও জগন্নাথের ফরম তুলতে যাননি তিনি।
সাদিয়া বলেন, ‘অন্য কোথাও ভর্তি হতে না পারলেও জগন্নাথে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না।’ কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওখানে যে পরিবেশ, আসা যাওয়া কষ্ট, আবার হল নেই শুনেছি।’ সাদিয়া অবশ্য পরে তার পছন্দেও মেডিকেল কলেজেই সুযোগ পেয়েছেন। এখন তিনি পড়ছেন রাজধানীরই সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে। তবে অন্য তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলেন।

এক সাদিয়া নয়, জগন্নাথকে পছন্দ করছেন না অন্য অনেকেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কথা হয়, ইংরেজি বিভাগের নাদিয়া সুলতানার সঙ্গে। তিনি জয়পুরহাট জেলা থেকে এসেছেন। পারিবারিক অর্থ সংকটের মধ্যেও নাদিয়া কষ্ট করে চালিয়ে নিচ্ছেন তার বাসনা। কিন্তু তার সহপাঠী ইংরেজি বিভাগে সুযোগ পেয়েও ভর্তি হননি।
নাদিয়া বলেন, ‘ঢাকার ঐতিহ্যবাহী একটি বিশ্ববিদ্যালয় হবার পরেও এখানে ছাত্রছাত্রীদের জন্য আবাসনের কোন ব্যবস্থা নেই। এ কারণে অনেক অভিভাবক তাদের কন্যা সন্তানকে এখানে ভর্তি করান না। আমার সেই বন্ধুও এ কারণে ভর্তি হননি।’
বাংলাদেশে প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত ছেলেদের সঙ্গে সমান তালে, তখনও তাদের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে মেয়েরা। ফলাফলের পাশাপাশি সংখ্যার দিক থেকেও ছেলেদেরকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে মেয়েরা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এই সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। কিন্তু শিক্ষার্থীর সংখ্যার দিক থেকে দেশের অন্যতম বৃহৎ উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এ দিক থেকে অনেকটাই ব্যতিক্রম। এখানে ছেলেদের তুলনায় মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম থাকার প্রধান কারণ আবাসন সংকট আর যাতায়াতে ভোগান্তি। পুরান ঢাকার যে এলাকায় এই বিশ্বাবিদ্যালয়টি অবস্থিত, যানজট পেরিয়ে সেখানে যাওয়া খুবই কঠিন। এ কারণে মেয়েদের পছন্দের তালিকায় এই বিশ্ববিদ্যালয়টি থাকে পেছনের সারিতে।
বাংলাদেশে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিকে ছেলের তুলনায় মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। উচ্চ মাধ্যমিকে ছেলে ও মেয়ের সংখ্যা প্রায় সমান সমান। তবে উচ্চ শিক্ষায় মেয়ের সংখ্যা কিছুটা কম। সরকারের পরিসংখ্যান বলছে প্রাথমিকে মোট শিক্ষার্থীর ৫১ শতাংশ মেয়ে। মাধ্যমিকে এটা আরও বেশি, ৫৩ শতাংশ। উচ্চ মাধ্যমিকে কিছুটা কমে যায় এই সংখ্যা, শতকরা ৪৭ থেকে ৪৮ শতাংশ। উচ্চশিক্ষায় তা কমে যায় অনেকটাই। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর ৩৩ শতাংশের কিছু বেশি। কম। এই সংখ্যাটা গত এক দশকে বেড়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে।
শিক্ষার্থীর সংখ্যার দিক থেকে জগন্নাথ দেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি। প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী আছে এখানে। এদের মধ্যে মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ শতাংশেরও অনেক কম। এখানে সাকুল্যে পাঁচ থেকে সাত হাজার মেয়ে পড়াশোনা করেন।
কথা হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সুরাইয়া আলী উর্মির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি পরিবেশের কারণে এখানে অনেকেই পরীক্ষা দেয় না এমনকি অনেকে আবার পরীক্ষা দিয়েও ভর্তি হয় না।’
জগন্নাথে মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম কেন- জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মীজানুর রহমান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মগত ত্রুটি রয়েছে। অন্য সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এর পার্থক্য হল এখানে সরকারি একটা কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়েছে। ফলে জন্ম থেকেই বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে এর পথচলা শুরু হয়। শিক্ষার্থীর সংখ্যার দিক থেকে দেশে তৃতীয় স্থানে থাকলেও এর অবকাঠামো মাত্রা সাত একর জমিতে। যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের থেকেও কম।’
২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পর থেকে এখানে মেয়েদের সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে বলে জানান উপাচার্য। মেয়েদের আবাসন সংকটের সমাধান করতে পারলে এই সংখ্যাটা আরও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। জানান, এই সংকট সমাধানে পুরান ঢাকায় এক হাজার আসনের একটি হল হচ্ছে।
কথা হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মিঠুন মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের এ নবীন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ৩২টি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর বিষয়ে প্রতিবছরই নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।’ তিনি বলেন, সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্রের তুলনায় ছাত্রীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। শুধুমাত্র জাহাঙ্গীরনগরে সমান সংখ্যক আবাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করে ভর্তি কার্যক্রম সম্পূর্ণ করা হয়।’
আবাসন সংকট ছাড়াও যাতায়াত এক বড় ভোগান্তির নাম। যে পথ দিয়েই শিক্ষার্থীরা আসুক না কেন, সকাল থেকে রাত অবধি তীব্র যানজটে আটকে থাকতে হবেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিবহন থাকলেও চাহিদার তুলনায় এসব নিতান্তই অপ্রতুল। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের এলাকার পরিবেশও তুলনামূলক ঘিঞ্জি। তবে ভাড়া আবার বেশি। এর সবই মেয়েদের বিপক্ষে যাচ্ছে।
মেয়েদের হল কতদূর
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে বাংলাবাজার সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জন্য ২০ তলা হলের নির্মাণ কাজ চলছে। এটা নির্মাণ হলে ছাত্রীদের আবাসন সংকট অনেকটাই কমবে বলে আশা করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এই হলটি চালু হলে মেয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার প্রবণতা বাড়বে বলে আশা করছে তারা।
এই নির্মাণ কাজের প্রকল্প ব্যবস্থাপক জিল্লুর রহমান জানান, দ্বিতীয় তলা ছাদের কলাম নির্মাণের কাজ ও ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন থেকে প্রতি মাসে একটি করে ছাদ ঢালাইয়ের পাশাপাশি ভবনের ফিনিশিংয়ের কাজ চলবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট সমাধানের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গত সেপ্টেম্বরে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ কেরানিগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস করার সিদ্ধান্ত জানান। বলেন, সেখানে মোট ২৫ একর জমিতে অ্যাকাডেমিক ভবন এবং ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হবে। এ জন্য অচিরেই জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হবে। ওই ক্যাম্পাসের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো ক্যাম্পাসও থাকবে। দুই ক্যাম্পাস মিলিয়ে কেবল মেয়ে নয়, ছেলেদের আবাসক সংকটও থাকবে না বলে আশ্বস্ত করেন শিক্ষামন্ত্রী।- ঢাকাটাইমস

Related posts